৪৫তম ও ৪৯তম বিসিএস
নামের শেষে ‘ক্যাডার’, পকেটে টান: গেজেট বিলম্বের যন্ত্রণায় হাজারো চাকরিপ্রার্থী
ছেলের সরকারি চাকরি হয়েছে শুনে দিনমজুর বাবা ভেবেছিলেন, এবার বুঝি কষ্টের দিন ফুরাবে। আর হয়তো রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অন্যের জমিতে কাজ করতে হবে না। কিন্তু বাবার সেই অপেক্ষার প্রহর আর কাটছে না। উল্টো গ্রামের মানুষ এখন সন্দেহ প্রকাশ করে জানতে চান—আদৌ চাকরিটা হয়েছে কি না!
সীমান্তবর্তী অঞ্চলের এক প্রার্থীর এই আকুতি এখন হাজারো চাকরিপ্রার্থীর আর্তিতে পরিণত হয়েছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার সব ধাপ পেরিয়ে পিএসসি কর্তৃক চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও শুধু একটি গেজেট বা প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় থমকে গেছে তাঁদের জীবন।
চূড়ান্ত ফলাফলের মাসের পর মাস পেরিয়ে যাওয়ায় অনেক প্রার্থীর পকেট মানিতে এখন টান পড়েছে। বন্ধুদের আড্ডায় ‘ক্যাডার’ বলে খোঁচানো হলেও পকেটে টাকা না থাকায় বিল দেওয়ার সময় তৈরি হচ্ছে বিব্রতকর পরিস্থিতি। চাকরি পাওয়ার আনন্দে অনেকে টিউশনি বা খণ্ডকালীন কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন, এখন তাঁরা পড়েছেন চরম অর্থকষ্টে।
এ পরিস্থিতির শিকার শুধু একজন দুজন নন; ৪৫তম সাধারণ বিসিএস এবং ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের প্রায় আড়াই হাজার প্রার্থীর জীবন এখন এমন দোলাচলে কাটছে।
সরকারি কলেজের শিক্ষক ও চিকিৎসক–সংকট দূর করতে দ্রুততম সময়ে ৪৮ ও ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ৪৮তম বিসিএসে দ্রুত গেজেট হলেও ৪৯তমতে ৭ মাসেও অগ্রগতি নেই। গত বছরের ১১ নভেম্বর এই বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে ৬৬৮ জনকে ক্যাডার পদে সুপারিশ করে পিএসসি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী প্রার্থী বলেন, ‘আমার গ্রামে আমিই প্রথম ক্যাডার হয়েছি। সাত মাস হলে চলল গেজেট হয়নি। বয়োবৃদ্ধ অসুস্থ মা প্রায়ই জিজ্ঞাসা করেন—“তোর গেজেট দেখে মরতে পারব তো?” মাকে দেওয়ার মতো কোনো জবাব আমার কাছে নেই।’
আরেক প্রার্থী জানান, চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পর তিনি অন্য সব চাকরির পরীক্ষা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এখন সাত মাস ধরে গেজেট না হওয়ায় তিনি চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব সাবিহা ফাতেমাতুজ-জোহরা প্রথম আলোকে বলেন, ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াটি চলছে। দ্রুতই গেজেট প্রকাশ করা হবে।
চাকরিপ্রার্থীদের ভাষ্য, তাঁরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছেন, বিসিএস দুটির পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষ হয়েছে। বর্তমানে ফাইলগুলো রি-ভেরিফিকেশনের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) দপ্তরে রয়েছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পুরো প্রক্রিয়া থমকে আছে।
৪৯তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ২১ জুলাই। ৬৮৩টি পদের বিপরীতে ৩ লাখ ১২ হাজারের বেশি প্রার্থী আবেদন করেন। একই বছরের ১০ অক্টোবর লিখিত পরীক্ষা এবং ১১ নভেম্বর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়।
অন্যদিকে ৪৫তম সাধারণ বিসিএসের ১ হাজার ৮০৭ জন প্রার্থীর অপেক্ষার বয়স ৬ মাস পেরিয়ে গেছে। ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর এই বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এই প্রার্থীরাও এখন পুলিশ ভেরিফিকেশনের বেড়াজালে আটকে আছেন।
জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব সাবিহা ফাতেমাতুজ-জোহরা প্রথম আলোকে বলেন, ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াটি বর্তমানে চলমান রয়েছে। কাজ শেষ করে দ্রুতই গেজেট প্রকাশ করা হবে।
এর আগে গত মে মাসে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারীও জানিয়েছিলেন, সব প্রার্থীর ভেরিফিকেশন ফাইল মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানো সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গেজেট প্রকাশ করা হবে। তবে আশ্বাস আর প্রক্রিয়াকরণের এই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে প্রার্থীদের মূল্যবান সময় ও মানসিক শক্তি দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে।