বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সুবিধা নিতে পারে, এমন কথাও বিশ্লেষকেরা বলে আসছেন।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ কার্যতই আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান আর অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়া এক বিষয় নয়। সেই অবস্থান কাজে লাগাতে প্রয়োজন অবকাঠামো, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর অর্থনৈতিক সম্পর্ক।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কার্যকর কূটনীতি। ছোট দেশ হিসেবে বৃহৎ দুই প্রতিবেশী দেশের বাজারের সুবিধা নিতে নিজেদের দর-কষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধি করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়। জাপানের বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক শিল্পোন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে সেই পুরোনো প্রসঙ্গটি নতুন করে সামনে এসেছে।
বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে জাপান সরকারের প্রস্তাবিত বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ (বিগ-বি) ‘ইনিশিয়েটিভ বিগ-বি’ নামে পরিচিত। এই প্রস্তাবের আওতা বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফরে আছেন। নতুন এই রূপরেখা দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে প্রতিফলিত হতে পারে।
২০১৪ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে শিল্প ও যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে পরিকল্পনাটির সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করে বৃহত্তর অর্থনৈতিক বলয় তৈরির ধারণাও সামনে এসেছে।
এখানেই পরিকল্পনাটির অর্থনৈতিক তাৎপর্যের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। জাপান এমনি এমনি বা ভালোবেসে বাংলাদেশ নিয়ে এ পরিকল্পনা করেনি। তারা মূলত চীন থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে আনার যে কৌশল হাতে নিয়েছে, অর্থাৎ তাদের যে চায়না প্লাস নীতি, তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে তাদের এ প্রস্তাব।
ফলে এ প্রকল্পের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। ভারতের কাছে বাংলাদেশ হতে পারে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সমুদ্রবন্দরের যোগাযোগের কার্যকর পথ। বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন হলো, এই দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সমন্বয় থেকে কতটা সুবিধা আদায় করা সম্ভব?
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বে অব বেঙ্গল কনভারসনে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান ঠিক এ কথাই বলেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র এশিয়ার দিকে সরে আসছে। চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনৈতিক শক্তির উত্থানের সঙ্গে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিনিময় বাড়ছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে এশিয়ার আঞ্চলিক সরবরাহ–শৃঙ্খল ও বাজারের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, জাপানের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য সহায়ক হতেই পারে।
কেবল অন্য দেশকে পণ্য পরিবহনের পথ ভাড়া দিয়ে বিশেষ কিছু হবে না; তখন বরং বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা পাবে অন্য দেশগুলো। এই যোগাযোগের ভিত্তিতে শিল্প, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশ নিজেই আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশটির মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ মূলত ‘চিকেন নেক’ নামের সংকীর্ণ স্থলপথের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে যোগাযোগ বাড়ানো গেলে এ অঞ্চলের পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সেই সুবিধা দিয়েছে, যদিও ভারত সেটা তেমন একটা ব্যবহার করেনি। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের বন্দর ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা সম্ভব হতে পারে।
জাপানের পরিকল্পনায় এই যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্ব আছে। কারণ, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে উঠলে জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য ভারতের বাজারে যেতে পারে। আবার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পণ্যও বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
তবে এখানে বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশের পণ্য পরিবহনের সুবিধা তৈরি হলেই বাংলাদেশ অনেক লাভবান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশ যদি শুধু পণ্য পরিবহনের পথ ব্যবহারের সুযোগ দেয়, তাহলে তেমন একটা লাভ হবে না; বরং বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চল, গুদাম, পণ্য প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহনসেবা ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনশিল্প গড়ে তোলা গেলে অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন বাড়বে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত, নিজস্ব উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগের সুযোগ যুক্ত করা।
জাপানের অর্থনৈতিক স্বার্থ
এশিয়ার অর্থনীতিতে জাপানের অবস্থান বদলে গেছে। একসময় দেশটি মূলত উন্নয়ন সহযোগিতা ও অবকাঠামো খাতে অর্থায়নের জন্য পরিচিত ছিল। এখন তারা বিভিন্ন ফ্রন্টে একসঙ্গে কাজ করছে—অবকাঠামো খাতে অর্থায়নের সঙ্গে তারা বিভিন্ন দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা ও নতুন বাজার তৈরি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়, বড় শ্রমশক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির সক্ষমতা—এসব কারণে বাংলাদেশ জাপানি বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময় জায়গা। তবে এসব সুবিধা কাজে লাগাতে হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, দক্ষ শ্রমিক, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন দরকার।
জাপানের সহযোগিতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মেট্রোরেল ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এগুলো কতটা কার্যকরভাবে শিল্প ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তার ওপর এসব প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল নির্ভর করবে।
বন্দর নির্মাণের ফলে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়তে পারে। কিন্তু বন্দরের আশপাশে শিল্প গড়ে না উঠলে, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হতে না পারলে বা উৎপাদন খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার না বাড়লে অবকাঠামোর সুফল তেমন একটা পাওয়া যাবে না। তাই জাপানি বিনিয়োগ কত হচ্ছে, তার সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিনিয়োগের ধরন।
চীনের উপস্থিতি ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা
এশিয়ার অর্থনীতি ও বাণিজ্যে চীন এখন সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে চীন থেকে। দেশটি বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে ঋণও দিয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিভিন্ন দেশের বন্দর, সড়ক, রেলপথ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করে দেশটি অর্থনৈতিক যোগাযোগের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে জাপানও দীর্ঘদিন ধরে ঋণ, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছে।
এ বাস্তবতায় বঙ্গোপসাগর ঘিরে জাপানের উদ্যোগ বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার বাইরের কিছু, এমনটা মনে করার কারণ নেই। তবে বিগ–বি কেবল চীনের প্রভাব মোকাবিলার পরিকল্পনা হিসেবে ব্যাখ্যা করাও যথেষ্ট নয়। জাপানের নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ, উৎপাদনব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যোগাযোগ বাড়ানোও তাদের লক্ষ্য।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা চীন, ভারত ও জাপান—এই তিন দেশই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন আমাদের আমদানির বৃহত্তম উৎস; ভারত আমাদের ভৌগোলিক বাস্তবতা; জাপান আমাদের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদার। এই বাস্তবতায় একটি দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির অর্থ অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করা নয়; বরং প্রতিটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশের উৎপাদন, রপ্তানি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব কি না, সেটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব
বিগ–বি পরিকল্পনার সম্ভাবনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হলে সীমান্ত যোগাযোগ, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক পরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণ কঠিন। অথচ এই যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকর না হলে বাংলাদেশের বন্দর ও শিল্প অবকাঠামো ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এখানে বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা নির্ভর করবে শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নয়; আরও যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, সেগুলো হলো অবকাঠামো ব্যবহারের শর্ত নির্ধারণ, বাণিজ্যিক সুবিধা আদায় ও দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতার ওপরও।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের যোগাযোগ অবকাঠামো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বাংলাদেশের জন্যও ভারতীয় বাজার ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সুযোগ আছে। দুই দেশের সহযোগিতা তখনই টেকসই হবে, যখন উভয় পক্ষ বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে। সেই সঙ্গে চুক্তিগুলোর শর্ত হবে স্বচ্ছ ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট।
বাংলাদেশের করণীয়
বাংলাদেশের সামনে প্রথম কাজ হলো শিল্পায়নের সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন যুক্ত করা। মাতারবাড়ী বন্দর বা অন্য কোনো বড় প্রকল্পের সাফল্য শুধু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মাধ্যমে পরিমাপ করা যাবে না। দেখতে হবে, এসব প্রকল্পের ফলে কত নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে, কত কর্মসংস্থান হচ্ছে এবং রপ্তানিতে কতটা নতুন মূল্য সংযোজন হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জনে গুরুত্ব দিতে হবে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়ালে স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগের সুফল বৃহত্তর অর্থনীতিতে সঞ্চারিত হবে।
তৃতীয়ত, ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থের স্পষ্টীকরণ দরকার। বন্দর, সড়ক ও রেলপথ ব্যবহারের শর্ত এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে বাংলাদেশ পরিবহনসেবা থেকে আয় করার পাশাপাশি নিজস্ব রপ্তানি ও শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
সবশেষে জাপান, ভারত ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে সব দেশের সঙ্গে একই ধরনের সম্পর্ক রাখা; বরং প্রতিটি অংশীদারের কাছ থেকে বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাজার প্রবেশাধিকার ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ আদায় করা।
ভৌগোলিক অবস্থান থেকে অর্থনৈতিক সক্ষমতা
জাপানের বিগ–বি পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানোর সুযোগ। মনে রাখা দরকার, পৃথিবীতে আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া সবচেয়ে পিছিয়ে। ফলে এই প্রকল্প আঞ্চলিক সংযুক্তি বৃদ্ধির বড় সুযোগ।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগরের বন্দর ও জাপানি বিনিয়োগ—এই তিনটি উপাদান বাংলাদেশের শিল্পায়নে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সম্ভাবনা আর বাস্তবতা এক নয়।
বিষয়টা হলো, কেবল অন্য দেশকে পণ্য পরিবহনের পথ ভাড়া দিয়ে বিশেষ কিছু হবে না; তখন বরং বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা পাবে অন্য দেশগুলো। এই যোগাযোগের ভিত্তিতে শিল্প, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশ নিজেই আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এখানেই ভূ-অর্থনীতির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ভূরাজনীতি যেখানে ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা ও প্রভাবের হিসাব-নিকাশ, সেখানে ভূ-অর্থনীতির কাজ হলো, সেই অবস্থান, অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের কৌশল হিসেবে কাজে লাগানো। শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারল শুধু তার ওপর নয়; বরং সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে কতটা দেশীয় উৎপাদন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি করতে পারল, তার ওপরও। ভূরাজনীতির মানচিত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক। ভূ-অর্থনীতির বাস্তবতায় সেই সুবিধা টেকসই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করাই হবে বাংলাদেশের প্রকৃত অর্জন।
প্রতীক বর্ধন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
