ঘোষবাড়ির পূজা দেখতে ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জ

পারিবারিক উদ্যোগে শুরু হওয়া এই পূজা এখন পরিবারের সদস্যদের একত্র হওয়ার উপলক্ষ। সারা বছর নানা কাজে দূরে থাকা স্বজনেরা পূজার কয়েকটি দিন এক ছাদের নিচে মিলিত হন। বাড়ির উঠানে জমে আড্ডা, চলে পূজার প্রস্তুতি, আর বড়দের কাছ থেকে ছোটরা শিখতে থাকে পূর্বপুরুষের রীতিনীতি। এভাবে নাগরনন্দী ঘোষবাড়ির দুর্গোৎসব হয়ে উঠেছে দেবীর আরাধনা, পারিবারিক ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির এক সম্মিলিত আয়োজন।

নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ ঘোষবাড়ির পূজার অন্যতম ভিত্তিছবি: সুমন ইউসুফ

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, আবেগ, ঐতিহ্য ও মিলনেরও উৎসব। এই উৎসবে দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে যেমন অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির জয়ের প্রার্থনা করা হয়, তেমনি স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আনন্দেও ভরে ওঠে মানুষের মন। মুন্সিগঞ্জের বালাশুরের নাগরনন্দী ঘোষবাড়িতে দুর্গাপূজা মানে শুধুই দেবী দুর্গার আরাধনা নয়, পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে হওয়ার উপলক্ষও। বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারের গ্রামের বাড়ির দুর্গাপূজা হিসেবেও পরিচিত এটি। পরিবারের পুরোনো বাড়িতে সবাই একত্র হন। বড়দের সঙ্গে ছোটদের পরিচয়, ভাইবোনদের আড্ডা, পূজার নানা আয়োজন—সব মিলিয়ে বাড়িটি হয়ে ওঠে স্বজনদের মিলনমেলা। পূজার এই আয়োজন দেখতেই ঢাকা থেকে মোটরসাইকেলে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ পেরিয়ে গেলাম মুন্সিগঞ্জের বালাশুরের নাগরনন্দী ঘোষবাড়িতে। সঙ্গে সহকর্মী আলোকচিত্রী সুমন ইউসুফ।

পারিবারিক উদ্যোগে পূজার সূচনা

নাগরনন্দী ঘোষবাড়িতে আগে থেকেই বিক্ষিপ্তভাবে পূজা-অর্চনার প্রচলন ছিল। তবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুসংগঠিতভাবে দুর্গাপূজা আয়োজনের যাত্রা শুরু হয় ১১ বছর আগে। পরিবারের ১৪ ভাই, ৭ বোন ও তাঁদের আত্মীয়স্বজনের উদ্যোগে শুরু হওয়া এ আয়োজন সময়ের সঙ্গে বড় হয়েছে।

পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুসংগঠিতভাবে দুর্গাপূজা আয়োজনের যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালে
ছবি: সুমন ইউসুফ

পূজার অন্যতম উদ্যোক্তা প্রমীত কুমার ঘোষ জানান, পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই এখন শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। জীবিকার প্রয়োজনে সবাই ব্যস্ত থাকায় আগের মতো একসঙ্গে বাড়িতে সময় কাটানোর সুযোগ কমে গিয়েছিল। সেই দূরত্ব কমিয়ে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ও সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার ভাবনা থেকেই পূজার আয়োজন। প্রমীত কুমার ঘোষ বলেন, ‘ছোট করে হোক, তবু বাড়িতে একটা পূজা শুরু করি—এমন ইচ্ছা থেকেই আমরা সবাই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিই। জ্যাঠাতো-কাকাতো ভাই–বোন, পিসি, পিসির ছেলে, জামাইবাবু—আত্মীয়স্বজন সবাইকে নিয়ে শুরু হয় আয়োজন।’

ঘোষবাড়ির মণ্ডপে সম্প্রীতির বাংলাদেশ
ছবি: সুমন ইউসুফ

তাঁদের হিসাবে, ঠাকুরদার প্রজন্ম থেকে তাঁরা চতুর্থ প্রজন্মের উত্তরসূরি। বহু আগে থেকেই বাড়িতে বিচ্ছিন্নভাবে পূজা হতো। তবে ২০১৫ সাল থেকে পরিবারের সদস্যরা একত্র হয়ে আরও বড় পরিসরে দুর্গাপূজা আয়োজন করছেন। এই পথচলা অবশ্য সব সময় মসৃণ ছিল না। করোনাকালে আয়োজন সীমিত করতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে উৎসবের পরিসর নিয়েও ভাবতে হয়েছে। তারপরও পারিবারিক ঐক্য ও ঐতিহ্য ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা থেকে পূজার আয়োজন অব্যাহত রেখেছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন

‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’: তিন উপাসনালয়ের এক বার্তা

দুর্গাপূজায় প্রতিবছরই একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা থিমকে প্রাধান্য দেয় ঘোষবাড়ি। এ বছর সেই ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’। মসজিদ, মন্দির ও গির্জার প্রতীকী উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তাঁরা তুলে ধরতে চেয়েছেন ধর্মীয় সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার গুরুত্ব। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস ও অশুভর বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয়ের কাহিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার চিরন্তন বার্তা বহন করে। সেই ভাবনার সঙ্গে সম্প্রীতির বার্তা মিলিয়ে এবারের আয়োজন যেন উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্বের কথাও বলে।

বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বাধিকারের গ্রামের বাড়ির দুর্গাপূজা হিসেবেও পরিচিত এটি
ছবি: সুমন ইউসুফ

পূজার অন্যতম উদ্যোক্তা দীপক কুমার ঘোষ জানান, প্রতিবছর তাঁদের পূজা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। মুন্সিগঞ্জ সদর ছাড়াও পদ্মার ওপার থেকে অনেকে আসেন এই আয়োজন দেখতে। এবারও বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের প্রত্যাশা তাঁদের। প্রতিমার সাজসজ্জায়ও থাকে বিশেষত্ব। দীপক কুমার ঘোষ জানান, প্রতিমার অলংকার ও সাজসজ্জার সামগ্রী তাঁরা কলকাতার কুমারটুলি থেকে সংগ্রহ করেন। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পাঞ্চলের প্রতিমাশিল্প ও সাজসজ্জার বৈচিত্র্য তাঁদের আয়োজনকে স্বতন্ত্র রূপ দিতে সহায়তা করে।

আরও পড়ুন

২৫ লাখ টাকার আয়োজন, সহযোগিতায় প্রতিবেশীরাও

একটি পারিবারিক উদ্যোগ হলেও নাগরনন্দী ঘোষবাড়ির দুর্গোৎসবের আয়োজন বেশ বড়। পূজার প্রতিমা, মণ্ডপসজ্জা, ধর্মীয় আচার, অতিথি আপ্যায়ন ও প্রসাদ বিতরণ—সব মিলিয়ে ব্যয়ও কম নয়। দীপক কুমার ঘোষের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছর পূজায় ব্যয় হয়েছিল ২০ লাখ টাকার কিছু বেশি। এ বছর সেই ব্যয় প্রায় ২৫ লাখ টাকা হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। পরিবারের বিভিন্ন শাখার সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ ও শ্রম দিয়ে আয়োজনের ব্যয় বহন করেন। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি সহায়তাও পাওয়া যায়। এ বছর সরকার থেকে প্রায় ৬০০ কেজি চাল পেয়েছেন তাঁরা।

নাগরনন্দী ঘোষবাড়ির দুর্গোৎসবের আয়োজন বেশ বড়
ছবি: সুমন ইউসুফ

স্থানীয় মুসলিম প্রতিবেশী ও বন্ধুরাও অনুদান দিয়ে সহযোগিতা করেন। এই সহযোগিতা পূজার আয়োজনকে কেবল একটি পরিবারের গণ্ডিতে আটকে রাখে না; বরং প্রতিবেশীদের অংশগ্রহণে তা হয়ে ওঠে বৃহত্তর সামাজিক বন্ধনের উপলক্ষ। ধর্মীয় উৎসবের আয়োজনেও মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা যে গুরুত্বপূর্ণ, ঘোষবাড়ির পূজা তারই একটি উদাহরণ।

আরও পড়ুন

অঞ্জলির পর প্রসাদ, উৎসবের আনন্দ সবার জন্য

প্রসাদের নাড়ু–মোয়া
ছবি: সুমন ইউসুফ

দুর্গাপূজার অন্যতম আনন্দের অনুষঙ্গ প্রসাদ। পূজার মন্ত্রোচ্চারণ, দেবীর আরাধনা ও অঞ্জলি শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ উৎসবের আনন্দকে আরও পূর্ণতা দেয়। ঘোষবাড়ির পূজাতেও এই আয়োজনের রয়েছে বড় পরিসর। উদ্যোক্তাদের হিসাবে, ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত ১৫-১৬ হাজার মানুষ পূজায় অংশ নেন। প্রসাদ বিতরণের পরিসর সম্পর্কে দীপক কুমার ঘোষের ধারণা, সব মিলিয়ে প্রায় ১৬ হাজার ভক্ত প্রসাদ পাবেন। অঞ্জলির পর শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত চলে প্রসাদ বিতরণ।

দশমীতেও থাকে লাড্ডু, নাড়ু ও মিষ্টি
ছবি: সুমন ইউসুফ

ভুনাখিচুড়ি, ছানাপোড়া, লুচি, সুজি, হালুয়া, নাড়ু, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি ও ফলমূল থাকে আয়োজনের তালিকায়। দশমীতেও থাকে লাড্ডু, নাড়ু ও মিষ্টি। প্রসাদ শুধু খাবার নয়; ধর্মীয় বিশ্বাসে এটি দেবীর উদ্দেশে নিবেদন করা খাদ্য, যা পরে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এই ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে পূজার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে অনেক মানুষের মধ্যে। পরিচিত-অপরিচিত, আত্মীয়-প্রতিবেশী—সবার অংশগ্রহণে উৎসবের পরিসরও হয়ে ওঠে আরও বিস্তৃত।

আরও পড়ুন

প্রজন্মের হাতে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার

পূজার আয়োজনের সামনে যতটা দৃশ্যমান থাকে প্রতিমা ও মণ্ডপ, তার পেছনে ততটাই গুরুত্বপূর্ণ পরিবারের সদস্যদের নিরলস শ্রম। বিশেষ করে নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ ঘোষবাড়ির পূজার অন্যতম ভিত্তি। পরিবারের সদস্য ত্রয়ী ঘোষ জানান, পূজার কাজে পরিবারের সবাই হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করেন। তাঁর বড়মা আগে মণ্ডপের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন। করোনাকালে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর শেখানো নিয়ম ও রীতিনীতি অনুসরণ করেই এখন পূজার আয়োজন পরিচালিত হচ্ছে। পরিবারের মেয়েরা মণ্ডপ সাজানো, নাড়ু-মোয়া তৈরি এবং পূজার প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত করার মতো কাজে অংশ নেন। তাঁদের এই শ্রমের মধ্য দিয়ে এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা পৌঁছে যায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে।

মুন্সিগঞ্জের বালাশুরের নাগরনন্দী ঘোষবাড়িতে দুর্গাপূজা মানে শুধু দেবী দুর্গার আরাধনা নয়, পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে হওয়ার উপলক্ষও
ছবি: সুমন ইউসুফ

ঐতিহ্য টিকে থাকে তখনই, যখন নতুন প্রজন্ম তাকে নিজের করে নেয়। ঘোষবাড়ির পূজায় শিশু-কিশোরদের আগ্রহ সেই সম্ভাবনার কথাই জানায়।

পরিবারের ছোট সদস্য হিয়া ঘোষের কাছে পূজা মানে সারা বছর ব্যস্ত থাকা ভাইবোনদের একসঙ্গে পাওয়া। নতুন জামাকাপড়, পিঠা-পায়েস, নাড়ু আর পরিবারের সবার সঙ্গে সময় কাটানো—সব মিলিয়ে পূজা তাঁর কাছে আনন্দের বড় উৎসব। হিয়া জানায়, ছোটবেলা থেকে যে পূজা দেখে সে বড় হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটি আরও বড় পরিসরে আয়োজন করতে চায়। বড়দের কাছ থেকে শিখে একদিন নিজেরাও এই আয়োজনের দায়িত্ব নিতে চায় তারা।

আরও পড়ুন