ইরানে বিক্ষোভ শুরুর পর থেকেই বিবিসি ফারসি যেন যুক্তরাজ্য রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বিক্ষোভের মাত্রা অতিরঞ্জিত করার এক বিশেষ মিশনে নেমেছে। তারা ইরানের সেই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করছে, যারা রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেও ইসরায়েল বা তার প্রকাশ্য দালাল রেজা পাহলভির ইশারায় রাজনীতি করতে রাজি নয়।
এটি ইসরায়েলের স্বার্থে যুক্তরাজ্যের সফট পাওয়ার ব্যবহারের আরেকটি নজির। ইরান নিয়ে বিবিসি ফারসির এই একদেশদর্শী প্রচার একদিকে যেমন প্রবল, অন্যদিকে ঠিক ততটাই ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের চলমান গণহত্যা নিয়ে তাদের নীরবতা দেখা গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রকাশ্যে দেশে বিক্ষোভ হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, যাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষোভ রয়েছে, আর যারা সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে সরকার উৎখাত বা ইরানের ভাঙন ঘটাতে চাইছে—এ দুই পক্ষের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। এই দ্বিতীয় লক্ষ্যটিই মূলত ইসরায়েলের প্রকল্প।
ইরানের এই বিক্ষোভের পেছনে যে দেশটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাজ করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে এই সংকটের পেছনে মূলত দুটি পরস্পরসম্পূরক কারণ রয়েছে। একদিকে এর পেছনে আছে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও অদক্ষতা, অন্যদিকে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আরোপিত বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞা।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর সাম্প্রতিক একটি শিরোনাম বিষয়টি যথার্থভাবে ধরেছে: ‘অর্থনীতি তলানিতে ঠেকায় ইরানের মুদ্রা ছাই হয়ে যাচ্ছে’।
একই সঙ্গে এটাও সত্য, এই বিশেষ সংকট অনেকটাই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা এক বিভ্রান্তিমূলক নাটক। তারা লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন বা ভেনেজুয়েলার মতো আরও একটি অকার্যকর রাষ্ট্রকে নিশানা বানিয়েছে, যাতে তারা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারে এবং গাজায় চলমান গণহত্যা থেকে বিশ্বের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে পারে।
ইরানিদের তাদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। কারণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। শ্রমজীবী মানুষ অকল্পনীয় দারিদ্র্যের ভারে ভেঙে পড়ছে।
আজ ইরানের দিকে ইসরায়েলের অতিরিক্ত মনোযোগের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথম ও প্রধান কারণ—এটি একটি বিভ্রান্তিমূলক কৌশল। এর উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান ইসরায়েলি গণহত্যা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবশিষ্ট ভূমি লুটের বিষয়টি আড়াল করা।
তেল আবিবের ধারণা, যত বেশি আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে, তত দ্রুত বিশ্ব গাজার গণহত্যা ভুলে যাবে। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেটি হলো ইরানকে ভেঙে ছোট ছোট জাতিগত রাষ্ট্রে পরিণত করা, যেমন পরিকল্পনা তারা লেবানন ও সিরিয়ার ক্ষেত্রেও করেছে। ইসরায়েল পুরো অঞ্চলকে নিজের প্রতিচ্ছবিতে গড়ে তুলতে চায়। তথাকথিত ‘সোমালিল্যান্ড’-কে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনেও এ নকশাই কাজ করছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নটি এখানে মূলত একটি ধোঁয়াশা। ওবামা প্রশাসনের সময়ে ইরান ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে তাদের পঞ্চম বাহিনী এআইপিএকের মাধ্যমে ইসরায়েল শুরু থেকেই এ চুক্তির বিরোধিতা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুপক্ষেরই স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই সেই চুক্তি ধ্বংস করেন। ফলে আজ ইরান ও বাইরের বিশ্বের মধ্যে কোনো পারমাণবিক সমঝোতা না থাকার দায় মূলত ইসরায়েলেরই।
মূলত এটি কোনো বিপ্লব নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাঁচা হাতে সাজানো এক ভ্রান্ত তথ্যভিত্তিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা। এর আদল ১৯৫৩ সালে সিআইএ ও এমআই-সিক্সের যৌথ ষড়যন্ত্রে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে উৎখাত করার ঘটনার মতো। আমেরিকা দেবে সামরিক শক্তি, আর ব্রিটেন বিবিসি ফারসির মতো মাধ্যমে দেবে ভুয়া সংবাদ।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রই ইরানের শাসকগোষ্ঠী ও সাধারণ দরিদ্র জনগণের ওপর সমানভাবে বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞা চাপানোর জন্য প্রধানত দায়ী। এ নিষেধাজ্ঞার পেছনে দুটি যুক্তি দেখানো হয়। একটি হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বানানো উদ্বেগ, আরেকটি হলো ইরানকে কম আক্রমণাত্মক ও আরও বেশি ইসরায়েলপন্থী অবস্থান নিতে বাধ্য করা।
এ বিশ্লেষণে যে মৌলিক সত্য পুরোপুরি অনুপস্থিত, তা হলো—ইসরায়েল নিজেই একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। তারা একই সঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চালাচ্ছে; বিশেষ করে তারা অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে।
পূর্ববর্তী বিক্ষোভগুলোর তুলনায় বর্তমান আন্দোলন এখনো ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ অভ্যুত্থানের মতো ব্যাপকতা, তাৎপর্য বা স্বতঃস্ফূর্ততায় পৌঁছায়নি। সেই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান নিয়ে এখনো একাডেমিক আলোচনার ঢেউ চলছে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই—নারীদের নেতৃত্বে সংঘটিত হওয়ায় সেটি ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা।
বর্তমান বিক্ষোভ অত্যন্ত সহিংস এবং এটি কোনোভাবেই নারী নেতৃত্বাধীন নয়। মাসা আমিনি-পরবর্তী আন্দোলনই সম্ভবত আধুনিক ইরানের শেষ সত্যিকারের দেশজ, স্বতঃস্ফূর্ত ও বিশ্বব্যাপী তাৎপর্যপূর্ণ গণ-আন্দোলন। এর বিপরীতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ মসজিদে আগুন দেওয়ার মতো উসকানিমূলক ঘটনার মাধ্যমে মোসাদের এজেন্টদের দ্বারা অপবিত্র হয়েছে। এখানে জে কে রাউলিংয়ের মতো ব্যক্তিরা ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন।
এ আন্দোলন ভুয়া খবরেও কলুষিত হয়েছে। ভুয়া খবর প্রচারের এই কৌশল ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানি রাষ্ট্র ভাঙতে ব্যবহার করছে। হারেত্জ, দ্য মার্কার ও সিটিজেন ল্যাবের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ইসরায়েল সক্রিয়ভাবে পাহলভি রাজতন্ত্রের বিকারগ্রস্ত উত্তরসূরি রেজা পাহলভির পক্ষে কৃত্রিম সমর্থন তৈরি করছে; যদিও এই উসকানি শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট করছে।
ইরানি রাষ্ট্র এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। তবে একের পর এক সংকট সামলানো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ডিএনএতেই রয়েছে।
গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু আক্রান্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রটি এ বিক্ষোভ কঠোর হাতে দমন করবে—এতে কোনো দ্বিধা থাকবে না। প্রয়োজনে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ঘাঁটি কিংবা সরাসরি ইসরায়েলেও পাল্টা আঘাত হানবে। প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ই পুরো পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দেবে।
মির হোসেইন মুসাভি, জাহরা রাহনাভার্দ, মোহাম্মদ খাতামি, মোস্তফা তাজজাদেহ বা আবোলফজল কাদিয়ানি—এ ধরনের শান্তিপূর্ণ ও বৈধ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে জায়গা করে নিচ্ছে অবৈধ ও সুযোগসন্ধানী পাহলভিপন্থী রাজতন্ত্রী এবং মুজাহিদিন-ই-খালক, যাঁদের ইরানের ভেতরে কোনো প্রকৃত জনভিত্তি নেই।
বিবিসি কিংবা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো পশ্চিমা গণমাধ্যম যখন জায়নবাদী দালাল পাহলভির জন্য কৃত্রিম জনসমর্থন তৈরি করতে ব্যস্ত, তখন ইরানি রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল, কিংবা উভয়ের আক্রমণের আশঙ্কা করছে।
বিক্ষোভ অন্তত আংশিকভাবে ভেতর থেকে শুরু হলেও সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রকাশ্যে বলেছেন, মোসাদের এজেন্টরা এতে জড়িত। এটি সত্য নাকি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশল, তা স্পষ্ট নয়। তবে যা–ই হোক, এতে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে।
মূলত এটি কোনো বিপ্লব নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাঁচা হাতে সাজানো এক ভ্রান্ত তথ্যভিত্তিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা। এর আদল ১৯৫৩ সালে সিআইএ ও এমআই-সিক্সের যৌথ ষড়যন্ত্রে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে উৎখাত করার ঘটনার মতো। আমেরিকা দেবে সামরিক শক্তি, আর ব্রিটেন বিবিসি ফারসির মতো মাধ্যমে দেবে ভুয়া সংবাদ।
এ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল বাস্তব ও ন্যায্য কারণে। কিন্তু ইসরায়েল সেটিকে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করছে। এর ফলে তারা একটি জাতির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কল্যাণ থেকে জন্ম নেওয়া ন্যায্য প্রতিবাদকে সম্পূর্ণভাবে অবিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
হামিদ দাবাশি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানি স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক।
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত