ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের স্মৃতিবিজড়িত মূল্যবান সামগ্রীর সুরক্ষা দরকার

আহমদ রফিকফাইল ছবি: প্রথম আলো

গত বছর আহমদ রফিকের জন্মদিনে লিখেছিলাম, এমন জন্মদিন তাঁর এর আগে আসেনি। কারণ, তখন সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে ছিলেন তিনি। আজ তিনি জগতের সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তবে আছেন আমাদের হৃদয়ে, অগণিত পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের স্মৃতিতে। তাঁর জীবনের অন্তিম সময়ে রক্ত-সম্পর্কীয় আত্মীয় বলতে যাঁদের বোঝায়, তেমন কেউ ছিলেন না। তিনি জানতেনও তা। তাঁর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত আমরা কজন ছিলাম পরমাত্মীয়ের মতো। তখন আমি লিখেছিলাম তিনি ‘পরিবারহীন, স্বজনহীন, সংজ্ঞাহীন’।

লেখাটি প্রকাশের পর দু- একবার সংজ্ঞায় ফিরেছিলেন বটে; কিন্তু তাকে ঠিক পুরোপুরি চৈতন্যে ফেরা বলা যায় না। তাই তাঁর বেঁচে থাকা অবস্থায় শেষ জন্মদিন আর মৃত্যু–পরবর্তী প্রথম জন্মদিনের মধ্যে খুব একটা তফাত নেই।

ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক (বাঁয়ে) ও সাঈদ হায়দার (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) ভাষাসংগ্রামের গল্প শোনাচ্ছেন এই প্রজন্মের পাঁচ তরুণ–তরুণীকে
প্রথম আলো ফাইল ছবি

আহমদ রফিক ভাষা আন্দোলনের সংগঠক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে বিপর্যস্ত হয়েছিল তাঁর শিক্ষাজীবন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের অন্য কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। দুই বছর ফেরার থেকে ফিরেছিলেন চিরচেনা শিক্ষাঙ্গনে। পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফলও করেছিলেন। কিন্তু সেই সময়ের প্রশাসন তাঁকে ইন্টার্ন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। এ কারণে চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেননি তিনি। সামনে তাঁর দুটি পথ খোলা ছিল। রাজনীতি ও লেখালেখি। কখনো চাকরিজীবী হিসেবে, কখনো উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষতক তিনি বেছে নিয়েছিলেন লেখালেখির মতো দুরূহ পথ।

আহমদ রফিকদের মতো মানুষ সমাজে বিরল। যাঁরা প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি ছাড়াই ৯৬ বছরের একটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন। ’ভাষাসৈনিক’ নয়, নিজের উদ্ভাবিত ‘ভাষাসংগ্রামী’ শব্দবন্ধ বেছে নিয়ে এবং বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে লিখে গেলেন আমৃত্যু। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা থাকাকালে বাংলাদেশে রবীন্দ্রসাহিত্যের দর্শন প্রসারে কাজ করেছেন। তিনি সম্পদের ব্যক্তিমালিকানায় বিশ্বাস করতেন না। ফলে অর্থ সঞ্চয় করেননি। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রবীন্দ্র চর্চাকেন্দ্র ট্রাস্ট। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে গেছেন। ছিল যে দেহখানি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমৃদ্ধি ঘটাতে তা–ও দান করে গেছেন।

এক যুগের বেশি সময় তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পাওয়ার সুবাদে বলতে পারি, শেষ দিকে তাঁর জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল আপনজনের যত্ন। তিনি সেটি পাননি। কারণ, তিনি ছিলেন ’পরিবারহীন, স্বজনহীন’ এবং সম্পদহীন। কিন্তু তাঁর মতো সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে যাঁরা নিভৃতে কাজ করে যান, যাঁরা কারও মুখাপেক্ষী হতে চান না, যাঁরা রাষ্ট্রের কল্যাণ বই অকল্যাণ চিন্তা করেন না, সেই ধরনের গুণী মানুষের জন্য রাষ্ট্রের অনেক দায়িত্ব থাকে। রাষ্ট্র তাঁর ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব পালন করেনি। বিভিন্ন সময়ে তাঁকে নিয়ে লিখেছি ’জীবন চলে অন্যের সহায়তায়’ , ‘প্রয়োজন তাঁকে আগলে রাখা’ , ‘ উপার্জনহীন-জীবনে-দরকার-রাষ্ট্রীয়-পৃষ্ঠপোষকতা’ ইত্যাদি শিরোনামে। রাষ্ট্রের তেমন সাড়া মেলেনি। লিখেছিলাম, ’শতাধিক মননশীল গ্রন্থের লেখক, একজন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবীর লড়াই এভাবে থেমে যাক, আমরা চাই না। তাঁর জন্য রাষ্ট্র উদারতার পরিচয় দেবে, আমরা সেই প্রত্যাশা করেছিলাম।’ রাষ্ট্র তাঁর চিকিৎসার জন্য কিছুটা পাশে দাঁড়িয়েছিল যখন, তখন তিনি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ছিলেন।

আরও পড়ুন
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

আহমদ রফিকের অনুমতিক্রমে কিন্তু তাঁর উপস্থিতিতে কার্যক্রম পরিচালনা না করার শর্তে ২০১৮ সালে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছিলাম ‘ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ফাউন্ডেশন’। তাঁর তো সম্পদ বলতে তেমন কিছু ছিল না। তবে তাঁর অনুপস্থিতিকালে তাঁর প্রকাশিত- অপ্রকাশিত বইপত্রসহ অন্যান্য জিনিসপত্র দেখভালের দায়িত্ব তিনি ফাউন্ডেশনকে দিয়ে গেছেন। অনেকটা শূন্য হাতে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা চলছে। তাঁর সংগৃহীত বই গোছানোর কাজ চলছে। সংখ্যাটা দুই হাজারের বেশি হতে পারে। আছে বেশকিছু ডায়েরি, চিঠিপত্র, ব্যবহার্য জিনিসপত্র, বিভিন্ন স্মারক ইত্যাদি। একজন ভাষাসংগ্রামীর ব্যবহার্য, নামাঙ্কিত প্রতিটি সামগ্রীই মহামূল্যবান। অমূল্য সম্পদ হিসেবে ফাউন্ডেশন সেগুলো আগলে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এগুলো টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাঁর প্রয়াণের পর আমরা তাঁর স্মৃতিবিজড়িত জিনিসপত্রসহ আশ্রয় পেয়েছি বেসরকারি একটি সংস্থার (এনজিও) কার্যালয়ের ছোট একটি কক্ষে। তারা প্রায় বিনা খরচে সেখানে আমাদের ঠাঁই দিয়েছে। ফাউন্ডেশন চায় আহমদ রফিকের জিনিসপত্রসমেত একটা পরিপূর্ণ স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করতে; যেখানে নতুন প্রজন্ম অনুধাবন করতে পারবে একজন ভাষাসংগ্রামীর আত্মত্যাগ, পূর্ণকালীন লেখকের জীবনসংগ্রাম, যাঁর সংগ্রহ ও প্রণীত বইপুস্তক নিয়ে তারা গবেষণা করতে পারবে।

আরও পড়ুন
বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হলো ‘আহমদ রফিক রচনাবলি: প্রথম খণ্ড’
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

কিন্তু প্রাপ্ত এই জায়গাখানি প্রয়োজনের তুলনায় বড় অপ্রতুল, যেন ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই! ছোট সে তরী।’ আমরা জানি না, কত দিন এই জিনিসপত্র আমরা আগলে রাখতে পারব। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আমরা চাই, তাঁর সংগৃহীত বই, অসংখ্য সাহিত্য- সাময়িকী, চিঠিপত্র- ডায়েরিসহ মূল্যবান জিনিসপত্র পরিকল্পিত সেই জাদুঘরে প্রদর্শিত হোক। আমাদের প্রয়োজন একটুকরা জায়গার। আমরা মনে করি, রাষ্ট্র জীবদ্দশায় আহমদ রফিকের প্রতি সুবিচার করতে না পারলেও তাঁর রেখে যাওয়া মূল্যবান জিনিসপত্রের সুরক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশনের পাশে দাঁড়াবে। ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের স্মৃতির প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম জানাই।

ইসমাইল সাদী: শিক্ষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ সম্পাদক, ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন