বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বেকারত্বের যে সাত রূপ, যে যে উদ্যোগ জরুরি
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করতেন রাকিবুল ইসলাম। অনিয়মিত বেতন আর অতিরিক্ত ওভারটাইমের চাপে অতিষ্ঠ হয়ে তিন মাস আগে চাকরি ছাড়েন। এখন হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছেন। শ্রম অর্থনীতির ভাষায়, রাকিবুল এখন ‘ঘর্ষণমূলক বেকারত্বের’ শিকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ–২০২৪ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। কিন্তু আইএলওর সংজ্ঞা (সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করলেই বেকার নয়) দিয়ে বাংলাদেশের বেকারত্বের গভীরতা মাপা অসম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
শ্রমবাজারের ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এখানকার বেকারত্ব অনেক বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক। মানুষের কাজের ধরন, দক্ষতা ও পারিপার্শ্বিকতার ওপর ভিত্তি করে বেকারত্বের সাতটি ধরন বাংলাদেশে দেখা যায়—
১. কাঠামোগত বেকারত্ব: যখন ডিগ্রি হয় গলার কাঁটা
শ্রমবাজারে দক্ষতা ও চাহিদার অমিলের কারণে সৃষ্টি হয় কাঠামোগত বেকারত্ব। এটিই বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। জরিপ অনুযায়ী, দেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। অর্থাৎ প্রতি তিনজন বেকারের একজন উচ্চশিক্ষিত। শিক্ষাব্যবস্থা যখন বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারে না, তখনই এই সংকট তীব্র হয়। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষ করে হাজার হাজার তরুণ দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছেন, অথচ অন্যদিকে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বলছে তারা ‘যোগ্য প্রার্থী’ পাচ্ছে না। এই বৈপরীত্যই কাঠামোগত বেকারত্বের মূল ভিত্তি।
২. আংশিক বা অর্ধবেকারত্ব: কাজ আছে, তবু ঘোচে না অভাব
একজন ব্যক্তি কর্মরত, কিন্তু তাঁর দক্ষতা, সময় বা সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না—এটিই আংশিক বেকারত্ব। বিবিএসের হিসাবে দেশে এমন বেকারের সংখ্যা ৬৪ থেকে ৬৭ লাখ। একজন স্নাতকোত্তর যখন বাধ্য হয়ে ডেলিভারি বয় হিসেবে কাজ করেন বা একজন শিক্ষিত তরুণ কেবল দিনে দুই ঘণ্টা টিউশনি করে দিন কাটান, তখন তিনি শ্রম অর্থনীতির ভাষায় বেকার না হলেও বাস্তব অর্থে তাঁর মেধার অপচয় ঘটছে। বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে এমন বেকারত্বই সবথেকে বেশি।
৩. চক্রাকার বেকারত্ব: অর্থনীতির জোয়ার-ভাটায় পিষ্ট জীবন
অর্থনৈতিক মন্দা বা উৎপাদন কমে গেলে যখন প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ছাঁটাই করে, তখন তাকে বলা হয় চক্রাকার বেকারত্ব। ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ অর্গানাইজেশন বলছে, করোনাকালে দেশে অন্তত ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছিলেন। বর্তমান রাজনৈতিক ও বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাবেও এই ধারা অব্যাহত। বিজিএমইএর ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, গত দুই বছরে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হওয়ায় ১ লাখ ১৯ হাজার শ্রমিক পথে বসেছেন। বিশ্ববাজারের স্থবিরতা বা যুদ্ধ যখন স্থানীয় কর্মসংস্থান কেড়ে নেয়, তখন তৈরি হয় এই চক্রাকার সংকট।
শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বড় দেয়াল তৈরি হয়েছে। দক্ষ জনবল তৈরি এবং শিল্পায়ন—একসঙ্গে না চালালে বেকারত্বের ৭টি রূপ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে
৪. ছদ্ম বেকারত্ব: যেখানে কাজ আছে কিন্তু উৎপাদন নেই
কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে ছদ্ম বেকারত্ব একটি নীরব ঘাতক। কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শ্রমিক থাকলে এবং অতিরিক্ত শ্রম উৎপাদনে কোনো প্রভাব না ফেললে তাকে ছদ্ম বেকারত্ব বলে। বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবারগুলোতে দেখা যায়, একটি জমিতে দুজন শ্রমিকের কাজ থাকলেও সেখানে পরিবারের চারজন সদস্য কাজ করছেন। বাহ্যিকভাবে সবাই ব্যস্ত মনে হলেও বাড়তি দুজনের প্রান্তিক উৎপাদন শূন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুল খালেকের মতে, চাকরির বৈচিত্র্য কম হওয়ায় মানুষ নিরুপায় হয়ে একই কাজে যুক্ত থাকছেন।
বেকারত্বকে কেবল ২৬ লাখের একটি সংখ্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি কাঠামোগত ব্যাধি। তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ, শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার ছাড়া রাকিবুলদের মতো হাজারো তরুণের এই দীর্ঘশ্বাস দূর করা সম্ভব নয়।
৫. মৌসুমি বেকারত্ব: প্রকৃতির মর্জিতে যখন থমকে যায় আয়
বছরের নির্দিষ্ট মৌসুমে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় শ্রমিকেরা সাময়িকভাবে বেকার হয়ে পড়ে। উত্তরবঙ্গের দিকে তাকালে দেখা যায়, ধান কাটার মৌসুম শেষ হলে হাজার হাজার কৃষিশ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। এই মৌসুমি বেকারেরা তখন দলে দলে শহরে এসে রিকশা চালানো বা হকারি করে টিকে থাকার চেষ্টা করেন। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে এই সাময়িক কর্মহীনতা গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার বাড়িয়ে দেয়।
৬. ঘর্ষণমূলক বেকারত্ব: এক কাজের শেষ আর অন্যটির শুরু
এক চাকরি ছেড়ে অন্য চাকরিতে যোগদানের মধ্যবর্তী সময়টিকে বলা হয় ঘর্ষণমূলক বেকারত্ব। এটি মূলত শ্রমবাজারের গতিশীলতার অংশ। উন্নত কর্মপরিবেশ খোঁজা বা নতুন দক্ষতা অর্জনের জন্য মানুষ অনেক সময় স্বেচ্ছায় কিছুকাল কর্মহীন থাকেন। বেসরকারি খাতের অস্থিরতা বা বেতন বৈষম্যের কারণে বাংলাদেশে এ ধরনের বেকারত্ব দিন দিন বাড়ছে।
৭. স্বেচ্ছাবেকারত্ব: শর্তের অমিল ও হতাশা
যখন কোনো কর্মক্ষম ব্যক্তি চাকরির পরিবেশ, বেতন বা শর্ত পছন্দ না হওয়ায় কাজ গ্রহণ করেন না, তাঁকে স্বেচ্ছা বেকারত্ব বলা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অনেক সময় হতাশা থেকে তৈরি হয়। অনেক তরুণ দীর্ঘ সময় ভালো সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একপর্যায়ে কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলেন। বেতন যখন জীবনযাত্রার খরচের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য হয়, তখন অনেকেই বেকার থাকাকেই শ্রেয় মনে করেন।
পরিসংখ্যান বনাম বাস্তবতা: বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
বেকারত্বের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে যথাযথ নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপপরিচালক আজিজা রহমান বলেন, ‘আমরা আইএলওর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বছরে তিন ধাপে জরিপ করি। সব শ্রেণি সরাসরি না এলেও সামগ্রিক একটি চিত্র আমরা দেওয়ার চেষ্টা করি।’
তবে উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক মাহা মির্জা মনে করেন, দেশি শিল্পের প্রসার না ঘটলে এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না বাড়লে এই সংকট কাটবে না। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর কারখানা বন্ধ হচ্ছে, বিনিয়োগ কমছে। নীতিনির্ধারকদের খুঁজে বের করতে হবে কেন কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে।’
অন্যদিকে বিআইডিএসর গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক অতনু রাব্বানির মতে, ‘শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বড় দেয়াল তৈরি হয়েছে। দক্ষ জনবল তৈরি এবং শিল্পায়ন—দুটিকে একসঙ্গে না চালালে বেকারত্বের এই সাতটি রূপ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।’
বেকারত্বকে কেবল ২৬ লাখের একটি সংখ্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি কাঠামোগত ব্যাধি। তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ, শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার ছাড়া রাকিবুলদের মতো হাজারো তরুণের এই দীর্ঘশ্বাস দূর করা সম্ভব নয়।