শিশুর অ্যাডিনয়েডের সমস্যা আছে কি না, বুঝবেন কীভাবে, সমাধান কী
মানবদেহ ইমিউন সিস্টেম দিয়ে সুরক্ষিত থাকে, যা আমাদের বিভিন্ন ধরনের জীবাণুর আক্রমণ ও অন্যান্য অসুস্থতা থেকে রক্ষা করতে সারাক্ষণ কাজ করে। এই ইমিউন সিস্টেমের একটি অংশ হলো অ্যাডিনয়েড, যা ফ্যারিঞ্জিয়াল টনসিল নামেও পরিচিত। শ্বাস-প্রশ্বাস বা খাবারের সময় বিভিন্ন রোগজীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। সেগুলো ধ্বংস করে দেয় অ্যাডিনয়েড। সে অর্থে অ্যাডিনয়েড একটি উপকারী অঙ্গ।
অ্যাডিনয়েড কী
অ্যাডিনয়েড একধরনের লিম্ফয়েড টিস্যু বা লসিকা গ্রন্থি। এটি নাকের পেছনে, মুখের ছাদের ওপরে অবস্থিত। এসব লিম্ফয়েড আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সব শিশুই অ্যাডিনয়েড নিয়ে জন্ম নেয়। দুই বছর বয়স পর্যন্ত অ্যাডিনয়েডের আকার স্বাভাবিক থাকে। দুই থেকে সাত বছর পর্যন্ত অ্যাডিনয়েড ধীরে ধীরে বড় হয়। আবার ৭ থেকে ৯ বছর পর্যন্ত অ্যাডিনয়েড সর্বোচ্চ আকারে পৌঁছায়। ৯ বছর বয়স থেকে অ্যাডিনয়েড ছোট হতে থাকে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় চলে আসে। ১২-১৩ বছরেও অ্যাডিনয়েড থাকে, তবে সেটি সংখ্যায় খুব কম।
বারবার বা দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ, যেমন শ্বাসযন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাল সংক্রমণের (সাধারণ সর্দি, সাইনাস সংক্রমণ বা কানের সংক্রমণ) কারণে অথবা অ্যালার্জির কারণে শিশুর অ্যাডিনয়েড স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে যেতে পারে। তখন বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। অ্যাডিনয়েড বড় হয়ে যখন বিভিন্ন সমস্যা তৈরি করে, তখন সেটি শিশুর জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অ্যাডিনয়েড স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হলে কী হয়
শিশুর চেহারায় একধরনের পরিবর্তন আসে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যাডিনয়েড ফেসিস’ নামে পরিচিত। এসব শিশু সাধারণত মুখ হাঁ করে শ্বাস নেয়, নাক দিয়ে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
দীর্ঘদিন মুখ হাঁ করে শ্বাস নেওয়ার ফলে শিশুর সামনের পাটির দাঁত স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচু এবং মাড়ি নরম হয়ে যায়।
মুখ দিয়ে লালা পড়তে পারে।
দীর্ঘদিন শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার কারণে নাকের ছিদ্রগুলো ছোট হয়ে যায়।
শিশুর বিষণ্নতা থাকতে পারে, তাকে অনেক সময় ভাবলেশহীন দেখাতে পারে।
এ ছাড়া ঘন ঘন ইনফেকশনের কারণে শিশুর কানে ব্যথা হয়, কানে কম শোনে, কান পাকে এবং কান দিয়ে পানি পড়ে।
অ্যাডিনয়েড বেশি বড় হলে শিশুর শরীরে অক্সিজেনস্বল্পতার কারণে সব সময় ঘুম ঘুম ভাব থাকে।
পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ে। বুদ্ধিমত্তা কমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়।
মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হয় বলে খাবার খেতে অসুবিধা হয়।
শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যেতে পারে।
অনেক শিশুর বড় হয়ে যাওয়ার পরও রাতে বিছানায় প্রস্রাব করার প্রবণতা থাকতে পারে।
শিশুর ঘুমেও সমস্যা দেখা দেয়। কিছুক্ষণ পরপর ঘুম থেকে উঠে যায়। ঘুমের মধ্যে ১০ থেকে ২০ সেকেন্ড বা কিছু সময়ের জন্য শ্বাস একদম বন্ধ হয়ে যাবে, এটাকে ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’ বলা হয়।
ঘুমের সময় শিশু হাঁ করে শ্বাস নেওয়ায় গোঙানির মতো শব্দ হতে পারে। সমাধান কী নাকের পেছনে কতটা অংশ অ্যাডিনয়েডের বড় হয়ে যাওয়ার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে ১-৪টি গ্রেডে ভাগ করা হয়েছে।
শিশুর এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে একজন নাক–কান–গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। খালি চোখে অ্যাডিনয়েড দেখা যায় না।
সে ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করতে হবে শিশুর অ্যাডিনয়েডের সমস্যা আছে কি না। থাকলে সেটি কোন গ্রেডে আছে, সেটিও দেখতে হবে।
বয়সভেদে বিভিন্ন ধরনের নাকের ড্রপ বা স্প্রে এবং অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয় রোগীকে।
এরপর নিয়মিত ওষুধ ও ফলোআপ চিকিৎসার মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা হয় অ্যাডিনয়েড স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে কি না। ওষুধে সমাধান না হলে ওষুধে শিশুর উন্নতি না হলে এবং অ্যাডিনয়েডের সঙ্গে শিশুর কানেও সমস্যা থাকলে অস্ত্রোপচার করতে হয়। অনেক শিশুর অ্যাডিনয়েড বড় হওয়ার সঙ্গে টনসিলেরও সমস্যা থাকে। সে ক্ষেত্রে অনেক সময় দুটোই অস্ত্রোপচার করে ফেলে দিতে হয়। অবশ্যই সে ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।