১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে নেই, তবে বিশ্বে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা দলের সবচেয়ে উন্মাদনাপূর্ণ সমর্থকদের একটি বড় অংশের বাস এই দেশে।
বাংলাদেশে গত মে মাস থেকেই ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা বিশাল সব পতাকা টানিয়ে নিজেদের দলের প্রতি ভালোবাসা দেখাচ্ছেন। একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন তাঁরা। স্বদেশপ্রেমে উজ্জীবিত বাংলাদেশে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়, যখন মানুষের চারপাশ ভরে ওঠে অন্য দেশের পতাকায়।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে লিওনেল মেসির বিশাল মুখচ্ছবি। আর আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সি কিনতে ফুটবলপ্রেমীদের ভিড় জমছে ঢাকার গুলশানের ক্রীড়াসামগ্রীর দোকানগুলোতে।
গত বুধবার ঢাকার কাছের জেলা মুন্সিগঞ্জের সুপার মার্কেট চত্বরে হাজারো ফুটবলপ্রেমী বিশাল পর্দায় ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ম্যাচ দেখতে জড়ো হন। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে খেলা নিশ্চিত করে। সেদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো ছিল বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার জার্সি পরা সমর্থকদের উচ্ছ্বাস আর উল্লাসের।
সেমিফাইনালের অন্য ম্যাচে স্পেন ২-০ গোলে ফ্রান্সকে পরাজিত করে ফাইনালে ওঠে। আজ ১৯ জুলাই দিবাগত রাতে (বাংলাদেশ সময়) ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় এ খেলায় মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন।
২০২২ সালে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা ফিফা এবং আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের নজর কেড়েছিল। নিজেদের দেশ থেকে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশের মানুষদের কাছ থেকে এমন অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়ে তাঁরা অভিভূত হয়েছিলেন। আর বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার প্রতি এই ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন কিংবদন্তি ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনা।
ভৌগোলিক বা রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার কোনো বিশেষ সম্পর্ক না থাকলেও দেশটির প্রতি বাংলাদেশিদের টান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বকাপ এলেই এই সমর্থন এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে অনেক সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও প্রতিপক্ষে পরিণত হয়।
চলতি বছর বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। এটি এমন এক ফুটবল উন্মাদনার চিত্র, যা জাতীয় সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে গেছে।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা নরওয়েও বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। নিজেদের ম্যাচগুলোর আগে দেশটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সমর্থকদের প্রতি ‘ভাইকিংস’দের সমর্থন করার আহ্বান জানানো হয়।
তবে এই ফুটবল উন্মাদনার অন্ধকার দিকও আছে। কারণ, কখনো কখনো এই উন্মাদনা সহিংসতায় রূপ নিতে দেখা যায়।
লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিস নিয়ে তর্কের জেরে এক ব্যক্তির নিহত হওয়ার ঘটনাসহ বিশ্বকাপ ঘিরে সহিংসতায় অন্তত ১২ জনকে প্রাণ হারাতে হয়েছে বাংলাদেশে।
গত সপ্তাহে আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচে মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর আর্জেন্টিনার মেসির পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেওয়ার পর কুমিল্লায় দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা সংঘর্ষে রূপ নিয়েছিল। সেই ঘটনায় নিহত হন ৩৮ বছর বয়সী মো. শরিফুল ইসলাম।
বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্য্যমের খবর অনুযায়ী, পেশায় রিকশাচালক শরিফুল ইসলাম এলাকার একটি চায়ের দোকানে বসে খেলা দেখছিলেন। সেখানে মেসির পেনাল্টি মিস নিয়ে বিদ্রূপ করায় কথিত আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হামলার শিকার হন তিনি।
ভৌগোলিক বা রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার কোনো বিশেষ সম্পর্ক না থাকলেও, দেশটির প্রতি বাংলাদেশিদের টান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বকাপ এলেই এই সমর্থন এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে অনেক সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও প্রতিপক্ষে পরিণত হয়।
এদিকে ৮ জুলাই চট্টগ্রামে আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচ দেখতে যাওয়ার পথে ফায়াজ তাজরিয়ান নামের একজন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন। আর নড়াইলে ফুটবলকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে মোস্তফা কাজী নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
পৃথক দুটি ঘটনায় চট্টগ্রামে বিজয় উদ্যাপনের সময় গোলপোস্ট ভেঙে পড়ে মাহিদুল ইসলাম নিহত হন। আর বরগুনায় সমর্থকদের আয়োজিত একটি প্রীতি ম্যাচ শুরুর আগেই অসুস্থ হয়ে মারা যান খোকন কর্মকার।
চলতি মাসের শুরুতে হবিগঞ্জে একটি স্থানীয় ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন। এদিকে শরীয়তপুরের একদল তরুণ ঘোষণা দিয়েছেন, ২০০২ সালের পর থেকে ব্রাজিল যে বিশ্বকাপ শিরোপা জেতার অপেক্ষায় আছে, সেই অপেক্ষার অবসান না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা বিয়ে করবেন না।
যদিও বাংলাদেশে ফুটবল সমর্থনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা, তবু বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অন্য দেশগুলোও মাঝে মাঝে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
এমনই একজন ৭২ বছর বয়সী আমজাদ হোসেন। নিজের সামান্য জমির একটি অংশ বিক্রি করে তিনি জার্মানির ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পতাকা তৈরি করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন। দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, আমজাদের স্বপ্ন—এই বিশাল পতাকাটি যেন একদিন জার্মানির কোনো জাদুঘরে স্থান পাবে।
এদিকে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা নরওয়েও বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। নিজেদের ম্যাচগুলোর আগে দেশটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সমর্থকদের প্রতি ‘ভাইকিংস’দের সমর্থন করার আহ্বান জানানো হয়।
সমর্থন চেয়ে দেওয়া এক বার্তায় নরওয়ের দূতাবাস বাংলাদেশ ও দেশটির দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি ছিল নরওয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে দূতাবাস লিখেছিল, ‘তাহলে কী বলো, বাংলাদেশ?’
বার্তায় আরও বলা হয়, ‘আন্ডারডগদের পাশে দাঁড়ানোর এই তো সময়। একসঙ্গে বড় স্বপ্ন দেখার সময়ও এখনই।’
এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল খেলেছে। এতে টুর্নামেন্টে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে রেকর্ড ১০৪টিতে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই বিশ্বকাপ আসর।
ভারতীয় উপমহাদেশে ফুটবল খেলার প্রচলন শুরু হয় ১৯ শতকে। ব্রিটিশ শাসকেরা তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের রাজধানী কলকাতায় প্রথম এই খেলার প্রচলন করেন।
ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) যখন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন অনেক তরুণ ফুটবলের মধ্যে আনন্দ, আশা এবং অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই সময়ের তরুণদের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক ছিল ব্রাজিল। দলটি তখন ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ফুটবল দলগুলোর একটি ছিল। সে সময় কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় নায়কে পরিণত হন। তাঁর খেলা ও সাফল্য দেশের পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য ফুটবলারের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে টেলিভিশনের ব্যবহার বাড়তে শুরু করলে ফুটবলের জনপ্রিয়তাও দ্রুত বাড়তে থাকে। অনেক বাংলাদেশির জন্য ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপই ছিল রঙিন টেলিভিশনে দেখা প্রথম বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক গোল দুটি ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সেই জয়কে অনেকেই প্রতীকী বিজয় হিসেবে দেখেছিলেন।
নতুন প্রজন্মের সমর্থকদের কাছে ডিয়েগো ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণ করেছেন আর্জেন্টিনার তারকা লিওনেল মেসি। অন্যদিকে, ব্রাজিল সমর্থকদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন নেইমার।
অতীতেও বাংলাদেশে ফুটবল উন্মাদনা সহিংসতায় রূপ নিতে দেখা গেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের সংঘর্ষে বাংলাদেশে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
টাইম সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে বিদ্যুতের তারে পতাকা টাঙাতে গিয়ে অন্তত তিনজন প্রাণ হারান। আর ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের পতাকা টাঙানোর সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরের মৃত্যু হয়। একই আসর চলাকালে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মিছিলে সংঘর্ষের ঘটনায় এক ব্যক্তি ও তাঁর ছেলে গুরুতর আহত হন।