অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থী ভিসায় কড়াকড়ি: বাংলাদেশিদের করণীয় কী কী
অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও অভিবাসন নীতিতে আকস্মিক এক পরিবর্তনের ফলে সংকটের মুখে পড়েছেন উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অব হোম অ্যাফেয়ার্স) সম্প্রতি বাংলাদেশকে ‘প্রমাণের স্তর ৩’ (এভিডেন্স লেভেল ৩) বা সর্বোচ্চ ঝুঁকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ভিসা পাওয়ার শর্তাবলি আগের চেয়ে বেশি কঠোর করা হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।
নতুন নীতিমালার কঠোর শর্তাবলি
স্বরাষ্ট্র বিভাগের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের নথিপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে। আগে যেখানে অনেক ক্ষেত্রে শিথিলতা ছিল, এখন সেখানে প্রতিটি তথ্যের পেছনে অকাট্য প্রমাণের প্রয়োজন পড়বে।
তহবিলের উৎস: যদি কোনো শিক্ষার্থীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখা টাকা ছয় মাসের কম সময়ের পুরোনো হয়, তবে সেই টাকার সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ উৎস দেখাতে হবে। আগে এটি তিন মাসের হিসাব দেখালেই চলত।
আয়ের প্রমাণ: পরিবারের সব ধরনের আয় অবশ্যই ব্যাংকের মাধ্যমে হতে হবে। অন্তত ছয় মাসের ব্যাংক হিসাবের বিবরণী জমা দেওয়া এখন বাধ্যতামূলক। নগদ আয় এখন আর গ্রহণযোগ্য হবে না।
তহবিল স্থানান্তরের প্রমাণ: জমি বিক্রয় বা বিনিয়োগ থেকে আসা অর্থের ক্ষেত্রে কেবল হলফনামা বা ঘোষণা দিলে চলবে না। ব্যাংক চেক বা ব্যাংক স্থানান্তরের প্রমাণ দেখাতে হবে। লিজ বা ইজারা থেকে আয়ের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
কর্মের অভিজ্ঞতা: স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বেতনের বিবরণী বা স্লিপ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নগদ বেতনের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার সত্যতা ও কর পরিশোধের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হবে।
বিস্তারিত সাক্ষাৎকার: এখন থেকে শিক্ষার্থীদের অনেক বেশি দীর্ঘ ও বিস্তারিত সাক্ষাৎকারের মুখোমুখি হতে পারে। সেখানে কোর্সের বিস্তারিত তথ্য, বাসস্থানের পরিকল্পনা, পছন্দের জায়গা, কর্মজীবনের লক্ষ্য ও পারিবারিক সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো নিয়ে গভীর প্রশ্ন করা হতে পারে।
স্বরাষ্ট্র বিভাগের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের নথিপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে। আগে যেখানে অনেক ক্ষেত্রে শিথিলতা ছিল, এখন সেখানে প্রতিটি তথ্যের পেছনে অকাট্য প্রমাণের প্রয়োজন পড়বে।
শিক্ষার্থীরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন
১. ভিসা প্রত্যাখ্যানের উচ্চ হার: নথিপত্রের ছোটখাটো ত্রুটি বা আয়ের উৎসে অস্পষ্টতা থাকলে সরাসরি ভিসা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা আগের চেয়ে অনেক বাড়বে।
২. সময়ক্ষেপণ: নতুন নিয়মে প্রতিটি নথি আলাদাভাবে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বা সরাসরি যাচাই করা হতে পারে। ফলে ভিসা পেতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগতে পারে।
৩. আর্থিক জটিলতা: বাংলাদেশে অনেক পরিবার জমি বিক্রয় বা ব্যবসার ক্ষেত্রে নগদ লেনদেন করে থাকে। ব্যাংক লেনদেনের অকাট্য প্রমাণ না থাকায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আবেদনের সুযোগ হারাতে পারেন।
৪. সাক্ষাৎকারের আতঙ্ক: ইংরেজির দক্ষতা, অস্ট্রেলিয়ার আবাসন ও কোর্স সম্পর্কে গভীর জ্ঞান না থাকলে সাক্ষাৎকারে উত্তীর্ণ হওয়া কঠিন হতে পারে।
সম্ভাব্য সমাধান ও শিক্ষার্থীদের করণীয়
এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সঠিক প্রস্তুতির মাধ্যমে সফল হওয়া সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের নিচের বিষয়গুলোয় নজর দিতে হবে—
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: অন্তত ছয় মাস আগে থেকে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লেনদেন সচল রাখতে হবে। হঠাৎ বড় অঙ্কের টাকা জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
কাগজপত্রের স্বচ্ছতা: প্রতিটি লেনদেনের ব্যাংক চেক বা ডিজিটাল রসিদ সংগ্রহ করে রাখতে হবে। হলফনামার চেয়ে ব্যাংক দলিলের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি: আবেদনকৃত বিশ্ববিদ্যালয়, কোর্স ও সংশ্লিষ্ট শহর সম্পর্কে বিস্তারিত পড়াশোনা করতে হবে। প্রথাগত উত্তরের বাইরে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্পষ্টভাবে বলতে হবে।
সঠিক পরামর্শক নির্বাচন: অসাধু বা অদক্ষ এজেন্টের মাধ্যমে আবেদন না করে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃত প্রতিনিধিদের সহায়তা নেওয়া উচিত।
অস্ট্রেলিয়ার সরকার যদিও ২০২৬ সালের জন্য লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বাড়িয়েছে, তবে গুণগত মান নিশ্চিত করতে তাদের এই কড়াকড়ি অন্য দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ তৈরি করলেও বাংলাদেশের জন্য তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এখন কেবল মেধা নয়, নথিপত্রের সত্যতা ও স্বচ্ছতাই হতে পারে অস্ট্রেলিয়ার ভিসা পাওয়ার অন্যতম চাবিকাঠি।
*কাউসার খান, অভিবাসন আইনজীবী ও প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি।
ই–মেইল: [email protected]