‘হুদা বিউটি’ বয়কটের ডাক, বিউটি মোগল হুদা কাত্তানকে নিয়ে কেন এত বিতর্ক?

প্রসাধনীর জগতে ‘হুদা বিউটি’ এখন এক বিশাল নাম। ব্র্যান্ডটির প্রতিষ্ঠাতা হুদা কাত্তান কেবল একজন সফল উদ্যোক্তাই নন, বরং আধুনিক বিউটি ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। সাহসী মতামত আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরব উপস্থিতির কারণে লাখো তরুণীর আইকন হয়ে উঠেছেন। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তায় এখন বড় ভাটার ইঙ্গিত। বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরেশোরে চলছে ‘বয়কট হুদা বিউটি’ ট্রেন্ড।

‘হুদা বিউটি’র প্রতিষ্ঠাতা হুদা কাত্তানছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

কেন বয়কটের ডাক এল?

ইরানের চলমান বিক্ষোভ নিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করায় এই বিতর্কের সূত্রপাত, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর অতীতের কিছু রাজনৈতিক মন্তব্য। সব মিলিয়ে তুমুল তোপের মুখে পড়েছে হুদা কাত্তানের হাজার কোটি টাকার প্রসাধনী সাম্রাজ্য।

বিতর্কের শুরুটা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুদা কাত্তান ইরান–সংক্রান্ত একটি ভিডিও শেয়ার করার পর। অভিযোগ উঠেছে, ইরানের চলমান বিক্ষোভ নিয়ে তিনি যে ভিডিওটি শেয়ার করেছেন, তা পরোক্ষভাবে ইরান সরকারের ‘প্রো-রেজিম’ বা সরকারপন্থী আখ্যানকেই প্রচার করছে।

বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরেশোরে চলছে ‘বয়কট হুদা বিউটি’ ট্রেন্ড
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

ইরানের সাধারণ জনগণ এবং আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন, ওই ভিডিওতে ইরানের বাস্তব চিত্র, বিশেষ করে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়নের বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। ভক্তদের একাংশের মতে, হুদা কাত্তানের মতো বিশাল প্রভাববিস্তারকারী একজন ব্যক্তির কাছ থেকে এমন একপাক্ষিক বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শেয়ার করা সাধারণ মানুষের প্রতি এক ধরনের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’।

আরও পড়ুন

কেন ইরানিরা ক্ষুব্ধ?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানি অ্যাকটিভিস্টরা বলছেন, হুদা কাত্তান পরিস্থিতির গভীরতা না বুঝেই মন্তব্য করেছেন। তাঁদের মতে, যেখানে ইরানিরা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়ছেন, সেখানে হুদা এমন সব দৃশ্য বা ন্যারেটিভ শেয়ার করেছেন, যা সরকারের পক্ষে যায় এবং আন্দোলনকারীদের কণ্ঠস্বরকে ছোট করে দেখায়।

ভক্তরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যুতে কথা বলার আগে একজন গ্লোবাল ইনফ্লুয়েন্সারের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।

প্রসাধনীর জগতে ‘হুদা বিউটি’ এখন এক বিশাল নাম
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

পুরোনো বিতর্ক আর নতুন ক্ষোভ

বর্তমান উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হুদা কাত্তানের পুরোনো কিছু বিতর্ক। গত বছর ইসরায়েল ও বৈশ্বিক সংঘাত নিয়ে তাঁর কিছু মন্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। সে সময় অভিযোগ উঠেছিল, তিনি বিশ্বযুদ্ধ এবং সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে এমন কিছু তথ্য শেয়ার করেছিলেন, যা ইহুদিবিদ্বেষী এবং ভুল তথ্যে ভরা।

তখন টিকটক প্ল্যাটফর্ম তাঁর সেই কনটেন্টগুলো নীতিমালা ভঙ্গের দায়ে সরিয়ে দিয়েছিল। সেই পুরোনো ক্ষোভ আর বর্তমানের ইরান ইস্যু—দুয়ে মিলে হুদা বিউটির বিরুদ্ধে জনমত এখন প্রবল আকার ধারণ করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানি অ্যাকটিভিস্টরা বলছেন, হুদা কাত্তান পরিস্থিতির গভীরতা না বুঝেই মন্তব্য করেছেন
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

চাপে পড়েছে সেফোরার মতো ব্র্যান্ডগুলো

এই বয়কট আন্দোলন কেবল ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকেই সীমাবদ্ধ নেই। ভোক্তারা এখন বড় বড় প্রসাধনী বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান বা রিটেইলারদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম বড় বিউটি রিটেইলার ‘সেফোরা’র ওপর চাপ বাড়ছে হুদা বিউটির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য।

বিশ্বের অন্যতম বড় বিউটি রিটেইলার ‘সেফোরা’র ওপর চাপ বাড়ছে হুদা বিউটির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

অনলাইনে বিভিন্ন পিটিশনে হাজার হাজার মানুষ স্বাক্ষর করছেন, যেখানে ব্র্যান্ডগুলোর কাছে নৈতিক অবস্থান নেওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে। যদিও সেফোরা বা অন্য বড় রিটেইলাররা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেয়নি, তবে গ্রাহকদের এই রোষানল ব্যবসার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

আরও পড়ুন

হুদার নীরবতা এবং প্রভাবের দায়বদ্ধতা

এত সব হট্টগোলের মধ্যেও হুদা কাত্তান এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেননি বা ক্ষমা চাননি। বিবিসির ২০২৩ সালের অন্যতম প্রভাবশালী নারীর তালিকায় স্থান পাওয়া এই উদ্যোক্তার নীরবতা ভক্তদের আরও ক্ষুব্ধ করেছে।

এত সব হট্টগোলের মধ্যেও হুদা কাত্তান এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেননি বা ক্ষমা চাননি
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান যুগে ইনফ্লুয়েন্সারভিত্তিক ব্যবসার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এটিই। যখন কোনো ব্র্যান্ড একজন ব্যক্তির ইমেজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সেই ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতামত বা ভুল পদক্ষেপ পুরো ব্যবসার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।

ভোক্তারা এখন কেবল পণ্য দেখেন না, তাঁরা স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতাও খোঁজেন। হুদা বিউটির এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, তারকাখ্যাতির সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ববোধও থাকা জরুরি। রাজনীতি, ক্ষমতা এবং ব্যবসার এই জটিল সমীকরণে হুদা কাত্তান শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান কীভাবে সামাল দেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: সিএনএন বিজনেস ও বিবিসি

আরও পড়ুন