ডানে বিপদ, বামে বিপদ

কার্টুন: এস এম রাকিব

জীবনটা তো এখন অনেকটা বাংলাদেশের রাস্তার মতো। ডানে তাকালে বিপদ, বামে তাকালেও বিপদ। আজকাল কোথাও যাওয়ার আগে মানুষ আর পথের দূরত্ব মাপে না, বিপদের পরিমাণ মাপে। আমার বন্ধু শুভ তো বলেই ফেলল, ‘বন্ধু, আগে বল—কোন পথে বিপদ কম?’ কারণ, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেই এখন ‘ডানে বিপদ, বামে বিপদ’।

সকালে অফিসের উদ্দেশে বের হয়েই প্রথম যে বিপদে পড়বেন, সেটা হলো রাস্তা। ডান দিকে হাঁটলে মোটরসাইকেল বা গাড়ি, আর বাঁ দিক দিয়ে হাঁটলে অটোরিকশা। কিন্তু আপনি রাস্তায় কেন হাঁটতে যাবেন? আপনি তো হাঁটবেন ফুটপাত দিয়ে। সেখানেই তো আরেক বিপদ। ফুটপাত দখল করে বসে আছে রাজ্যের দোকানপাট। হেন কোনো দোকান নেই, যে দোকান ফুটপাতে নেই!

অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে ভাবলেন, হেঁটে লাভ নেই, রিকশাতেই যাই। রিকশাওয়ালা বলল, ‘ভাই, ভাড়া বেশি দেওন লাগব।’ আপনি ভাড়া কমানোর চেষ্টা করলে সে মুখের ওপর বলবে, ‘অন্য রিকশা দেখতে পারেন।’ কী একটা অবস্থা! হাঁটতে গেলে রাস্তার বিপদ; রিকশায় গেলে ভাড়ার বিপদ!

 অগত্যা বাসেই উঠলেন। ভাবলেন, এবার অন্তত একটু শান্তি পাওয়া যাবে। ভুল, সবই ভুল! বাসে সিট নেই, দাঁড়ানোর জায়গাও নেই। কোনোভাবে বাদুড়ঝোলা হয়ে আছেন, এমন সময় একজন বলবে, ‘ভাই, একটু চাপেন।’ চাপতে গিয়ে চিড়ে-চ্যাপটা হওয়ার জোগাড়। এর মধ্যেই হেলপার অ্যাথলেটের মতো এঁকেবেঁকে ভাড়া তুলতে তুলতে হাজির হয়ে বলল, ‘হইরা দাঁড়ান, হইরা দাঁড়ান।’ আপনি আরও চাপতে গিয়ে এমন এক অবস্থায় পড়বেন, যেন সিটে বসা যাত্রীর কোলে বসে পড়ার অবস্থা! কী যে অবস্থা—ডানে বিপদ, বামে বিপদ।

 অফিসে পৌঁছেও বিপদ শেষ হয় না। বস বলবেন, ‘কাজটা একটু তাড়াতাড়ি করে দিন তো।’ আপনি কাজটা তাড়াতাড়ি করলেন। কিছুক্ষণ পর বস কাজটা দেখে ভ্রু কুঁচকে বলবেন, ‘এত তাড়াতাড়ি করলেন কীভাবে? ঠিকমতো করছেন তো?’ এর পরের কাজটা করতে তাই একটু সময় বেশি নিলেন। এবার বসের প্রশ্ন, ‘এত সময় লাগল কেন?’ ফাঁকি দিছেন নিশ্চয়ই!

 সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিপদের অভাব নেই। পোস্ট দিলে বিপদ। পোস্ট না দিলেও বিপদ। কারও ছবিতে লাইক দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে অন্যজনের প্রশ্ন, ‘ওনার ছবিতে লাইক দিলেন, আমারটায় দিলেন না কেন?’ আপনি সবার পোস্টে লাইক দিতে শুরু করলেন। তখন নতুন বিপদ। কেউ কেউ বলবে, ‘সবকিছুতেই লাইক দেন কেন?’ কারও পোস্টে মন্তব্য করলেন, তাতেও বিপদ। মন্তব্য করলেন না, ‘কী ব্যাপার, এত চুপচাপ কেন, কোনো সমস্যা?’

 রাজনীতির প্রসঙ্গ এলে বিপদ আরও বেশি। এক পক্ষের কথা বললে অন্য পক্ষ অসন্তুষ্ট। কোনো পক্ষের কথা না বললে দুই পক্ষই সন্দেহ করে। আপনি বললেন, ‘আমি কোনো দলের না।’ সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন, ‘নিরপেক্ষ মানুষ হয় নাকি?’ তাই রাজনীতির বিষয়ে সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল হলো চুপ থাকা। কিন্তু চুপ থাকলেও রেহাই পাবেন না। হাসলেও সন্দেহ করবে, না হাসলেও সন্দেহ করবে। রাজনীতিতে তাই নিরপেক্ষ থাকার সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজের মুখটাকে নিরপেক্ষ রাখা!

 বাড়িতে ঢুকেও মানুষ নিরাপদ না। স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, ‘শুনছ, আজ আমাকে কেমন লাগছে?’ আপনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘খুব সুন্দর লাগছে।’ তখন বউ বলবে, ‘শুধু আজকেই সুন্দর লাগছে?’ এবার বুঝলেন, ডানেও বিপদ, বামেও বিপদ। চুপ করে থাকলে আরও বিপদ। তাই সংসারে ঝুঁকিবিহীন উত্তর হলো, ‘তুমি সব সময়ই সুন্দর।’

 বাজারে গেলেও রেহাই নেই। দাম জিজ্ঞেস করলে দোকানি এমন ভাব করবে, যেন পণ্যটি সরাসরি দুবাই থেকে বিমানে এসেছে। বললেন, ‘ভাই, একটু কম রাখেন।’ দোকানি বুক চাপড়ে বলবে, ‘লাভ হয় না, ভাই! আপনাকে তো কেনা দামেই দিচ্ছি।’ পাশের দোকানে একটু কম দামে পেয়ে খুশিমনে কিনে বাড়ি ফিরলেন। এসে দেখলেন, ওজন কম! বুঝলেন, বাজারে ঠকারও বৈচিত্র্য আছে—কোথাও দামে, কোথাও ওজনে; অর্থাৎ পকেটের বিপদ!

 তাই আমাদের জীবনের একটা ট্রাফিক সাইন দরকার। যেখানে লেখা থাকবে, ডানে বিপদ, বামেও বিপদ।