বিজেপির সাম্প্রতিক জয় রেকর্ডের দিকে এগিয়ে দিল মোদিকে

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিছবি: রয়টার্স

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব নিয়ে অল্প অল্প করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার পরে অনেকেই বলতে শুরু করেছিলেন, ২০২৯-এর জাতীয় নির্বাচনে মোদিকে সামনে রেখে হয়তো এগোবে না বিজেপি। কিন্তু পরপর কয়েকটি জয় তিনি ও তাঁর দল পেল।

২০২৫ সালে বিহার ও দিল্লিতে, ’২৬–এ আসাম, পশ্চিমবঙ্গে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট জিতেছে পদুচেরিতে। তারচেয়েও বড় কথা বিজেপির ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে দক্ষিণ ভারতের দুটি অ-হিন্দি রাজ্য তামিলনাড়ু ও কেরালায়। এসবই নরেন্দ্র মোদির পক্ষে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

তামিলনাড়ু ও কেরালা

পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। এখানে দেখা যাক দক্ষিণ ভারতে, যেখানে জাতি বৈশিষ্ট্য ও ভাষা উত্তর ভারতের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, সেখানে কতটা এগিয়েছে বিজেপি। এই দুই রাজ্যে কখনোই জেতেনি বিজেপি। তবে এবারে তামিলনাড়ু ও কেরালার সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অতি প্রাচীন দ্রাবিড় সংস্কৃতির জমিতে ভালো রকম লাভবান হয়েছে বিজেপি।

তামিলনাড়ুতে ১৯৬৭ সালের পরে এই প্রথম রাজ্যের দুটি প্রধান দ্রাবিড় সংস্কৃতিভিত্তিক দল ক্ষমতায় আসেনি। ডিএমকে (দ্রাবিড় মুন্নেত্র কড়গম) বা এআইএডিএমকে (অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কড়গম)—এই দুটি দ্রাবিড়ীয় দলকে পেছনে ফেলে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে অভিনেতা জোসেপ বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্রি কড়গম (টিভিকে)।

কিন্তু টিভিকের জয় বিজেপির সুবিধা করে দিল অন্যভাবে। বিজেপির সুবিধা হলো, তাদের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ ডিএমকের পরাজয়। একদিকে তামিল জাতীয়তাবাদ এবং অন্যদিকে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, অর্থাৎ সমাজের নিম্নবর্গকে ওপরে তুলে আনার লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে জন্ম ডিএমকের।

স্বাভাবিকভাবেই এই দল তামিলনাড়ুতে এবং কেন্দ্রে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু দলের বিরোধী। তাদের জয় ভারতে ব্রাহ্মণ্যবাদ–বিরোধী যেকোনো লড়াইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তাদের জয় শুধু তামিলনাড়ুর জয় নয়, গোটা দেশে ব্রাহ্মণ্যবাদের পরাজয়। সেই দলটি হেরে গেল। ডিএমকের পরাজয় আদর্শগতভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদভিত্তিক দল বিজেপির জয়।

আরও পড়ুন

এটা শুধু একটা প্রতীকী বিষয় নয়, বিজেপির পরবর্তী বড় নির্বাচনী লক্ষ্য রুখতে ডিএমকে একটা বড় অবস্থানও নিয়েছিল। বিজেপির পরবর্তী বড় লক্ষ্য ‘ডিলিমিটেশন’—অর্থাৎ নির্বাচনী কেন্দ্রের সীমানার পুনর্নির্ধারণ। এর ফলে যেসব রাজ্যে জনসংখ্যা বেড়েছে, সেখানে লোকসভার আসনসংখ্যাও বেড়ে যাবে। জনসংখ্যা মূলত বেড়েছে উত্তর ভারতে, অর্থাৎ যেখানে বিজেপি শক্তিশালী সেই অঞ্চলে।

অতএব উত্তর ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য, যেমন উত্তর প্রদেশে লোকসভার আসন বাড়বে। আর কমবে সেই সব অঞ্চলে যেখানে জনসংখ্যা কমেছে, যেমন তামিলনাড়ুসহ দক্ষিণ ভারতে, যারা জনসংখ্যা কমিয়ে এবং আর্থিক বৃদ্ধি হার বাড়িয়ে জীবনযাপনের মান উন্নয়নে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু তাদের এই সাফল্য এখন তাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে, কারণ অনুন্নত অঞ্চলে জনসংখ্যা বেড়ে সেখানে লোকসভার আসন বাড়তে চলেছে। বিষয়টির তীব্র প্রতিবাদ করেছে অনেকে, যাদের প্রধান ছিল ডিএমকে। তারা হারার ফলে ভবিষ্যতে লোকসভাতেও ডিএমকের আসন কমবে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে লাভ বিজেপির।

আরও পড়ুন

দ্বিতীয় লাভটা আরও সরাসরি। ডিএমকে হারার সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেস যোগ দিয়েছে নতুন দল টিভিকের সঙ্গে, সরকার গড়তে তাদের সাহায্য করেছে। এতে বিপুল খেপে গেছে ডিএমকে, কারণ নির্বাচনের আগে তাদের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল কংগ্রেস। তারা এতটাই খেপেছে যে লোকসভার স্পিকারকে তারা জানিয়েছে, সভায় যেন কংগ্রেসের পাশ থেকে তাদের বসার আসন সরিয়ে দেওয়া হয়।

এত দিন বিরোধী ‘ইন্ডিয়া জোটে’র অংশ হিসেবে কংগ্রেস এবং ডিএমকে পাশাপাশি বসত। অর্থাৎ ডিএমকে হারার ফলে বিজেপি বিরোধী জোট, যাকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তা বড় ধরনের ধাক্কা খেলো। এটা বিজেপির জন্য বিরাট খুশির খবর।

বিজেপির জন্য খুশির খবর এসেছে দক্ষিণ ভারতের কেরালা থেকেও। সেখানে তারা তিনটি আসন পেয়েছে। এটি কেরালায় বিজেপির বিরাট সাফল্য। ছয়টি আসনে তারা দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। কেরালায় যেখানে ২৭ শতাংশ মুসলমান এবং প্রায় ২০ শতাংশ খ্রিষ্টান, সেখানে বিজেপির এই পারফরম্যান্স নিঃসন্দেহে উদ্বেগে রাখবে কেরালার দুটি প্রধান জোট সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন এলডিএফ (লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) এবং এবারে ক্ষমতায় আসা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফকে (ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট)।

আরও পড়ুন
সাম্প্রতিক জয়ের ফলে আত্মবিশ্বাস বাড়ল বিজেপির, কমল ‘ইন্ডিয়া জোট’–এর। এসবের ফলে ২০২৯ সালে লোকসভায় নরেন্দ্র মোদিই যদি ফিরে আসেন তবে তিনি জওহরলাল নেহরুর ১৭ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার রেকর্ড ভেঙে বৃহত্তম গণতন্ত্রে সবচেয়ে বেশি দিন প্রধানমন্ত্রী থাকার রেকর্ড গড়বেন।

কেরালায় বিজেপির দ্বিতীয় সাফল্য ইন্ডিয়া জোটের অন্যতম শরিক এবং ভারতের রাজনীতিতে অপর আদর্শবাদী দল সিপিআইএমের (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া মার্ক্সিস্ট) পরাজয়।

সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বাম জোটের পরাজয়ের ফলে ১৯৭৭ সালের পরে প্রায় ৫০ বছরে এই প্রথম তাদের তিন দুর্গ-রাজ্য কেরালা, ত্রিপুরা বা পশ্চিমবঙ্গে কোনো কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় রইল না।

এটা বিজেপির বড় সাফল্য। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে আদর্শভিত্তিক দল হিসেবে এখন মাঠে রইল শুধু ডানপন্থী বিজেপি। বামপন্থীরা তাদের তিন রাজ্যেই ক্ষমতা হারাল।

আরও পড়ুন

আসামে কংগ্রেসের বিপদ বাড়ল

আসামেও ফের জিতেছে বিজেপি। তাদের সমালোচকদের বক্তব্য, ডিলিমিটেশনের মাধ্যমে তীব্র ধর্মীয় মেরুকরণ এবং সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান ও সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প বিজেপির জয়ের কারণ। প্রধান কারণ হিসেবে ডেলিমিটেশনের ওপরেই তাঁরা জোর দিচ্ছেন।

ডিলিমিটেশনের ফলে ১০৪টি হিন্দুপ্রধান এবং ২২টি মুসলিমপ্রধান আসন তৈরি হয়েছিল। এটা নির্বাচনের মেরুকরণ সম্পূর্ণ করেছে, সেটা ফলাফলে প্রতিফলিতও হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে সংখ্যালঘু ভোটের প্রভাব কমেছে, ফলে মুসলিম-নির্ধারক আসনের সংখ্যা ২৯ থেকে কমে ২২-এ দাঁড়িয়েছে।

এতে বিপদে পড়েছে কংগ্রেস। দেখা যাচ্ছে মুসলমান সমাজ, বিশেষ করে আসামের বাঙালি মুসলমান সমাজ, মুসলমানপ্রধান দল অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের থেকে মুখ ফিরিয়ে একচেটিয়াভাবে ভোট দিয়েছে কংগ্রেসকে। কংগ্রেস যে ১৯টি আসন পেয়েছে, তার ১৮ জনই মুসলমান। এর ফলে ভবিষ্যতে কংগ্রেসকে মানুষ সংখ্যালঘুকেন্দ্রিক দল বলে চিহ্নিত করবেন। আর উল্টো দিকের হিন্দু ভোট একত্র হয়ে চলে যাবে বিজেপিতে। বিষয়টি মাথায় রেখেই, বিজেপি কোনো মুসলিম প্রার্থী দাঁড় করায়নি।

আরও পড়ুন

এর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের জয় তো রয়েছেই, যেখানে স্বাধীনতার পরে প্রথম কোনো হিন্দুত্ববাদী দল ক্ষমতায় এল। যে দল থেকে বিজেপির উৎপত্তি, সেই জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। বিজেপি তাই বরাবরই এই রাজ্যে জিততে চেয়েছিল। সেই জয় এল এমন একটা সময়ে, যখন মনে করা হচ্ছিল শীর্ষ নেতৃত্বের হয়তো পরিবর্তন হবে। বলাই বাহুল্য এখন সেই প্রশ্ন আর উঠছে না।

চার রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (পদুচেরি) নির্বাচন সমাধা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতে নির্বাচনী মৌসুম শুরু হয়ে গেল। আগামী বছর থেকে পরপর নির্বাচন হবে। ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ১৬টিতে নির্বাচন হবে ২০২৭ এবং ’২৮ সালে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশও রয়েছে।

সাম্প্রতিক জয়ের ফলে আত্মবিশ্বাস বাড়ল বিজেপির, কমল ‘ইন্ডিয়া জোট’–এর। এসবের ফলে ২০২৯ সালে লোকসভায় নরেন্দ্র মোদিই যদি ফিরে আসেন তবে তিনি জওহরলাল নেহরুর ১৭ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার রেকর্ড ভেঙে বৃহত্তম গণতন্ত্রে সবচেয়ে বেশি দিন প্রধানমন্ত্রী থাকার রেকর্ড গড়বেন।

  • শুভজিৎ বাগচী প্রথম আলোর কলকাতা সংবাদদাতা

মতামত লেখকের নিজস্ব