১৭ সেপ্টেম্বর ১৭৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার স্টেট হাউসে একটি ঐতিহাসিক দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন সংবিধান প্রণেতারা।
সেই দলিলই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো লিখিত জাতীয় সংবিধানগুলোর একটি এবং আজও কার্যকর থাকা এক অনন্য সাংবিধানিক দলিল।
২০২৬ সালে এসে এর ২৩৯ বছর পূর্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বিশ্বের গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শাসন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে ভাবনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
ফিলাডেলফিয়ার সেই সংবিধান কেবল একটি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার নকশা ছিল না; এটি ছিল ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ভারসাম্যে রাখা এবং জনগণের সার্বভৌমত্বকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠার একটি দীর্ঘস্থায়ী পরীক্ষা।
তবে একই সঙ্গে এর ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় কোনো সংবিধানই নিখুঁত নয় এবং কাগজে লেখা নীতি ও বাস্তব রাজনৈতিক আচরণের মধ্যে সব সময় একটি দূরত্ব থাকে।
১৭৮৭ সালের সাংবিধানিক কনভেনশন শুরু হয়েছিল কনফেডারেশনভিত্তিক দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকারকে সংস্কারের উদ্দেশ্যে।
কিন্তু আলোচনার একপর্যায়ে প্রতিনিধিরা বিদ্যমান কাঠামো সংশোধনের বদলে একটি নতুন সরকারব্যবস্থার নকশা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেন।
কয়েক মাসের বিতর্ক, মতপার্থক্য ও আপসের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় নতুন সংবিধান।
সংবিধান প্রণয়ন শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত নয়; এটি মতপার্থক্যের মধ্যেও সমঝোতা তৈরির রাজনৈতিক শিল্প।
বড় ও ছোট রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা, নির্বাহী বিভাগের কাঠামো এবং রাজ্যগুলোর অধিকার প্রতিটি বিষয়েই তীব্র বিতর্ক ছিল।
শেষ পর্যন্ত আপসের মাধ্যমেই একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি হয়। ফলে মার্কিন সংবিধানের ইতিহাস গণতান্ত্রিক আলোচনার পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতারও ইতিহাস।
মার্কিন সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতার বিভাজন। রাষ্ট্রক্ষমতা আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভাগ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে না পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনপ্রিয় সার্বভৌমত্ব, সীমিত সরকার, প্রজাতন্ত্রবাদ এবং ফেডারেলিজম।
অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ; সরকার সংবিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ; জনগণের প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে এবং কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকারের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টিত থাকবে।
এই ধারণাগুলো আজও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকার কতটা কার্যকর তার ওপর।
বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে প্রণীত হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান একটি একক, সংসদীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা।
বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি ফেডারেল ও প্রেসিডেনশিয়াল ব্যবস্থা অনুসরণ করে, যেখানে রাষ্ট্রপতি একই সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান এবং নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান।
মার্কিন সংবিধানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কংগ্রেস সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভস ফেডারেল কাঠামোর প্রতিফলন।
বাংলাদেশে এক কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ। আবার যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যগুলোর সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে; বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকাঠামো প্রাধান্যশীল।
তবে পার্থক্যের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মিলও রয়েছে। উভয় সংবিধানেই জনগণের সার্বভৌমত্ব, নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব, মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের সাংবিধানিক ভূমিকার গুরুত্ব রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানেও রাষ্ট্রক্ষমতাকে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে রাখার এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো মূলত ব্রিটিশ সংসদীয় ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়ালেও বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষেত্রে মার্কিন সাংবিধানিক চিন্তার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানকে ব্রিটিশ ধাঁচের সংসদীয় ব্যবস্থা ও মার্কিন ধাঁচের শক্তিশালী বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা-এর সমন্বয় হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় সংবিধান বহুবার সংশোধিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংসদ, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা রয়েছে।
তবে এখানেই ঢাকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি ভালো সংবিধান থাকলেই ভালো গণতন্ত্র নিশ্চিত হয় না।
সংবিধানের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করছে, রাজনৈতিক দলগুলো কতটা সাংবিধানিক নিয়ম মেনে চলছে, নির্বাচন কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সংসদ কতটা কার্যকর, বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন এবং নাগরিকেরা কতটা অধিকার ভোগ করছে এসবই নির্ধারণ করে সাংবিধানিক শাসনের বাস্তবতা।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় সংবিধান বহুবার সংশোধিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে সংসদ, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা রয়েছে।
এখানে ফিলাডেলফিয়ার শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন সংবিধান প্রণেতারা শুধু ক্ষমতা সৃষ্টি করেননি; ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থাও তৈরি করেছিলেন।
তাদের কাছে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল কীভাবে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হওয়া থেকে ঠেকানো যায়। ২৩৯ বছর পরেও মার্কিন সংবিধান নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি।
বরং প্রযুক্তি, সামাজিক বিভাজন, অভিবাসন, নাগরিক অধিকার, নির্বাচনী রাজনীতি, নির্বাহী ক্ষমতা এবং বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
মার্কিন সংবিধান একটি জীবন্ত রাজনৈতিক ও আইনগত কাঠামো, যার কার্যকারিতা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক সমাজের ওপর। বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষা এখানেই।
আমাদের মার্কিন সংবিধানের কোনো কাঠামো হুবহু অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাংবিধানিক ব্যবস্থা আমাদের নিজেদেরই গড়ে তুলতে হবে।
কিন্তু ফিলাডেলফিয়ার কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা সর্বজনীন ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক আপসের সংস্কৃতি।
মার্কিন সংবিধানের ২৩৯ বছর পূর্তি তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক দিবস নয়; এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে আত্মপর্যালোচনারও একটি সুযোগ।
ফিলাডেলফিয়ার শিক্ষা আমাদের বলে সংবিধান কেবল রাষ্ট্রের ক্ষমতার দলিল নয়, এটি রাষ্ট্রক্ষমতার সীমারেখাও নির্ধারণ করে। সংবিধান শুধু সরকার গঠন করে না, সরকারকে জবাবদিহির মধ্যেও রাখে।
আর গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন নয়; এটি সংখ্যালঘুর অধিকার, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং আইনের শাসনেরও নিশ্চয়তা।
ফিলাডেলফিয়ার ১৭৮৭ সালের অভিজ্ঞতা থেকে ঢাকার ২০২৬-এর জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই: একটি সংবিধানের প্রকৃত শক্তি তার পাতায় নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজ কতটা আন্তরিকভাবে তার নীতি ও চেতনাকে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে পারে তার ওপর নির্ভর করে।
ফিলাডেলফিয়া আমাদের একটি সাংবিধানিক কাঠামোর গল্প বলে; ঢাকা এখনো তার নিজস্ব সাংবিধানিক সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করার পথে।
অধ্যাপক ড. সুজিত কুমার দত্ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; আইভিএলপি ফেলো, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।