কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কীভাবে আধুনিক অর্থ ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তকে বদলে দিচ্ছে, তা নিয়ে কিছুদিন আগে দেশের একদল শীর্ষ নির্বাহীর সঙ্গে একটি এআই কর্মশালায় কথা হচ্ছিল।
আলোচনার একপর্যায়ে একজন প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) উদ্বেগের সঙ্গে প্রশ্ন তুললেন, ‘এআই কি শেষ পর্যন্ত আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেবে?’
উত্তরটি আসলে উল্টো দিক থেকে দেখা প্রয়োজন। এআই মানুষের আর্থিক বিচক্ষণতাকে প্রতিস্থাপন করে না; বরং সেটিকে আরও শাণিত ও নিখুঁত করে তোলে।
বিশ্বজুড়ে শীর্ষ করপোরেট নির্বাহীদের কাছে প্রশ্নটি এখন আর কোনো তাত্ত্বিক কিংবা কাল্পনিক বিষয় নয়; এটি তাঁদের প্রাত্যহিক কার্যপরিচালনার এক বাস্তব তাগিদ।
আইবিএম ইনস্টিটিউট ফর বিজনেস ভ্যালু ও অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের যৌথ পরিচালনায় ৩৩টি দেশের দুই হাজার প্রধান নির্বাহীর ওপর চালানো ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক সিইও স্টাডি অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭৬ শতাংশেই এখন একজন ডেডিকেটেড ‘প্রধান এআই কর্মকর্তা’ (চিফ এআই অফিসার) রয়েছেন, অথচ মাত্র এক বছর আগেও এই হার ছিল ২৬ শতাংশ; অর্থাৎ বেড়েছে প্রায় তিন গুণ।
একই সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬৪ শতাংশ প্রধান নির্বাহী এখন এআই-নির্ভর তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বড় কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
এর মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায়, বোর্ডরুমের সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তির বিষয়টি আর শুধু আইটি বিভাগের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা সরাসরি উচ্চতর নেতৃত্বের কৌশলগত টেবিলে চলে এসেছে।
অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্রও একই অভিমুখে ইঙ্গিত করে। কেপিএমজির ‘গ্লোবাল এআই ইন ফাইন্যান্স ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন-চতুর্থাংশের বেশি প্রতিষ্ঠান এখন আর্থিক পরিকল্পনা, প্রতিবেদন প্রণয়ন ও বাণিজ্যিক বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার করছে, আর ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, এআই থেকে প্রত্যাশিত রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (আরওই) মিলছে বা তা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
তবে ব্যবহারের ব্যাপ্তি ও প্রকৃত কার্যকারিতার মধ্যে একটি ফারাকও থেকে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় উন্নতি দেখা যাচ্ছে সিদ্ধান্তের মান, পূর্বাভাসের নির্ভুলতা ও প্রতিক্রিয়ার গতিতে।
কিন্তু বৈশ্বিক এই জোয়ারের বিপরীতে বাংলাদেশের সার্বিক প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র এখনো কিছুটা ভিন্ন ও ধীরগতির।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় উঠে এসেছে একটি উদ্বেগজনক তথ্য।
সেখানে দেখা যাচ্ছে, দেশের ৬৮ শতাংশ ব্যাংকের এখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কোনো আনুষ্ঠানিক নীতিমালা বা নির্দেশিকা নেই। মাত্র ৩২ শতাংশ ব্যাংকের এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতি আছে।
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি যখন প্রতিনিয়ত অভাবনীয় গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নীতিগত প্রস্তুতি অনেকখানি পিছিয়ে।
প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার এই গভীর ফারাক ঘোচানোই এখন আমাদের আর্থিক খাতের নির্বাহীদের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্ব।
এআই এই পুরো ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে বহুগুণ বেশি কার্যকর ও গতিশীল করে তুলতে পারে। একজন তরুণ চাকরিজীবী কিংবা একজন সিইও, উভয়েই এআইয়ের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যয়ের ধরন বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পরিধি আলাদা হলেও নীতি একটাই। সেটি হলো অনুমান নয়, তথ্য; আর আবেগ নয়, প্রমাণ।
নির্বাহী ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক এআই-নির্ভর করে তুলতে এবং কার্যকারিতা বাড়াতে চারটি মৌলিক ধারণা বা কৌশল বাস্তবায়ন করা যেতে পারে:
১. মানসিকতার রূপান্তর ও তথ্যভিত্তিক চিন্তা: অনুভূতি বা প্রবৃত্তিচালিত সিদ্ধান্তের বদলে ডেটা বা তথ্যনির্ভর চিন্তায় উত্তরণ ঘটানো।
আমাদের দেশে এখনো বহু প্রতিষ্ঠানে ব্যয় ও সঞ্চয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পুরোনো অভ্যাস কিংবা ব্যক্তিগত অনুমানের ওপর ভিত্তি করে।
সেখানে ভয়, লোভ বা অতি আত্মবিশ্বাসের মতো মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যক্তিগত পক্ষপাত অগোচরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
এআই এখানে একটি নিরপেক্ষ আয়নার ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রতিষ্ঠানের অতীত ব্যয়ের ধরন বিশ্লেষণ করে এটি আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত ও ঝুঁকির আড়াল হয়ে থাকা ধরনগুলো (হিডেন প্যাটার্ন) আগেভাগেই চিহ্নিত করে দেয়।
২. সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: ঐতিহ্যগত দীর্ঘ কমিটি-নির্ভর আলোচনা আর অনুমানভিত্তিক তর্কের জায়গায় এখন প্রয়োজন দ্রুত ও ডেটাভিত্তিক ‘দ্বিতীয় মতামত’।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈঠকে বসার আগেই এআই যদি প্রাসঙ্গিক সব পরিসংখ্যান ও প্রেডিকটিভ অ্যানালিটিকস একত্র করে দেয়, তবে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব অপ্রয়োজনীয় আলোচনায় সময় না দিয়ে উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত পরিকল্পনা ও বিচক্ষণতায় মনোযোগ দিতে পারে।
এতে কে কখন কেন এবং কিসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার একটি স্পষ্ট ও স্বচ্ছ ডিজিটাল দলিল তৈরি হয়।
ঐতিহ্যগত দীর্ঘ কমিটি-নির্ভর আলোচনা আর অনুমানভিত্তিক তর্কের জায়গায় এখন প্রয়োজন দ্রুত ও ডেটাভিত্তিক ‘দ্বিতীয় মতামত’। সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈঠকে বসার আগেই এআই যদি প্রাসঙ্গিক সব পরিসংখ্যান ও প্রেডিকটিভ অ্যানালিটিকস একত্র করে দেয়, তবে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব অপ্রয়োজনীয় আলোচনায় সময় না দিয়ে উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত পরিকল্পনা ও বিচক্ষণতায় মনোযোগ দিতে পারে।
৩. সুসংহত ও টেকসই প্রবৃদ্ধি: যেকোনো মূল্যে অন্ধ প্রবৃদ্ধির বদলে দুঃসময়েও টিকে থাকার মতো টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
শুধু সাময়িক আয়ের আকর্ষণীয় সংখ্যা দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্য বিচার না করে, বাজারের সম্ভাব্য মন্দা বা ধাক্কার বিপরীতে যেকোনো সম্প্রসারণ পরিকল্পনা যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
পরিচালন সঞ্চয় বা পরিচালনা খরচ থেকে বেঁচে যাওয়া অর্থকে দৈনন্দিন চলতি ব্যয়ে মিশিয়ে না ফেলে, তা পুনর্বিনিয়োগ করা উচিত সম্ভাবনাময় নতুন পণ্য, উচ্চমানের মানবসম্পদ এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে।
৪. প্রমাণনির্ভর বিনিয়োগ: বাজারের সাময়িক হুজুগ বা আবেগে ভেসে না গিয়ে তথ্য ও প্রমাণ যেদিকে ইঙ্গিত করে, সেদিকে মূলধন স্থাপন করা।
যেকোনো নতুন বিনিয়োগে যাওয়ার আগে ‘প্রকৃত প্রতিফল বা রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (আরওই) কত,’ এই কঠোর প্রশ্ন করা উচিত। প্রযুক্তি খাতে ব্যয়কে নিছক অতিরিক্ত ‘খরচ’ হিসেবে না দেখে একটি দূরদর্শী ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখতে হবে।
এই চার ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক বা করপোরেট খাতের জন্য তৈরি হলেও, এগুলোর মূলনীতি কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
এখানেই আমি আমার প্রস্তাবিত ‘গ্র্যান্ডফাদার কনসেপ্ট অব পারসোনাল মানি ম্যানেজমেন্ট’-এর প্রসঙ্গটি স্মরণ করতে চাই, যা দেশের তরুণদের অর্থ ব্যবস্থাপনায় সচেতন করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
এই জীবনচক্রীয় কাঠামোতে মানুষের সমগ্র আর্থিক জীবনকে সাতটি সুনির্দিষ্ট ধাপে ভাগ করা হয়েছে।
এই সাত ধাপ অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত প্রাথমিক আর্থিক সাক্ষরতার মাধ্যমে সুদৃঢ় সচেতনতার ভিত্তি তৈরির সময়।
১৮ থেকে ২৫ বছর প্রথম আয়, স্বাবলম্বিতা এবং বাজেটিং শেখার সময়।
২৫ থেকে ৩৫ বছর পরিবার গঠন, স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে মনোযোগী হওয়ার সময়।
৩৫ থেকে ৪৫ বছর উচ্চতর দক্ষতা অর্জন, স্থায়ী সম্পদ বৃদ্ধি ও পরিবারের সুরক্ষার সময়। ৪৫ থেকে ৫৫ বছর ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ উচ্চতা স্পর্শ, ঋণমুক্তি এবং অবসর তহবিল গঠনের সময়।
৫৫ থেকে ৬৫ বছর সরাসরি কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ এবং প্যাসিভ আয়ের ওপর নির্ভরশীলতার সময়।
৬৫ বছরের পর অর্জিত সম্পদ সংরক্ষণ, মানসিক প্রশান্তি এবং উত্তরাধিকারীদের কাছে সুষ্ঠুভাবে হস্তান্তর নিশ্চিত করার সময়।
এই জীবনচক্রের প্রতিটি ধাপে আয়, ব্যয় ও সঞ্চয়ের সুষম ভারসাম্য রক্ষায় প্রয়োগ করা যায় মার্কিন দেউলিয়া বিষয়াদি–সংক্রান্ত আইনবিশেষজ্ঞ ও সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনের বহুল পরীক্ষিত ‘৫০-৩০-২০’ সূত্র দিয়ে।
ওই সূত্র অনুযায়ী, মোট আয়ের ৫০ শতাংশ মৌলিক চাহিদা মেটানো, ৩০ শতাংশ জীবনযাত্রার মান ধরে রাখা এবং ২০ শতাংশ ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ে বরাদ্দ রাখা উচিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী আমাদের জাতীয় সঞ্চয়ের হার জাতীয় আয়ের প্রায় ২৭ শতাংশ (চলতি অর্থবছরে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ)।
এটি ওয়ারেনের সূত্রের সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এই গড় সঞ্চয় সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে কতটা ন্যায্যভাবে বণ্টিত হচ্ছে এবং তা কতটুকু প্রকৃত সম্পদ গঠনে রূপান্তরিত হচ্ছে, সেটাই আসল প্রশ্ন।
এআই এই পুরো ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে বহুগুণ বেশি কার্যকর ও গতিশীল করে তুলতে পারে।
একজন তরুণ চাকরিজীবী কিংবা একজন সিইও, উভয়েই এআইয়ের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যয়ের ধরন বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
পরিধি আলাদা হলেও নীতি একটাই। সেটি হলো অনুমান নয়, তথ্য; আর আবেগ নয়, প্রমাণ।
তবে এই অগ্রযাত্রায় একটি গুরুতর সতর্কবার্তা রাখা প্রয়োজন। এআই প্রযুক্তি যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তা দিন শেষে মানুষের দেওয়া তথ্যের গুণগত মান (ডেটা কোয়ালিটি) এবং নীতিগত কাঠামোর (এথিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক) ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে স্পষ্ট নীতিমালার ঘাটতি শুধু প্রযুক্তিগত ঝুঁকি তৈরি করে না; বরং সার্বিক জবাবদিহি, সাইবার নিরাপত্তা এবং তথ্যের সুরক্ষায় বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
কিছুদিন আগে একটি জব সাইটের লাখ লাখ ব্যক্তির তথ্য হ্যাক হওয়ার ঘটনাটি এর বাস্তব প্রমাণ।
অতএব বাংলাদেশ ব্যাংক, বিআইবিএম এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে যৌথভাবে অনতিবিলম্বে একটি সার্বিক ও স্পষ্ট ‘এআই ব্যবহার নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করতে হবে।
আর সবার আগে মাথায় রাখতে হবে, প্রযুক্তি দিয়ে কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করতে হবে, কিন্তু নেতৃত্ব দিতে হবে মানুষের মানবিক প্রজ্ঞা দিয়ে।
এম এম মাহবুব হাসান ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব