শিশুর বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে যেভাবে

বই পড়ে আনন্দে সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন শিশু–কিশোরদেরছবি: সুমন ইউসুফ

বগুড়ার তরুণ কবি নিখিল নওশাদ ও সান্ত্বনা খাতুন দম্পতির কথা মনে আছে? ২০২২ সালে বিয়ের দেনমোহর হিসেবে টাকা বা সোনাদানা নয়, নিখিলকে দিতে হয়েছে ১০১টি বই। সে সময় ‘প্রিয় বই’য়ের একটি তালিকাও তাঁকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন হবু বধূ। সেই তালিকা অনুযায়ী বিভিন্ন বইয়ের দোকান তন্ন তন্ন করে খুঁজে বই সংগ্রহ করেছিলেন নিখিল।

কাবিননামায় দেনমোহরের জায়গায় ১০১টি বই লিখতে অপারগতা জানিয়েছিলেন কাজি। পরে বইয়ের সংখ্যা উল্লেখ করে মূল্য বাবদ একটি অর্থ ধরা হয়। বইয়ের সংখ্যাসহ সেই অঙ্কের অর্থ কাবিননামায় দেনমোহর বাবদ লেখা হয়। এভাবে বিয়ের আনন্দ আয়োজনে স্বামীর কাছ থেকে অন্য কিছুর বদলে বই উপহার নিয়েছিলেন সান্ত্বনা খাতুন।

দেনমোহর হিসেবে না হলেও আগের যুগে বিয়েতে বই দেওয়ার চল ছিল। এমনকি হাল আমলে নিজের বিয়েতেও পেয়েছিলাম কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাস সমগ্র। মনে পড়ে, মায়ের বইয়ের তাক ছিল না। ছিল কাপড়ের আলমারি।

ওই আলমারির এক কোণে সাজানো ছিল বেশ কয়েকটি বই। কাপড় বের করার ছলে বইগুলো নিতে চাইতাম। মা দিতেন না। ক্লাস এইটের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে মা নিজেই সেখান থেকে একটি বই বের করে পড়তে দিয়েছিলেন। শর্ত ছিল, বইয়ে কোনো দাগ কাটা যাবে না। পড়া শেষে বই আবার ওই আলমারিতে রাখতে হবে। কারণ, এসব মায়ের বিয়েতে পাওয়া উপহার।

ছোটবেলায় নিয়মিত বইয়ের দোকানে নিয়ে গেলে শিশুর মধ্যে পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা সহজ হয়
মডেল: প্রিয়ান

সে সময় দুপুরে না ঘুমিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে শেষ করেছিলাম বিমল মিত্রের সাহেব

বিবি গোলাম। মায়ের আলমারির তাকে সাজানো বইয়ের মধ্যে আরও ছিল শংকরের চৌরঙ্গী ও আশাপূর্ণা দেবীর প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা আর বকুলকথা।

এই যে বিয়েতে মায়ের উপহার পাওয়া বই কত বছর পরে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই পাঠই তো আরও আরও পাঠের দিকে টেনে নিয়ে গেছে আমাকে। এরপর ধীরে ধীরে মুহম্মদ জাফর ইকবালের আমার বন্ধু রাশেদ, রাজু ও আগুনালির ভূত, বকুলাপ্পু; হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, মাতাল হাওয়া ছাড়াও হিমু ও মিসির আলি সিরিজ; মাহমুদুল হকের কালো বরফ, জীবন আমার বোনপ্রতিদিন একটি রুমাল; শহীদুল জহিরের মুখের দিকে দেখি; আনিসুল হকের মা, নিধুয়া পাথার, আয়েশামঙ্গল; জহির রায়হানের বরফ গলা নদী, হাজার বছর ধরেসহ আরও কত বই পড়েছি। মজার ব্যাপার হলো, এসব বইয়ের অনেকগুলোই কিন্তু উপহার পাওয়া। ঈদের সময় কাজিনরা নিয়ে আসত এসব উপহার। কিছু বইয়ের গল্প মনে আছে, এখন আর নাম মনে নেই।

মা যদি যত্ন করে তাঁর বিয়েতে উপহার পাওয়া বইগুলো সংগ্রহে না রাখতেন, তাহলে কি এই পাঠাভ্যাস গড়ে উঠত, দেখতে পারতাম এই অচেনা পৃথিবীর রূপ! কারণ, বই হলো এক আশ্চর্য দুরবিন। এই দুরবিনে চোখ রাখলে দেখা যায় অচেনা পৃথিবীর রূপ।

আরও পড়ুন
ছোটবেলা থেকে শিশুর পড়ার অভ্যাস গড়ে দিতে পারে কিছু নির্বাচিত বই
মডেল: ফারহান ও অন্নপূর্ণা, ছবি: কবির হোসেন

পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর সারা বিশ্বের প্রকাশনা সংস্থাগুলো থেকে বের হয় প্রায় ৪০ লাখ বই। আর আমাদের বাংলা একাডেমির তথ্য বলছে, বাংলাদেশে গত বছরের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ৩ হাজার ২৯৯টি নতুন বই।

আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৭৩০। এরপরও বই পড়া কমে গেছে। প্রকাশকদের অভিযোগ, কমে গেছে বই কেনাও। সবাই এখন স্মার্টফোনে ব্যস্ত। মানুষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আত্মকেন্দ্রিক হচ্ছে।

সহিংসও হয়ে উঠছে। এ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে বই পড়তে হবে। বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। আর সেই সুযোগ সহজেই এনে দিয়েছে বইমেলা ও ঈদ উৎসব

অনিশ্চয়তার দোলাচল কাটিয়ে মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ প্রান্তে এসে শুরু হয়েছে অমর একুশে বইমেলা। পবিত্র রমজান মাসের কারণে ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মেলার সময়সূচিতেও এসেছে পরিবর্তন।

১৫ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে। ছুটির দিন চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।

ঈদে কমবেশি সবাই কেনাকাটা করেন। সবারই কিছু না কিছু বাজেট থাকে। সেই বাজেট থেকে অল্প কিছু বাঁচিয়ে নিজের জন্য অথবা প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার জন্য একটি বই কেনা সম্ভব। আবার ঈদে বড়রা ছোটদের সালামি দেন।

সালামি হিসেবে বই উপহার দিতে পারেন। কিংবা অর্ধেক সালামি ক্যাশে আর বাকি অর্ধেক সালামি বই উপহারের মাধ্যমে দিতে পারেন আবার সালামির খামে বই ঢুকিয়ে উপহার দিতে পারেন। এতে ঈদ আনন্দে বৈচিত্র্য আসবে। ঈদ বা বিশেষ উৎসবে প্রথাগত উপহারের বদলে বই উপহার দিলে নতুন পাঠক তৈরি হয়, উপহারেও আসে ভিন্নতা।

ছোটবেলায় ঈদ, কোনো উৎসব বা কারও বিয়ে বা অন্য কোনো আয়োজনে বাড়ির অভিভাবক বা আত্মীয়স্বজন বেড়াতে এসে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন করতেন—পথের পাঁচালী পড়োনি? প্রথম আলো? শার্লক হোমসের দ্য হাউন্ড অব দ্য বাস্কারভিলস নিশ্চয়ই পড়েছ? উত্তর ‘না’ হলে তাঁদের চোখে সেটা অপরাধ।

স্কুল-কলেজে যেমনই করি না কেন, সাহিত্য-সংস্কৃতির খোঁজ রাখতেই হতো। সেটা আমাদের জানার পরিধি আরও বাড়িয়ে তুলত। আর এ রকম উৎসবের দিনগুলো বই পড়া, বই কেনা বা উপহার পাওয়ার উপলক্ষ হয়ে আসত।

ঈদ ও মেলা এবার প্রায় কাছাকাছি পড়েছে। নানা ব্যস্ততা আর রোজার কারণে মেলায় যদি না–ও যেতে পারেন, প্রথমা ডটকম, রকমারি ডটকম, বাতিঘর প্রকাশন বা স্বপ্ন ৭১ ডটকম আছে না! তাদের মাধ্যমে অনলাইনে নতুন বই অর্ডার করে প্রিয়জনের ঠিকানায় উপহার হিসেবে পাঠাতে পারেন।

অনলাইনের মাধ্যমে বই উপহার দিয়ে প্রিয়জনদের চমকে দেওয়া যায়। আর ঈদের ছুটিতে অনেক অবসর থাকে। এই সময়ে বই পড়ার বেশ সুযোগও থাকে। তাই এবার ঈদ উৎসব হোক বইয়েরও উৎসব। এই আশ্চর্য দুরবিনে চোখ রেখে দেখি অচেনা পৃথিবীর রূপ।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন