ব্যর্থ হলেই আমরা হিসাব মেলাতে বসি, ‘আহা, আমি যদি সেদিন ওই পথটিতে না যেতাম!’, ‘আমি যদি আরেকটু সতর্ক হতাম, তবে হয়তো এমন ক্ষতি হতো না!’ এই যে অতীতমুখী অনুশোচনার গোলকধাঁধা তা মানুষকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয় এবং ধীরে ধীরে তার ভবিষ্যৎ কর্মস্পৃহাকে পঙ্গু করে দেয়।
এই ধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়া শয়তানের প্ররোচনার পথও খুলে দেয়। কীভাবে? তা ইসলামি জীবনদর্শনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
মহানবীর দিকনির্দেশনা
মানুষকে এই মানসিক বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে এক জীবন্ত ও ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনতে মহানবী (সা.) একটি কালজয়ী উপদেশ দিয়েছেন।
যখন কেউ বলে, ‘যদি সে আমার কথা শুনত তবে মারা যেত না’, তখন সে মূলত কার্যকারণকে পরম ক্ষমতা দিয়ে আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে যেন অস্বীকার করে বসে।
তিনি বলেছেন, “দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম ও প্রিয়; তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। তুমি সেই কাজে আগ্রহী হও যা তোমার উপকারে আসে, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো এবং উদ্যমহীন হয়ে পোড়ো না। আর তোমার ওপর কোনো বিপদ এলে এ কথা বোলো না যে—‘যদি আমি এমন করতাম তবে এমন হতো’; বরং বলো, ‘আল্লাহ যা তাকদিরে নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তা-ই করেছেন’। কারণ ‘যদি’ (শব্দটির অসতর্ক ব্যবহার) শয়তানের কর্মপদ্ধতির দুয়ার খুলে দেয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)
এই হাদিস একদিকে যেমন মুমিনকে উদ্যমী, শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী হওয়ার তাগিদ দেয়, অন্যদিকে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলে অহেতুক ‘যদি’ বলে আক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে বলে।
কারণ, যা ঘটে গেছে তা বদলানোর ক্ষমতা মানুষের নেই। অহেতুক অতীত টেনে অনুশোচনা করলে শয়তান হতাশার বীজ বপনের সুযোগ পায়।
কখন ‘যদি’ শয়তানের দুয়ার খোলে
‘যদি’ শব্দটি কেবল একটি সাধারণ অব্যয় নয়; বরং তা অনেক সময় মানুষের অন্তরের অবস্থান ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটায়। ইসলামি আকিদায় তাকদিরে বিশ্বাস রাখা ইমানের অন্যতম স্তম্ভ।
কিন্তু যখন কেউ বলে, ‘যদি সে আমার কথা শুনত তবে মারা যেত না’, তখন সে মূলত কার্যকারণকে পরম ক্ষমতা দিয়ে আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে যেন অস্বীকার করে বসে।
কোরআনে মোনাফেক ও অবিশ্বাসী মানুষদের এই মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করে বলা হয়েছে, “হে ইমানদারগণ, তোমরা তাদের মতো বোলো না যারা কুফরি করেছে এবং তাদের ভাইয়েরা যখন সফর বা যুদ্ধে বের হয়ে মারা গেল, তখন বলল, তারা যদি আমাদের কাছে থাকত তবে মারা যেত না কিংবা নিহত হতো না; এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদের অন্তরে কেবল আক্ষেপই বৃদ্ধি করেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৬)
তোমার ওপর কোনো বিপদ এলে এ কথা বোলো না যে—‘যদি আমি এমন করতাম তবে এমন হতো’; বরং বলো, ‘আল্লাহ যা তাকদিরে নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তা-ই করেছেন’। কারণ ‘যদি’ (শব্দটির অসতর্ক ব্যবহার) শয়তানের কর্মপদ্ধতির দুয়ার খুলে দেয়।সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪
অন্য আয়াতে যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়া মোনাফেকদের কথার জবাবে আল্লাহ বলেন, “বল, তবে তোমরা নিজেদের ওপর থেকে মৃত্যুকে সরিয়ে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৮)
কারণ জীবনের সময়সীমা নির্ধারিত; সেখানে মানুষের অহেতুক আক্ষেপ কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর নির্ধারিত সময় যখন এসে যায়, তখন তা আর পিছানো হয় না।” (সুরা নুহ, আয়াত: ৪)
কখন ‘যদি’ বলা বৈধ
তবে কি ‘যদি’ শব্দকে পুরোপুরি বর্জন করতে হবে? ইমাম বুখারি (রহ.) তাঁর হাদিস গ্রন্থে ‘মা ইয়াজুজু মিনাল লূ’ (যদি শব্দের যেসব ব্যবহার বৈধ) নামে একটি পৃথক অধ্যায় বিন্যস্ত করেছেন।
সেখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে অতীত নিয়ে হতাশাজনক আক্ষেপ করা নিষিদ্ধ হলেও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, শিক্ষাদান, শুভকামনা বা সৎ কাজের উদ্দেশ্যে ‘যদি’ শব্দটি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বৈধ। এমনকি কখনো কখনো প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর। যেমন:
১. শিক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক চিন্তায়: কোনো সম্ভাব্য বিপদ বা সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘যদি’ বলা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। যেমন সাহাবি হোজাইফা (রা.) সাধারণ মানুষের বিপরীত প্রশ্ন করতেন।
তিনি বলেছেন, “মানুষ নবীজিকে কল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত, আর আমি তাকে অকল্যাণ ও বিপর্যয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম এই ভয়ে যে তা যেন আমাকে গ্রাস না করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭০৮৪)
ইমাম কুরতুবি লিখেছেন, “এই হাদিস প্রমাণ করে যে কোনো সংকট আসার আগেই সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও সমাধান খোঁজা সম্পূর্ণ জায়েজ ও দায়িত্বশীল আচরণ।” (কুরতুবি, আল-মুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখিসি কিতাবি মুসলিম, ৪/৫৮, দার ইবনে কাসির, দামেস্ক, ১৯৯৬)
২. স্বাভাবিক কার্যকারণ উল্লেখের ক্ষেত্রে: কার্যকারণ উল্লেখ করার সঙ্গে যদি আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা থাকে, তবে ‘যদি’ বলা ক্ষতিকর নয়। যেমন হিজরতের সময় সওর পর্বতের গুহায় যখন কাফেররা দোরগোড়ায় এসে পড়েছিল, তখন চরম উত্কণ্ঠায় হজরত আবু বকর (রা.) বলেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের দিকে তাকায় তবেই আমাদের দেখে ফেলবে!” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৮১)
এখানে আবু বকর (রা.) স্বাভাবিক আশঙ্কার কথা বলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ইমানের কোনো ঘাটতি ছিল না।
নিজের অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে শুধরে নেওয়ার জন্য কিংবা কাউকে কোনো কাজে আরও ভালো বিকল্পের পরামর্শ দিতে ‘যদি’ বলা যায়।
৩. সৎ কাজ বা কল্যাণের আকুতিতে: ভালো কোনো কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশে ‘যদি’ ব্যবহার করা প্রশংসনীয়। যেমন আল্লাহর সাহায্য ও ক্ষমতার আকুতি জানিয়ে হজরত লুত (আ.) বলেছিলেন, “আহা, যদি তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো শক্তি থাকত অথবা আমি কোনো সুদৃঢ় আশ্রয়ে আশ্রয় নিতে পারতাম!” (সুরা হুদ, আয়াত: ৮০)
একইভাবে, কোনো ব্যক্তি যদি বলে, ‘আমার যদি সম্পদ থাকত, তবে আমি অমুক দানশীল ব্যক্তির মতো নিঃস্বার্থভাবে দান করতাম’, তবে রাসুলের ঘোষণা অনুযায়ী সে তার সৎ নিয়তের দরুন দানকারীর সমান সওয়াব লাভ করবে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩২৫)
৪. উত্তম বিকল্প পরামর্শে: নিজের অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে শুধরে নেওয়ার জন্য কিংবা কাউকে কোনো কাজে আরও ভালো বিকল্পের পরামর্শ দিতে ‘যদি’ বলা যায়।
নবীজি (সা.) তাঁর এক স্ত্রী মাইমুনার মুক্ত দাসীর বিষয়ে বলেছিলেন, “যদি তুমি এটি তোমার মামাদের দিয়ে দিতে, তবে তোমার সওয়াব আরও বেশি হতো।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯৯৯)
এখানে উত্তম কাজের নসিহত করতেই ‘যদি’ ব্যবহার করা হয়েছে।
অতএব, ইসলামি জীবনদর্শনের আসল শিক্ষা হলো অতীত নিয়ে নিরর্থক কেঁদে সময় নষ্ট না করে অনুশোচনাকে এক নতুন কর্মশক্তিতে রূপান্তর করা। শয়তানের প্ররোচনার ‘যদি’ থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ইতিবাচক কর্মের ওপর আস্থা রাখতে হবে।