জেলা-উপজেলায় চালু হচ্ছে চাকরির নতুন ব্যবস্থা, যেভাবে পাবেন সব তথ্য

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

কুড়িগ্রাম বা লালমনিরহাটের এক তরুণ নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ। কিন্তু তাঁর এলাকায় কোন প্রতিষ্ঠানে সেই দক্ষতার কর্মী প্রয়োজন, সেই তথ্য তাঁর জানা নেই। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী প্রয়োজন হলেও স্থানীয় দক্ষ তরুণদের তথ্য তাদের কাছে নেই। চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতার এই দূরত্ব কমাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালু করতে যাচ্ছে সরকার।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে কয়েকটি নির্বাচিত জেলা ও উপজেলায় এর পরীক্ষামূলক (পাইলট) কার্যক্রম শুরু হবে। পাইলট কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্য জেলা ও উপজেলায় এটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রথম ধাপে পাইলট কার্যক্রম

সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালুর কথা বলা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত এপ্রিল মাসে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। উদ্যোগটির বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব কামরুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কার্যক্রম চলমান। প্রথম অবস্থায় আমরা পাইলট কার্যক্রম শুরু করব। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কয়েকটি উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু হতে পারে। আমরা আশা করছি, পরবর্তী মিটিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিনের উপস্থিতিতে পাইলট কার্যক্রমের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।’

অর্থাৎ এখনো প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করার জন্য জেলা বা উপজেলার তালিকা চূড়ান্ত হয়নি। প্রথম ধাপে কতটি এলাকা থাকবে, কতজন চাকরিপ্রার্থী নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন এবং কবে থেকে কার্যক্রম শুরু হবে—এসব বিষয়ও চূড়ান্ত হয়নি।

দেশে বর্তমানে ৬৪টি জেলা ও ৫০৩টি উপজেলা রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা হলো নির্বাচিত এলাকায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে ধাপে ধাপে অন্য এলাকাগুলোকে এর আওতায় আনা।

চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতার তথ্য মিলবে

এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের মূল কাজ হবে চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতার তথ্য একটি ব্যবস্থার মধ্যে আনা। চাকরিপ্রার্থীরা তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও কাজের অভিজ্ঞতার তথ্য নিবন্ধন করতে পারবেন। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের শূন্য পদ ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতার তথ্য দিতে পারবে।

এরপর প্রার্থীর যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে পদের প্রয়োজনীয়তা মিলিয়ে উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে বের করার ব্যবস্থা থাকবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী প্রয়োজন হলে স্থানীয়ভাবে নিবন্ধিত চাকরিপ্রার্থীদের মধ্য থেকেও উপযুক্ত ব্যক্তিকে খোঁজার সুযোগ তৈরি হবে।

সরকারের বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, কোনো চাকরিপ্রার্থীর প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকলে তাঁকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হবে। তবে কোন শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রার্থীরা প্রথম ধাপে নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে শূন্য পদের তথ্য দেবে এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কোন দপ্তর এটি সমন্বয় করবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কাঠামো প্রকাশ করা হয়নি।

এ উদ্যোগের সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার তথ্য সংগ্রহের বিষয়টিও যুক্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) যৌথভাবে লেবার ডিমান্ড সার্ভিস সার্ভে নিয়ে কাজ করছে। এতে বিভিন্ন খাতে কী ধরনের কর্মীর চাহিদা রয়েছে, কী দক্ষতা প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতে কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা বাড়তে পারে, তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

দক্ষতার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ

চাকরিপ্রার্থী ও শূন্য পদের তথ্য এক জায়গায় আনলেই শ্রমবাজারের সমস্যা মিটবে না। প্রার্থীর দক্ষতা ও চাকরির চাহিদার মধ্যে মিল থাকাও জরুরি। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ১০টি শিল্প খাত নিয়ে করা এক গবেষণায় গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ দক্ষতার ঘাটতি পেয়েছিল। প্রযুক্তিনির্ভর খাতগুলোতে এই ঘাটতি তুলনামূলক বেশি ছিল।

অর্থাৎ একজন চাকরিপ্রার্থী হয়তো কাজ খুঁজছেন, কিন্তু তাঁর এলাকায় যে কাজটি আছে, তার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তাঁর নেই। আবার তাঁর যে দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, সেই কাজ হয়তো অন্য জেলায়। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে এই তথ্যের অমিল কমানোর চেষ্টা করা হবে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সমস্যা শুধু বেকারের সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায় না। আইএলওর মার্চ ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান ও আংশিক বেকারত্ব এখনো বড় সমস্যা। আত্মকর্মসংস্থান বাড়লেও বেতনভুক্ত কর্মসংস্থানের অংশ কমেছে। তরুণ ও নারীরা শ্রমবাজারে বেশি সমস্যার মুখে রয়েছেন।

বিশ্বব্যাংক এপ্রিল ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলেছে, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে চাপ তৈরি করছে। সংস্থাটি বাংলাদেশে আরও বেশি ও ভালো বেতনের চাকরি তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে।

পেশা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ সরাসরি নতুন চাকরি তৈরি করবে না। এর লক্ষ্য হবে বিদ্যমান চাকরির সুযোগ, চাকরিপ্রার্থী ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে সংযোগ তৈরি করা। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থাকা চাকরিপ্রার্থীদের স্থানীয় ও আশপাশের এলাকার কর্মসংস্থানের তথ্য এক জায়গায় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন