পরিবারের জন্য অর্থ খরচ করা যখন ইবাদত

ছবি: প্রথম আলো

পরিবার ও সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হালাল উপার্জনের বিকল্প নেই। তবে এই সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি তা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও আমাদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

আমাদের সমাজে অনেকে পুণ্যের আশায় অনাথ-অসহায়দের পেছনে দুহাতে অর্থ ব্যয় করেন, কিন্তু নিজের এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটানো যে একটি ইবাদত, তা অনেক সময় ভুলে যান।

ইসলাম পরিবার-পরিজনের অধিকার আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর পিতার ওপর দায়িত্ব হলো, ন্যায়সংগতভাবে মায়েদের খোরপোষ প্রদান করা।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩৩)

হাদিসে আছে; রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষের সর্বোত্তম মুদ্রা সেটি, যা সে তার পরিবারের খরচে ব্যয় করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯৯৪)

সুতরাং পরিবারের পেছনে ব্যয় করা শুধু জাগতিক প্রয়োজন নয়; এটি মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভেরও অন্যতম মাধ্যম।

পারিবারিক ব্যয় করাও সদকা

অনেকেই মনে করেন সম্পদ শুধু জনকল্যাণমূলক কাজে বা দান-খয়রাতে ব্যয় করলেই সওয়াব মেলে। কিন্তু ইসলামি বিধান অনুযায়ী, পরিবারের অন্ন-বস্ত্র ও বাসস্থানের পেছনে অর্থ খরচ করা একটি সর্বোত্তম সদকা।

হাদিসে আছে, সওয়াবের আশায় যখন কোনো মুসলমান নিজ পরিবারে অর্থ ব্যয় করে, তখন তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি তার পরিবারে যে খরচ করে, তা সদকাস্বরূপ। অর্থাৎ এতেও সে সদকার সওয়াব পাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪০০৬)

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে গভীর করতে একে অপরকে উপহার প্রদান ও ভালোবেসে ব্যয় করা অত্যন্ত বরকতময়। হাদিসে এসেছে, স্ত্রীকে খুশি করার জন্য স্বামী যা কিছু ব্যয় করে, তাতেও সদকার সওয়াব নিহিত।
আরও পড়ুন

মহানবী (সা.) পরিবারের পেছনে ব্যয়ের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে আরও বলেছেন, তু‘মি একটি দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) আল্লাহর রাস্তায় খরচ করলে, একটি দিনার দাস মুক্তিতে দিলে, একটি মিসকিনকে দিলে এবং একটি দিনার তোমার পরিবারের জন্য খরচ করলে—এর মধ্যে পরিবারের পেছনে ব্যয় করা দিনারটির সওয়াবই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৫৮)

সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করা

ইসলাম ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার নির্দেশ দেয়। পরিবারের প্রধানের ওপর দায়িত্ব হলো নিজ শাসিত পরিজনদের প্রতি লক্ষ্য রাখা।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, ‘সচ্ছল ব্যক্তি তার সচ্ছলতা অনুযায়ী ব্যয় করবে, আর যার রিজিক সীমিত করে দেওয়া হয়েছে, সে ব্যয় করবে আল্লাহ যতটুকু তাকে দিয়েছেন, তাত্থেকে। (সুরা তালাক, আয়াত: ৭)

ব্যক্তির কর্তব্য হলো, ব্যয়ের ক্ষেত্রে সামর্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখা এবং আপন সাধ্যানুযায়ী ব্যয় করা।

স্ত্রীকে খুশি করতে ব্যয় করা

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে গভীর করতে একে অপরকে উপহার প্রদান ও ভালোবেসে ব্যয় করা অত্যন্ত বরকতময়। হাদিসে এসেছে, স্ত্রীকে খুশি করার জন্য স্বামী যা কিছু ব্যয় করে, তাতেও সদকার সওয়াব নিহিত। এমনকি নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কেউ তার স্ত্রীকে পানি পান করালেও তাতে সওয়াব রয়েছে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৭১৯৫)

এমনকি স্ত্রীর মোহরানা প্রদান বা পরিবারের ভরণপোষণে যা ব্যয় হয়, পরকালে তার জন্যও মিলবে বিশেষ প্রতিদান।

আরও পড়ুন
তুমি নিজে যা খাবে, তা তোমার জন্য সদকা। তুমি সন্তানদের যা খাওয়াবে, তা তোমার জন্য সদকা। তুমি স্ত্রীকে যা খাওয়াবে, তা-ও তোমার জন্য সদকা।
মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৭২১৮

সাহাবি আমর ইবনে উমাইয়া (রা.) একবার বাজারে গিয়ে একটি রেশমি চাদর দরদাম করছিলেন। যেটি তিনি সদকা হিসেবে তাঁর স্ত্রীকে উপহার হিসেবে দেবেন। ওমর (রা.) যখন জানতে পারলেন, আমর নিজের স্ত্রীকে কিছু দেওয়াকে সদকা বলছেন, তখন তিনি বেশ অবাক হন এবং এ কথা নবীজি বলেছেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যান।

পরে নিশ্চিত হতে তাঁরা দুজন আয়েশার কাছে যান। আয়েশা (রা.) নিশ্চিত করেন যে রাসুল (সা.) সত্যিই বলেছিলেন, ‘স্ত্রীদের যা কিছু দেওয়া হয়, তা সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (বাইহাকি, মারিফাতিস সুনান ওয়াল আসার, হাদিস: ২৫৫৮)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, পরিবার ও স্ত্রীর পেছনে খরচ করাও সওয়াবের কাজ। এমনকি উপহারসামগ্রী প্রদানকেও ইসলাম সদকা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

উত্তরসূরিদের স্বাবলম্বী রেখে যাওয়া

ইসলাম স্ত্রী-সন্তান ও পরিজনদের জন্য ব্যয় করা এবং উত্তরসূরিদের স্বাবলম্বী করে রেখে যেতে বলেছে।

হজরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) একবার অসুস্থ অবস্থায় নবীজিকে তাঁর সমস্ত সম্পদ দান করে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। নবীজি (সা.) তাঁকে বাধা দিয়ে বলেন, ‘এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পদ দান করা ঠিক নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরিবার-পরিজনকে পরমুখাপেক্ষী করে রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদেরকে স্বনির্ভর রেখে যাওয়া তোমার জন্য উত্তম। কারণ, তা না হলে তারা মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়াবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫৪)

নিজের আহার ও সুস্থতায় ব্যয় করা

ব্যক্তির নিজের ওপর ব্যয় করা সম্পদও সদকা হিসেবে বিবেচিত। মানুষ যখন সুস্থ থাকার নিয়তে বা কোনো অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য নিজের ওপর ব্যয় করে, সেটিও পরকালীন সঞ্চয় হিসেবে আমলনামায় যোগ হয়।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তুমি নিজে যা খাবে, তা তোমার জন্য সদকা। তুমি সন্তানদের যা খাওয়াবে, তা তোমার জন্য সদকা। তুমি স্ত্রীকে যা খাওয়াবে, তা-ও তোমার জন্য সদকা।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৭২১৮)

আরও পড়ুন