নেটফ্লিক্সের ‘ব্রিজেটন’ সিরিজের পোশাক কি ঠিক আছে? রিজেন্সি যুগের ফ্যাশন আসলে কেমন ছিল
জনপ্রিয় রিজেন্সি যুগের রোমান্স সিরিজ ‘ব্রিজেটন’ নেটফ্লিক্সে ফিরে এসেছে নতুন সিজন নিয়ে। ২৯ জানুয়ারি এই সিজনের প্রথম ভাগ এসেছে, দ্বিতীয় ভাগ দেখা যাবে ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে। নির্মাতাদের আশা, রোমান্টিক সিরিজের তালিকায় আবারও শীর্ষস্থান দখল করবে এই শো। গল্পের মতোই আলোচনায় থাকে সিরিজটির পোশাক, সাজসজ্জা।
যাঁরা অবহিত নন এই সিরিজ নিয়ে, তাঁদের জন্য বলছি, ‘ব্রিজেটন’ মূলত রোমান্টিক ও বিকল্প ইতিহাসের টেলিভিশন সিরিজ, যা ব্রিটিশ রিজেন্সি যুগের (প্রায় ১৮১১-১৮২০) সমাজকে তুলে ধরেছে। গল্পের শুরু ১৮১৩ সালে। আঠারো শতকের শুরুর দিকের ফ্যাশনকে ‘ব্রিজেটন’ যেভাবে নাটকীয়ভাবে তুলে ধরেছে, সেটা নিয়ে ফ্যাশন দুনিয়ায় প্রশ্ন উঠেছে অনেক।
অনেকেরই কৌতূহল, এসব পোশাক কি সত্যিই রিজেন্সি যুগে পরা হতো? এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি। ‘ব্রিজেটন’-এর নির্মাতারা কখনোই ইতিহাসকে হুবহু তুলে ধরার দাবি করেননি। সেটা এই সিরিজের মূল উদ্দেশ্যও নয়। গল্পটি সাজানো হয়েছে কল্পনার এক ব্রিটেনে, যেখানে আধুনিক সংগীত বাজে আর চরিত্ররা কথা বলে আজকের দিনের ভাষায়।
তবু অস্বীকার করার উপায় নেই, ১৭৯৫ থেকে ১৮৩৭ সালের রিজেন্সি যুগকে ‘ব্রিজেটন’ যেভাবে রঙিন, প্রাণবন্ত আর খানিকটা অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছে, তাতে সে সময়ের আনন্দ, সাহস আর সামাজিক পরিবর্তনের আবহ কিছুটা হলেও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। অনেক গম্ভীর ও বাস্তবধর্মী উপস্থাপনার চেয়ে এই রূপকল্প হয়তো ইতিহাসের মেজাজটাকে ভালোভাবে ধরতে পেরেছে।
রিজেন্সি যুগ মানেই শুধু রাজনীতি বা ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটা ছিল পোশাকের দুনিয়ায়ও বড় মোড় ঘোরানোর সময়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে ফ্যাশন প্রায় অপরিবর্তিত ছিল, সেই ধারায় দেখা যায় ভাঙন। পোশাকের কাট, কাপড়ের ব্যবহার, সাজের ধরন—সবকিছুর মধ্যেই দেখা দেয় নতুন ভাবনা ও সাহসী পরিবর্তন।
এর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে ব্রিটিশ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির পুরো কাঠামো। মজার বিষয় হলো, এই সময়ের ফ্যাশনের নেতৃত্বে ছিলেন না কোনো রানি বা রাজকুমারী; বরং রিজেন্সি যুগের ফ্যাশনধারা গড়ে উঠেছিল প্রিন্স রিজেন্টের আড়ম্বরপূর্ণ ও বিতর্কিত প্রেমিকাদের হাত ধরে। তাঁদের বিলাসী জীবনযাপন, সাহসী পোশাক আর সামাজিক আলোচনাই তখন ঠিক করে দিচ্ছিল কী পরা হবে, কীভাবে পরা হবে না।
‘প্রিন্স রিজেন্ট’ বলতে সাধারণত যুক্তরাজ্যের রাজা চতুর্থ জর্জকে বোঝানো হয়। ১৮১১ থেকে ১৮২০ পর্যন্ত তিনি তাঁর অসুস্থ বাবা, রাজা তৃতীয় জর্জের হয়ে রাজকার্য পরিচালনা করেছিলেন। এই সময়ের জন্যই পরিচিত ‘রিজেন্সি পিরিয়ড’। প্রিন্স রিজেন্ট পছন্দ করতেন বিলাসবহুল জীবনযাপন। শিল্পসাহিত্য ও ফ্যাশনের বড় পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন তিনি। তবে এই বিলাসিতা ও শোভা সব সময়ই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকত।
এম্পায়ার-লাইন ড্রেসের ইতিহাস ও সাজ
ফরাসি ভাষায় বলা হয় ‘আম্পিয়ার ওয়েস্ট’। ইংরেজিতে ‘এম্পায়ার-ওয়েস্ট’। এটি ফরাসি বিপ্লবের পরের বছরগুলোয় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে সময়ের উঁচু সমাজের জটিল ও অতিরিক্ত সাজ অনেকের কাছেই বেঠিক মনে হতো। তাই মানুষ সরল ও সহজ পোশাকের দিকে আকৃষ্ট হয়, যেমন রোমান ও গ্রিক শিল্পে দেখা যেত। আঠারো শতকের দিকে এই স্টাইল পুরোপুরি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সাধারণত এসব পোশাকের সঙ্গে পরা হতো তুলার সেমিজ এবং ‘ফিশু’ নামের ছোট শাল। ফিশু ঘাড়ের চারপাশ ঢেকে পোশাকের ওপরের অংশে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। এর ফলে এম্পায়ার স্টাইলের নিচু নেকলাইন ঢেকে যেত। বুকের অনাবৃত অংশ চোখে পরত না।
‘ব্রিজেটন’–এর সিজন ফোরে বাড়ির সহযোগীদের পোশাকে এর ব্যবহার দেখা যায়। তবে সেটা সামান্যই। এখানে দর্শকের চোখধাঁধানোর জন্য রঙিন, নাটকীয় পোশাক এবং গল্পের রোমান্সকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এম্পায়ার-লাইন ড্রেস: সহজ, কিন্তু বলার মতো অনেক কিছু
পিরিয়ড ড্রামায় এম্পায়ার-লাইনের পোশাক থাকা মানেই এক বিশেষ ভিজ্যুয়াল সংকেত। সোজা কাটের একটি সাধারণ গাউন, বুকের ঠিক নিচ থেকেই কোমর টানা হয়। এ ধরনের পোশাক দেখলেই বোঝা যায়, আমরা ইংরেজ ঔপন্যাসিক জেন অস্টেনের দুনিয়ায় ঢুকছি। এমন নকশা করা পোশাক মানেই নাচের আসর দেখা যাবে, থাকবে সেনাকর্তা—কেউ আলোচিত, কেউ আবার বিতর্কিত। শেষ হবে এক-দুটি বিয়ের দৃশ্য দিয়ে। ছোট্ট এই পোশাকের ডিজাইনই পাঠক বা দর্শককে সেই সময়ের মেজাজ, সামাজিক আচরণ আর রোমান্সের ধারণা দিতে পারে।
সাদামাটা কিন্তু মার্জিত টেইলকোট
রিজেন্সি যুগে পুরুষদের ফ্যাশন ছিল সাধারণত শান্ত, সাদামাটা; অর্থাৎ খুব বেশি চোখে না পড়ার মতো। তখন লন্ডনের সবচেয়ে ভালো পোশাক পরিধানকারী ব্যক্তি ছিলেন জর্জ ‘বিউ’ ব্রামেল। তিনি ছিলেন দোকানদারের ছেলে। কিন্তু প্রিন্স রিজেন্টের বন্ধু হওয়ায় সহজেই উঁচু সমাজে নিজের নাম তৈরি করতে পেরেছিলেন।
ব্রামেলের স্টাইলের মূল বিষয় ছিল সরল, মার্জিত এবং সহজ। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘যদি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ আপনার দিকে ঘুরে তাকায়, তাহলে আপনি ঠিকভাবে সাজেননি। হয় আপনি অতিরিক্ত ধোপদুরস্ত হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন অথবা খুব আঁটসাঁট বা ফ্যাশনেবল পোশাকে আছেন।’
বাস্তবে ব্রামেল তাঁর পোশাক নিয়ে অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। কথিত আছে, তিনি প্রতিদিন সাজগোজ করতে পাঁচ–ঘণ্টা পর্যন্ত সময় নিতেন। তাঁর স্টাইল যতই সরল দেখাক না কেন, পোশাকের প্রতিটি ছোট-বড় অনুষঙ্গ নিখুঁত থাকত। এমনকি তার ক্রেভাট বাঁধতে এবং ঠিক করতে এক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় কাটাতেন। সরলতা পছন্দ করলেও তাঁর সাজপোশাকে প্রকাশ পেত রঙিন এবং বিলাসবহুল কাপড়। ঠিক যেমনটা দেখানো হয়েছে ‘ব্রিজেটন’–এ।
জ্বলজ্বলে রং
রিজেন্সি যুগের পোশাক ‘ব্রিজেটন’–এর মতো এতটা উজ্জ্বল ছিল না। তবে সাধারণ পিরিয়ড ড্রামায় দেখা ধূসর বা মেটে রঙের তুলনায় অনেক বেশি প্রাণবন্ত এবং চোখে পড়ার মতো ছিল।
ছবিতে পেনেলোপি ব্রিজেটনের (ফিদারিংটন) পোশাকটি রিজেন্সি সময়ের রঙের একটি ধ্রুপদি উদাহরণ। এই রংকে বলা হতো ‘জঙ্কুইল’ বা ‘ড্যাফোডিল ইয়েলো’, যা নারীর পোশাকের পাশাপাশি পুরুষদের ওয়েস্টকোটেও ব্যবহার করা হতো।
তবে লাল ও নীল রংও জনপ্রিয় ছিল। মাঝেমধ্যে টুলের (জাল–জাতীয় সিল্ক) আলগা স্কার্ট ব্যবহার করা হতো সাধারণ পোশাকের ওপর। এতে পোশাকে গভীরতা এবং আলাদা স্তর চলে আসত।
বড় পালক: রিজেন্সির ফ্যাশনের চোখ ধাঁধানো শোভা
রিজেন্সি যুগের ফ্যাশন ডিজাইনাররা উটপাখির পালক খুব পছন্দ করতেন; বিশেষ করে বড়, ফোলানো ডানার পালকগুলো। উটপাখি বিশাল প্রাণী, এদের উচ্চতা হতে পারে ৯ ফুট পর্যন্ত এবং ওজন হতে পারে ১৫৬ কেজি। ডানার পালকও এ কারণে বিশাল, কখনো ৩ ফুট ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা। আঠারো শতকের ইউরোপীয় ফ্যাশনপ্রেমীরা উটপাখির পালক মাথার ব্যান্ডে লাগাতেন। কখনো কখনো টুপি বা সাজানো হেডপিস দিয়ে পালকের উচ্চতা আরও ১০-২০ সেন্টিমিটার বাড়ানো হতো, এতে সাজে চলে আসত নাটকীয়তা।
রানি শার্লট ছিলেন রক্ষণশীল
‘ব্রিজেটন’–এ রানি শার্লটকে প্রায় সব সময় দেখানো হয় আঠারো শতকের পুরোনো ফ্যাশনের পোশাকে; বড়, বহু স্তর স্কার্ট এবং সামনের দিকে ফ্ল্যাট করসেট পরা। বাস্তবেও এটি মোটামুটি ঠিক। শার্লটের সময়ের পোশাক খুবই কাঠামোবদ্ধ ছিল। স্কার্টগুলোও ছিল বিশাল। আর ‘বড়’ বলতে সত্যিই বড়—আঠারো শতকের ইউরোপীয় রাজকীয় দরবারে যেসব স্কার্ট পরা হতো, তা হতো অনেকটাই প্রশস্ত। ১৭৫০-এর দশকে জনপ্রিয় ‘গ্র্যান্ড হ্যাবিট’-এর স্কার্টের প্রস্থই ছিল ৭ ফুট বা তার বেশি।
রানি শার্লটের ফ্যাশন: কোর্টে নাটকীয় প্রভাব
`ব্রিজেটন’–এর রানি শার্লটের পোশাক ঠিক দেখিয়েছে। যদিও রাজ্যে সবার ফ্যাশনধারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না, শার্লটের কিছু কঠোর নিয়ম ছিল। যেমন তাঁর উপস্থিতিতে নারীদের বড় স্কার্ট পরতে হতো। এম্পায়ার স্টাইল যখন আসে, এসব বড় স্কার্ট চলে যায়নি; বরং উঠে আসে সরাসরি কোমরের ঠিক নিচে। ‘ব্রিজেটন’–এ আঠারো শতকের শুরুর দিকে নারীর জীবনের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হয়েছে। বিয়েই তখন অনেক নারীর জন্য একমাত্র পথ ছিল। তবে পোশাককে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেটা ইতিহাসের দিক থেকে পুরোপুরি সঠিক নয়।
এটি ১৮১৩ সালের রিজেন্সি যুগের একটি স্টাইলিশ কল্পিত ব্যাখ্যা, যেটা দর্শক গ্রহণ করেছেন বেশ ভালোভাবেই।চিন্তা করে দেখলে ভুল রং বা অসামঞ্জস্যপূর্ণতা গল্প উপস্থাপনের খাতিরেই করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফিদারিংটন পরিবারের উজ্জ্বল গোলাপি বা কটকটে হলুদ আর সবুজ গাউন। ইতিহাসবিরুদ্ধ মনে হলেও চরিত্রের ধরন অনুযায়ী এটি আবার ঠিক আছে। তারা চটকদার, নতুন ধনবান, চেহারা আর টাকার জন্য নিজেদের সেভাবে প্রকাশ করেছে। ‘ব্রিজেটন’–এর পোশাক ইতিহাসে ভুল হলেও চরিত্রকে জীবন্ত আর সাহসী করে তুলেছে। চিন্তা করে দেখলে, এখনকার যুগে গল্পের জন্য কখনো কখনো ইতিহাসকেও ছাড় দিতে হয়।
সূত্র: গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড