এমনকি বরিশালে থাকার সময়ও জীবনানন্দের কর্মের সঙ্গে তাঁর কোনো পরিচয় ঘটেনি। আমেরিকায় ফিরে যাওয়ার পর শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর এবং আইওয়ায় রাইটার্স ওয়ার্কশপের সতীর্থ কবি জ্যোতির্ময় দত্ত (বুদ্ধদেব বসুর জামাতা) সিলিকে জীবনানন্দের শব্দ এবং রূপকল্পের বিস্ময়কর ভুবনের সঙ্গে পরিচিত করান। জীবনানন্দের কবিতার সঙ্গে নিজের প্রথম পরিচয়ের কথা তিনি বলেন এভাবে, ‘কোন কবিতাটি আমরা প্রথম পড়েছিলাম, আমি মনে করতে পারছি না। বোধ হয় “আট বছর আগের একদিন”, যেটিতে ছিল তাড়া করে ফেরা আত্মহত্যা, মানুষের রক্তের ভেতর খেলা করা বিপন্ন বিস্ময় এবং লাশকাটা ঘর। সেই শব্দগুচ্ছ, জানালা গলে আসা নিস্তব্ধতার চিত্রকল্প, সেই নিস্তব্ধতা উটের গ্রীবায় পরিণত হয়ে ঘাড় বাঁকা করে মাথা বাড়িয়ে দেয় জানালার ভেতর দিয়ে—কী এক চিত্রকল্প! তবে সেটা
ছিল আরম্ভ মাত্র। জ্যোতি আমাকে তাঁর সম্পর্কে কিছু কিছু বলেছিলেন, তবে এ–ও বলেছিলেন যে আমার বাংলা পর্বের প্রথম দুই বছর কাটানো
শহর বরিশালের এই নির্জনতাকামী, মুখচোরা, লাজুক কবি সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায়নি। তখনো মনে হতো এবং এখনো মনে হয়,
তাঁকে এবং তাঁর কবিতা সম্পর্কে জানার প্রয়াসমূল্য আছে।’

সে সময় থেকেই বাংলার এই ‘নির্জনতম’ কবি সিলিকে বিমোহিত করেন। এই মুগ্ধতার কারণেই জীবনানন্দকে পিএইচডি গবেষণার বিষয় হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন তিনি। ১৯৬৮ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দক্ষিণ এশীয় ভাষা ও সভ্যতার ওপর মাস্টার্স সম্পন্ন করে ক্লিন্টন গবেষণা শুরু করেন। কলকাতা ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ ও প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য ও দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ শেষে ১৯৭১ সালে তিনি শিকাগোয় ফিরে যান। দীর্ঘ পাঁচ বছর পরিশ্রমের পর ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ‘ডো ইন হিট: আ ক্রিটিক্যাল বায়োগ্রাফি অব দ্য বেঙ্গলি পোয়েট জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯–১৯৫৪)’। উল্লেখ্য, ক্লিন্টন জীবনানন্দের বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় ব্যবহৃত ‘ঘাইহরিণী’ শব্দটির ইংরেজি করেছিলেন ‘ডো ইন হিট’। এই গবেষণালব্ধ ধারণা ও অভিজ্ঞানের ফসল হিসেবে তিনি রচনা করেন আ পোয়েট অ্যাপার্ট গ্রন্থটি। এটিই অনূদিত হয়ে অনন্য জীবনানন্দ নামে প্রকাশিত হয়েছে প্রথমা প্রকাশন থেকে।

আ পোয়েট অ্যাপার্ট ছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদকর্মের মধ্যে আছে মেঘনাদবধ, রাতভরে বৃষ্টি, রামপ্রসাদের নির্বাচিত কবিতা, বাংলা সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধগ্রন্থ বরিশাল অ্যান্ড বেয়ন্ড এবং সম্পাদিত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যসম্পর্কিত একাধিক সংকলন।

ক্লিনটন যখন বরিশাল জিলা স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, সে সময়ের (১৯৬৩) একটা স্কুল ম্যাগাজিনের দুটো পৃষ্ঠা আমাকে দেখান সিলির ছাত্র ডা. সালামত উল্লাহ্। তিনি তখন স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাঁর কাছ থেকে জানা যায়, ক্লিনটন থাকতেন স্কুল ভবনের দোতলায়। একবার আমেরিকা থেকে ক্লিনটনের বোন এসেছিলেন। তখন দুই ভাই–বোন মিলে বৃষ্টির ভেতর ছাতা নিয়ে পায়ে হেঁটে শহরে ঘুরে বেড়াতেন। ম্যাগজিনের বিচ্ছিন্ন দুটো পৃষ্ঠায় ছিল ক্লিনটন সিলির লেখা একটা নিবন্ধের প্রথম ও শেষ পাতা।

সালামতউল্লাহ্​র সৌজন্যে আরও পাওয়া যায় সেই ম্যাগাজিনে প্রকাশিত শিক্ষকমণ্ডলীর একটা গ্রুপ ছবি, যেখানে ক্লিনটনও আছেন। উল্লেখ্য নিবন্ধটির লেখক হিসেবে ক্লিনটনের পরিচিতি উল্লেখ ছিল: ‘সি সিলি বি.এ. (বায়োলজি), পিস কর্পসের (ইউএসএ) অবৈতনিক শিক্ষক’। বহু চেষ্টায়ও লেখাটার মাঝের পৃষ্ঠা(গুলো) পাওয়া যায়নি, তবে স্কুলশিক্ষকদের পাঠদান প্রক্রিয়া এবং ছাত্রদের ভুল ইংরেজি প্রসঙ্গে লেখা নিবন্ধটার খণ্ডিতাংশও বিদ্যোৎসাহী মানুষটির প্রকৃত সত্ত্বা চিনিয়ে দেয়।

আগামীর জন্য আজকের প্রত্যাশা

স্কুল বার্ষিকীতে প্রকাশিত ক্লিন্টন বি সিলির লেখা

পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রতিটি দেশে এখনকার স্কুলগুলোয় রয়েছে ভবিষ্যৎ উন্নতির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। আজকের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্ররা হবে আগামী দিনের প্রকৌশলী, চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী। আর মানবিক শাখার ছাত্ররা হবে ভবিষ্যতের আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও শিল্পী। দেশের ভবিষ্যৎ হাতে নিয়ে আমাদের শিক্ষকদের রয়েছে অনেক বড় দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ কর্মভার সম্পাদনের জন্য ছাত্ররা কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করবে, কিংবা আমরা শিক্ষকেরা কীভাবে তাদের সবচেয়ে ভালোভাবে সাহায্য করতে পারি।

আমি কিংবা শিক্ষাতাত্ত্বিকদের কেউই এই প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারবেন না। আমরা সবাই আজকের তরুণদের আরও ভালো উপায়ে শিক্ষাদানের পদ্ধতি খুঁজছি। যে ধরনের শিক্ষা আমি পেয়েছি, তাতে সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা ঘটে, যখন ছাত্ররা নিজেরা অংশগ্রহণ করে। আমরা সবাই অভিজ্ঞতা থেকেই শিখি। এই অভিজ্ঞতা হতে পারে বিভিন্ন ধরনের। আমরা একটা সিনেমা দেখতে পারি কিংবা করতে পারি একটা গবেষণামূলক পরীক্ষা; শুনতে পারি একটা বক্তৃতা কিংবা অন্য কোনো ছাত্রের প্রতিবেদন; আমরা কিছু পড়তে পারি কিংবা কোনো বিষয়ের ওপর কিছু একটা লিখতে পারি; গবেষণাগারে গিয়ে কিছু নিয়ে পরীক্ষা করতে পারি। আমরা যা কিছু প্রত্যক্ষ করি, সেটা শিখি এবং মনে রাখতে পারি। কিন্তু মনে রাখাই যথেষ্ট নয়; জ্ঞানকে অবশ্যই আমাদের প্রয়োগ করতে এবং যা শিখেছি, সেসব ব্যবহার করতে সক্ষম হতে হবে। শিক্ষক হিসেবে আমাদের কাজ হচ্ছে, ছাত্ররা যাতে নিজেদের সম্পর্কে ভাবতে এবং তাদের জ্ঞান ব্যবহার করতে পারে, তাদের সেভাবে তৈরি করা।

এটা উপলব্ধি করে আমাদের শিক্ষকদের উপায় বের করতে হবে, যাতে আমরা যা শেখাতে চাই, সেই তথ্য ও ধারণাসমূহ ছাত্ররা নিজেরাই আবিষ্কার করতে সক্ষম হয় এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। শ্রেণিশিক্ষা এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে ছাত্ররা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। (শ্রেণিকক্ষে) পাঠদান অবশ্যই দরকার, কিন্তু সেই সময়ের একটা অংশে ছাত্রদের অন্য ধরনের শ্রেণিশিক্ষার জন্য আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে।

এটা কোনো সহজ কাজ নয়। আমাদের দেশ এবং ভবিষৎ নেতাদের প্রস্তুতি কখনোই সহজ কাজ হতে পারে না। আমাদের সামনের এই কঠিন কাজের জন্য প্রয়োজন কল্পনাশক্তি, উদ্যম, নিষ্ঠা ও প্রচুর প্রাণশক্তি।

[...]

কিছু ছাত্র পাওয়া যায়, যারা স্বীকার করেছে যে ওরা অতীত এবং পুরাঘটিত অতীতের রূপসহ ক্রিয়াপদের তালিকা দেখেছে, এমন কখনোই ঘটেনি। কী করুণ অবস্থা! সঠিক মনোযোগের অভাব এবং নিছক অসতর্কতার কারণে ছাত্ররা ক্যাপিটাল লেটার এবং যতিচিহ্নসম্পর্কিত ভুলগুলো করে। ছাত্রদের বোঝাতে হবে, এসব ভুল কতখানি গুরুতর।

বিবিধ ভুলের তালিকায় যা পড়ে, সেগুলো শব্দের বাগ্​বিধিসম্মত ব্যবহার, পদান্বয়ী অব্যয় (Appropriate), বাদ পড়া, অপ্রয়োজনীয় শব্দ ইত্যাদি। যদিও ইংরেজিতে বাগধারায় দক্ষ হওয়া একটু কঠিন, তবু সহজ গল্পের বই, বিভিন্ন অব্যয়ের (গ্রুপ ভার্ব) সঙ্গে ক্রিয়াপদের অনুশীলন নিঃসন্দেহে আগ্রহ জাগাতে পারে এবং এ বিষয়ে বেশ কাজে লাগবে। অন্যান্য ছোটখাট ভুলের বিষয়ে ছাত্রদের উচিত বাস্তবসম্মতভাবে যতখানি সম্ভব মুখস্থবিদ্যা পরিহারের চেষ্টা করা। ছাপার ভুলসহ একটি সহায়ক বই কিংবা শিওর সাকসেস প্রায়ই বহু ছাত্রের ভুলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই সীমিত পাতায় উত্তরপত্র পরীক্ষার সময় পাওয়া সব ধরনের ভুল সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা সম্ভব নয়। আমি কেবল সেগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করলাম। ওপরের আলোচনা থেকে ছাত্রদের কাছে পরিষ্কার হবে, কীভাবে তারা সাধারণ ভুলগুলো পরিহার করা শিখবে আর কীভাবে শিক্ষকদের সেসব সামাল দিতে হবে।