হাঁটার সময় এই ভুলগুলো করছেন না তো?

আমরা হাঁটার সময় সাধারণ কিন্তু গুরুতর ভুল করে থাকি। আপাতদৃষ্টিতে এই ভুলগুলোকে ছোট মনে হলেও দীর্ঘদিন এভাবে হাঁটলে শরীরের পেশিতে টান পড়া, জয়েন্টে ব্যথা, এমনকি বড় ধরনের ইনজুরি বা আঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ব্যাহত হয় হাঁটার আসল উদ্দেশ্য।

প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমে, মানসিক চাপ দূর হয়, সতেজ থাকে শরীর
ছবি: পেক্সেলস

সুস্থ থাকতে এবং শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরাতে হাঁটার কোনো বিকল্প নেই। এটি একটি চমৎকার ও সহজ ব্যায়াম। প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমে, মানসিক চাপ দূর হয়, সতেজ থাকে শরীর। কিন্তু আমরা অনেকেই মনে করি, হাঁটা তো খুবই সহজ একটি কাজ, এতে আবার ভুল হওয়ার কী আছে?

আসুন জেনে নেওয়া যাক, হাঁটার সময় আমরা সাধারণত কী কী ভুল করি এবং কীভাবে সেগুলোর সমাধান করা সম্ভব।

১. ভুল জুতা ও মাপের গড়মিল

অনেকেই হাঁটার সময় সাধারণ চটি, হাই হিল কিংবা শক্ত কোর্ট সু (টেনিস বা বাস্কেটবলের জুতা) পরে নেন। শক্ত জুতা পায়ের গোড়ালি থেকে আঙুল পর্যন্ত স্বাভাবিক নমনীয়তায় বাধা দেয়। আবার জুতা যদি খুব বেশি ঢিলেঢালা হয়, তবে পা সঠিক সাপোর্ট পায় না, আর খুব বেশি আঁটসাঁট হলে পায়ে ফোসকা বা কড়া পড়তে পারে।
সমাধান: হাঁটার জন্য সব সময় হালকা, নরম কুশনযুক্ত, বাতাস চলাচল করতে পারে এবং পানিনিরোধক জুতা বেছে নিন। ভালো মানের রানিং জুতাও হাঁটার জন্য বেশ উপযোগী। আর হ্যাঁ, জুতা কেনার সঠিক সময় হলো বিকেল বা সন্ধ্যাবেলা। কারণ, সারা দিনের হাঁটাচলায় এ সময় পা সামান্য ফুলে থাকে, যা জুতার সঠিক মাপ পেতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন
হাঁটার জন্য সঠিক জুতা বেছে নিন
ছবি: পেক্সেলস

২. ভুল শারীরিক ভঙ্গি

অনেকেই হাঁটার সময় কুঁজো হয়ে মাথা নিচু করে মোবাইল দেখতে দেখতে হাঁটেন। আবার কেউ কেউ শরীর পেছনের দিকে হেলিয়ে অলস ভঙ্গিতে হাঁটেন। এই দুই ধরনেই শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়, পিঠ ও কোমরের নিচের অংশে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, হয়ে ওঠে তীব্র ব্যথার কারণ।
সমাধান: হাঁটার  সময় মেরুদণ্ড সোজা রাখুন। এমনভাবে হাঁটুন, যেন মনে হয়, মাথার ওপর থেকে কোনো সুতা আপনাকে ওপরের দিকে টেনে ধরেছে। চিবুক বা থুতনি ভেতরের দিকে গুটিয়ে রাখবেন না। সোজা সামনের দিকে ১০ থেকে ৩০ ফুট দূরত্বের দিকে তাকিয়ে হাঁটুন। পাঁচ মিনিট পরপর দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে জোরে ছাড়ুন; এতে আপনার কাঁধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝুলে সঠিক ও রিল্যাক্সড পজিশনে চলে আসবে।

৩. হাত–পায়ের অতিরিক্ত নাড়াচাড়া

দ্রুত হাঁটার চক্করে অনেকেই অতিরিক্ত বড় বড় পা ফেলেন। বড় পা ফেললে গতি বাড়ার বদলে উল্টো কমে যায়। কারণ, সামনের পা যখন বেশি দূরে যায়, তখন গোড়ালি ব্রেকের মতো কাজ করে গতি কমিয়ে দেয়। একইভাবে হাত দুই পাশে ডানার মতো ছড়ানো বা বুকের ওপরে চিবুক পর্যন্ত তোলাও শক্তির অপচয়।
সমাধান: আপনার হাতের কনুই ৯০ ডিগ্রি কোণে বাঁকা রাখুন এবং হাত শরীরের পাশে রেখে স্বাভাবিকভাবে সামনে-পেছনে দোলাবেন, দুই পাশে নয়। সঠিক পায়ের মাপ বোঝার জন্য সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এক পা সামান্য সামনে বাড়িয়ে শরীরকে আস্তে আস্তে সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন। আপনার গোড়ালি যেখানে গিয়ে মাটিতে ঠেকবে, সেটাই আপনার স্বাভাবিক হাঁটার দূরত্বের মাপ। হাঁটার সময় পা মাটিতে সজোরে আছাড় না মেরে হালকাভাবে প্রথমে গোড়ালি, তারপর পাতা ও আঙুল দিয়ে মাটি পুশ করুন।

আরও পড়ুন
হাঁটা শেষে বসার আগে কিছু সাধারণ স্ট্রেচিং করুন
ছবি: পেক্সেলস

৪. ওয়ার্মআপ এবং কুলডাউন না করা

অনেকেই ঘর থেকে বের হয়েই দ্রুত হাঁটা শুরু করেন এবং হাঁটা শেষ করেই ধপ করে বসে পড়েন। এটি হার্টের ওপর হঠাৎ চাপ সৃষ্টি করে এবং পেশিকে শক্ত করে ফেলে। হঠাৎ হাঁটা থামিয়ে দিলে পায়ে রক্ত জমে গিয়ে মাথা ঘোরা বা শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার সমস্যা হতে পারে।
সমাধান: হাঁটার প্রথম পাঁচ মিনিট খুব সাধারণ গতিতে বা ‘স্ট্রোল মোডে’ হাঁটুন। এতে পেশিতে রক্ত চলাচল বাড়বে, শরীর গরম (ওয়ার্মআপ) হবে। এরপর আপনার কাঙ্ক্ষিত গতি বাড়ান। একইভাবে হাঁটা শেষ করার আগের ৫ থেকে ১০ মিনিট গতি একদম কমিয়ে দিন। হাঁটা শেষে বসার আগে পায়ের কাফ মাসল, হ্যামস্ট্রিং ও হিপসের কিছু সাধারণ স্ট্রেচিং করুন। প্রতিটা স্ট্রেস ১০-২০ সেকেন্ড ধরে রাখুন, কোনো ঝাঁকুনি দেবেন না।

৫. ভুল পানীয় পান, অতিরিক্ত ওজন বহন

হাঁটার সময় অনেকেই হাতে ডাম্বেল বা ভারী ওজন নিয়ে ঘোরেন, যা পেশির ভারসাম্য নষ্ট করে। অনেকে আবার পুষ্টির কথা ভেবে বা তৃষ্ণা মেটাতে কোমল পানীয় কিংবা এনার্জি ড্রিংকস খান। ফলে উপকারের চেয়ে শরীরে অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরি প্রবেশ করে ক্ষতি বেশি হয়।
সমাধান: হাতে এক্সট্রা ওজন না নিয়ে যদি তীব্রতা বাড়াতে চান, তবে ওয়েটেড ভেস্ট বা পিঠে ব্যাকপ্যাক ব্যবহার করতে পারেন। তবে সাধারণ হাঁটার জন্য ওসবের প্রয়োজন নেই। হাঁটার সময় সেরা পানীয় হলো সাধারণ পানি। যদি ১৫ মিনিটের বেশি হাঁটেন, তবে সঙ্গে পানির বোতল রাখুন। প্রতি ১৫ থেকে ৩০ মিনিটে আধ কাপ থেকে এক কাপ পানি পান করুন। হাত ফ্রি রাখতে বেল্ট বা ফ্যানি প্যাক ব্যবহার করতে পারেন।

আরও পড়ুন
মাঝেমধ্যে হাঁটার রুট বা রাস্তা পরিবর্তন করুন
ছবি: কবির হোসেন

৬. একঘেয়ে রুট ও রুটিন

প্রতিদিন একই রাস্তায়, একই গতিতে হাঁটলে একসময় হাঁটার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যায়। ফিটনেসের ভাষায় একে বলে ‘রুটিন মনোটনি’। মানসিক একঘেয়েমি আনার পাশাপাশি এটি পেশির কার্যকারিতাও কমিয়ে দেয়।
সমাধান: মাঝেমধ্যে হাঁটার রুট বা রাস্তা পরিবর্তন করুন। পার্ক, লেকেরপাড় বা গাছপালা ঘেরা নতুন কোনো এলাকায় যান। হাঁটায় তীব্রতা আনতে মাঝেমধ্যে ৪ থেকে ৮ শতাংশ ঢালু বা পাহাড়ি রাস্তা বেছে নিন, যা পেশি শক্ত করবে। এ ছাড়া ‘ইন্টারভ্যাল ট্রেইনিং’ করতে পারেন—যেমন ৩০ সেকেন্ড খুব দ্রুত হাঁটার পর পরবর্তী ৯০ সেকেন্ড সাধারণ গতিতে হাঁটা। সপ্তাহে এক বা দুই দিন শরীরকে বিশ্রাম দিন, যাতে পেশি রিকভারি করতে পারে।

৭. অসচেতনতা

কানে হেডফোন গুঁজে ফুল ভলিউমে গান বা পডকাস্ট শুনতে শুনতে হাঁটলে আশপাশের গাড়ির হর্ন বা অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ শোনা যায় না। আবার ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে হাঁটলে ফুটপাতে পড়ে যাওয়া বা রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৪ সালের পর থেকে মোবাইল ব্যবহারের কারণে পথচারী দুর্ঘটনার হার দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
সমাধান: কানে হেডফোন থাকলে ভলিউম এমন পর্যায়ে রাখুন, যেন বাইরের পারিপার্শ্বিক শব্দ শোনা যায়। ওপেন-ইয়ার বা বোন-কন্ডাকশন হেডফোন ব্যবহার করা আরও নিরাপদ। ফোনে কোনো জরুরি কাজ থাকলে হাঁটা থামিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে কাজটি শেষ করুন। তবে ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহার বা জরুরি প্রয়োজনে ফোনটি সঙ্গে রাখা ভালো, শুধু খেয়াল রাখুন, এটি যেন আপনার মনোযোগ কেড়ে না নেয়।

আরও পড়ুন
একা হাঁটতে ভালো না লাগলে কোনো বন্ধুকে সঙ্গে নিতে পারেন
ছবি: প্রথম আলো

বাড়তি কিছু সচেতনতা

দৃশ্যমান হোন: যদি  খুব ভোরে বা রাতে অন্ধকার থাকতে হাঁটতে বের হন, তবে অবশ্যই উজ্জ্বল রঙের (যেমন: নিয়ন, হলুদ, সাদা) বা রিফ্লেকটিভ কাপড় পরুন। প্রয়োজনে একটি ছোট লাইট সঙ্গে রাখুন, যাতে চালকেরা আপনাকে দূর থেকে দেখতে পান।
সঠিক পোশাক নির্বাচন: খুব  টাইট বা ভারী পোশাক পরে হাঁটবেন না। সুতি বা লাইটওয়েট, আরামদায়ক ও ঢিলেঢালা পোশাক পরুন। রোদ থেকে বাঁচতে সানগ্লাস, হ্যাট এবং সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।
সঙ্গী নিন: একা  হাঁটতে ভালো না লাগলে পোষা কুকুর বা কোনো বন্ধুকে সঙ্গে নিতে পারেন। যাঁরা সঙ্গী বা পোষা প্রাণী নিয়ে হাঁটেন, তাঁরা সপ্তাহে লক্ষ্যমাত্রার ১৫০ মিনিট খুব সহজেই পূরণ করতে পারেন।
হিসাব রাখুন: আপনার প্রতিদিনের অগ্রগতি ট্র্যাক করতে ফোনে কোনো ফিটনেস অ্যাপ বা একটি পেডোমিটার ডিভাইস ব্যবহার করতে পারেন। এতে প্রতিদিনের লক্ষ্য পূরণ করার একটি তাগিদ ও অনুপ্রেরণা তৈরি হবে।
হাঁটা অত্যন্ত সহজ এবং আনন্দদায়ক একটি প্রক্রিয়া। সামান্য একটু সচেতনতা এবং সঠিক কৌশল অবলম্বন করলেই আপনি এর শতভাগ সুফল পেতে পারেন।

আরও পড়ুন