যাত্রা ছিল আলাদা, তবু যেভাবে বুয়েট তাঁদের ঠিকানা হলো

দেশের নানা প্রান্তের নানা কলেজের শিক্ষার্থীরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এক হন। প্রত্যেকের বেড়ে ওঠা আলাদা, গল্প আলাদা, সংগ্রামটাও ভিন্ন। তবু লক্ষ্য এক ছিল বলেই হয়তো তাঁরা একই ক্লাসরুমে সহপাঠী হতে পেরেছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়তে আসা দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে এই তুলনামূলক চিত্রটাই তুলে ধরলেন মো. জান্নাতুল নাঈম

আমাদের স্কুলে কেউ কখনো উচ্চতর গণিত নেয়নি

জনি আহমেদ, দ্বিতীয় বর্ষ, কেমিকৌশল, বুয়েট

আমি ছিলাম রাজশাহীর পুঠিয়ার বানেশ্বর সরকারি কলেজের ছাত্র। আমার কলেজ থেকে আগে কেউ বুয়েটে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে বলে শুনিনি। নিয়মিত ক্লাসও হতো না। পরীক্ষা ও জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আমরা কলেজেও যেতাম না। তবু নিজেকে এগিয়ে নিতে আত্মবিশ্বাস তো দরকার। প্রতিবছর গ্রামের কেউ না কেউ বুয়েটে সুযোগ পেতেন। তাঁদের কথা থেকেই অনুপ্রেরণা খুঁজতাম।

বানেশ্বর সরকারি কলেজের ছাত্র ছিলেন জনি আহমেদ, এখন বুয়েটে পড়ছেন
ছবি: জনি আহমেদের সৌজন্যে

যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি

আমার তখন দুটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ছিল। একটা বন্ধুদের জন্য, অন্যটি দিয়ে বুয়েটিয়ানদের সঙ্গে যুক্ত থাকতাম। ওই অ্যাকাউন্টে প্রায় ১০০ জনের মধ্যে সবাই ছিল বুয়েটিয়ান। কীভাবে তাঁদের খুঁজে পেতাম? বুয়েটে ভর্তি হয়েই সবাই প্রোফাইলের ছবি পরিবর্তন করে। আমি সেসব খেয়াল করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট ও মেসেজ পাঠাতাম। যাঁরা রিপ্লাই দিতেন, তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলে পরামর্শ চাইতাম। ‘এভাবে পড়ছি’, ‘এসব অধ্যায় শেষ’, ‘ভর্তি প্রস্তুতি শুরু করব কি না’ বা ‘এখন কী করা উচিত?’—এভাবে নিজের অবস্থান জানিয়ে নির্দেশনা পাওয়ার চেষ্টা করেছি। (বুয়েটের বড় ভাইদের) পরামর্শ মেনেই কলেজে পড়াকালীন বুয়েটের প্রস্তুতি শুরু করি।

করোনার পরে অনলাইনে পড়াশোনার পরিধি বেড়ে যায়। ফলে ইউটিউবেই প্রচুর ফ্রি লেকচার বা কোর্স পাওয়া যেত। ইউটিউবেই আমি বিনা মূল্যে ক্লাস করেছি।

কলেজের শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়লে আলাদা আলাদা বিষয়ে পড়তে হতো, টাকাও লাগত বেশি। তাই সব বিষয় পড়ানো হয়, এ রকম একটি কোচিংয়ে পড়েছি। ভালো ছাত্র হওয়ায় কোচিং থেকে টাকা কম নিয়েছিল।

স্বপ্নপূরণের পথে

মা-বাবা বা আমি, কলেজে ভর্তির আগে বুয়েট সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না। কলেজে উঠে হাতে ফোন পাই। তখন ইন্টারনেট ঘেঁটে প্রথম এই বিশ্ববিদ্যালয় চিনেছিলাম। সেখান থেকেই স্বপ্নের শুরু। অবশ্য প্রথম দিকে ভাবিনি যে বুয়েটে উত্তীর্ণ হব। কিন্তু ভর্তি কোচিংয়ে নিজের অবস্থান দেখে আত্মবিশ্বাসী হয়েছি।

বাবা কৃষিকাজ করতেন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার হওয়া সত্ত্বেও তিনি পড়াশোনার ক্ষেত্রে কখনো কার্পণ্য করেননি। ধার করে হোক বা জমানো টাকায়—সব সময় যাবতীয় জিনিসের ব্যবস্থা করেছেন। আমার বংশে আমিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রেখেছি।

বুয়েটে সুযোগ পাওয়ার পর

কলেজের বেশির ভাগ শিক্ষকই আমাকে চিনতেন না। তবে বুয়েটে সুযোগ পেয়েছি, শুনে সবাই খুশি হয়েছেন। এখন অনুজদের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হয়, ওদের অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করি। আমি মনে করি, ঢাকার বাইরের বা মফস্‌সলের এ ধরনের কলেজগুলোয় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। স্কুলের মানও বাড়াতে হবে। যেমন আমি যে স্কুলে পড়েছি, সেখানে কখনো কেউ উচ্চতর গণিত নেয়নি। তাই আমাদেরও নিতে দেওয়া হয়নি। শিক্ষকেরা বলতেন, উচ্চতর গণিত লাগে না। ভাগ্যিস কলেজে কেউ নিতে বারণ করেনি। কারণ, উচ্চমাধ্যমিকে এ বিষয় না থাকলে বুয়েটে পরীক্ষাই দেওয়া যায় না।

আরও পড়ুন

ভর্তি প্রস্তুতির ভিত্তিটা কলেজেই গড়ে উঠেছিল

আসিফ হাসান, দ্বিতীয় বর্ষ, পুরকৌশল বিভাগ, বুয়েট

আমাদের নটর ডেম কলেজের পরিবেশটাই অন্য রকম। এখানে আপনি চাইলেও নিষ্ক্রিয় থাকতে পারবেন না। কেন? পাশে তাকালেই দেখবেন কেউ অলিম্পিয়াডে জিতেছে, কেউ আবার বিতর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লড়ছে। অনেকের ধ্যানজ্ঞান শুধু পড়াশোনায়। স্বাভাবিকভাবেই এসব আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে। শুধু বুয়েট নয়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, এমনকি বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে সবার মধ্যেই একধরনের স্বতঃস্ফূর্ত অনুপ্রেরণা তৈরি হয়ে যায়।

নটর ডেম কলেজের পরিবেশ আসিফ হাসানকে অনুপ্রাণিত করেছিল
ছবি: আসিফ হাসানের সৌজন্যে

যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি

প্রস্তুতিটা আদতে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। নটর ডেমের শিক্ষকেরা মূল বই ও পাঠ্যসূচিভিত্তিক ক্লাস নিতেন। এটা খুব কার্যকর। সপ্তাহে কুইজ হতো দুই-তিনবার। বার্ষিক পরীক্ষায় নম্বর যোগ হওয়ায় আমরা নিয়মিত পড়াশোনা করে কুইজে অংশ নিতাম। এ ছাড়া কলেজে ক্লাব করতে গিয়ে অনেক সিনিয়রদের সঙ্গে যোগাযোগ হতো। তাঁরা দিকনির্দেশনা দিতেন। এই ভাইদের থেকেই প্রশ্ন সমাধান করার কৌশল, সময় ব্যবস্থাপনা, মানসিক চাপ সামলানোর মতো বেশ কিছু কার্যকর পরামর্শ পেয়েছি।

এইচএসসি ও ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। ফলে কুইজ, রুটিন পরীক্ষা এবং ক্লাস—সবই আমাদের উচ্চমাধ্যমিক ও ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করেছে। যদিও পূর্ণমাত্রায় ভর্তি প্রস্তুতি শুরু করেছি পরীক্ষার পর। কিন্তু ভিত্তিটা গড়ে উঠেছিল কলেজেই। এটা সত্যি যে নটর ডেমে সবাই ভালো ছাত্র। তাই চাপ ছিল। কিন্তু সেটা নেতিবাচক তো নয়ই, বরং একধরনের ইতিবাচক চাপই বলা যায়। প্রতিযোগিতা ছিল, তবে কখনোই সেটা ‘টক্সিক’ হয়নি। কারণ, সবাই ছিল পরিশ্রমী। এ ছাড়া একে অপরকে সাহায্য করার একটা সুস্থ পরিবেশ ছিল, যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন

কলেজের ভূমিকা বড়

নটর ডেমের শিক্ষকেরা ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি মনোযোগ দিয়ে আমাদের প্রতিটি প্রশ্ন শুনতেন। প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা করতেন। এমনকি অতিরিক্ত ক্লাসও নিতেন। এরপরও না বুঝলে দিতেন আলাদা সময়। পড়ালেখার পাশাপাশি শেখানো হতো নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও জীবনের উদ্দেশ্য।

সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো নিজের পরিশ্রম, আত্মপ্রেরণা আর নিজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। তবে কলেজ অনেক সময় এসব গুণ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া নিয়মিত মূল্যায়ন, শৃঙ্খলা, ব্যবহারিক ল্যাব, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং সর্বোপরি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ শিক্ষার্থীর সেরাটা বের করে আনতে প্রেরণা জোগায়।

সবার গল্পই আলাদা

বুয়েটে একজন শিক্ষার্থী যে কলেজ থেকেই আসুক না কেন, হোক সেটা নটর ডেম বা অল্প পরিচিত অন্য যেকোনো কলেজ—আমার কাছে দুটিই ভিন্ন রকম সাফল্য। একজন প্রতিষ্ঠিত মঞ্চ থেকে পথ শুরু করেছে, অন্যজন নিজেই সেই মঞ্চ তৈরি করেছে। তবে প্রতিষ্ঠিত মঞ্চ পাওয়ার জন্য কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা দিয়েই সুযোগ পেতে হয়েছে। আদতে সবার সাফল্যের গল্পই আলাদা। কিন্তু প্রতিটিই সমানভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক। আমার বন্ধুদের কাছে শুনেছি, নিয়মিত কুইজ বা অ্যাসেসমেন্ট তো দূর, অনেকে কলেজে ক্লাসও পেত না। সঠিকভাবে শেখা হয়নি ল্যাবের কাজ। দেশের প্রতিটি কলেজেই আন্তরিকভাবে মূল্যায়নভিত্তিক পড়াশোনা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ থাকা উচিত।

আরও পড়ুন