ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.)-এর শাসনকালকে ইসলামি ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি এমন কিছু যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পদ্ধতির প্রবর্তন করেছিলেন, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজসংস্কারকদের জন্য আজও পরম বিস্ময়ের বিষয়।
তিনি জনগণের নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে যে দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তার অন্যতম ছিল রাতের পাহারাদারি ব্যবস্থাপনা।
বর্তমানের সুশৃঙ্খল পুলিশি ব্যবস্থার যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আমরা দেখি, মদিনার পুণ্যভূমিতে তার আদি রূপ দেখা যায়। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, তাঁর এই উদ্ভাবনী কর্মতৎপরতা থেকেই আজকের পুলিশি ব্যবস্থার বীজ বপন করা হয়েছিল।
প্রহরা ব্যবস্থা থেকে পুলিশি ব্যবস্থাপনা
ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর শাসনামলে প্রহরীদলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)। এরপর ওমর (রা.) খলিফা হলে তাঁর আমলে এই ব্যবস্থা আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও বিস্তৃত রূপ পায়।
ওমর (রা.) নিজেই এই কঠিন দায়িত্ব পালনে রাজপথে নেমে আসতেন। কখনো তাঁর সঙ্গে থাকতেন আসলাম, আবার কখনো সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)।
বর্তমানের সুশৃঙ্খল পুলিশি ব্যবস্থার যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আমরা দেখি, মদিনার পুণ্যভূমিতে তার আদি রূপ দেখা যায়। ইতিহাসবিদের মতে, এ থেকেই পুলিশি ব্যবস্থার বীজ বপন হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল রাতে চোর, ডাকাত ও অপরাধীদের হাত থেকে নাগরিকদের রক্ষা করা। সেকালে মানুষ দিনের বেলা নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই বজায় রাখতে পারলেও রাতে যখন শহরবাসী ঘুমে বিভোর থাকত, তখন খলিফা নিজে অতন্দ্র প্রহরীর মতো মদিনার অলিগলি পাহারা দিতেন।
কালক্রমে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় যখন দিনেও সতর্ক দৃষ্টি রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখনই এই ব্যবস্থাটি একটি পূর্ণাঙ্গ পুলিশি ব্যবস্থাপনা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
মানুষের অবস্থা পর্যবেক্ষণ
অনেক সময় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ বা সমস্যার কথা খলিফার কান পর্যন্ত পৌঁছাতে ইতস্ততবোধ করত। কিন্তু রাতের এই টহলের ফলে খলিফা নিজ চোখে সেই চিত্রগুলো দেখতে পেতেন।
মদিনার অলিগলিতে ঘুরে তিনি দুঃখী ও বিপদগ্রস্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস শুনতেন এবং তাৎক্ষণিক প্রতিকারের ব্যবস্থা করতেন।
রাতের এই টহল থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাই ওমর (রা.)-কে ইসলামি রাষ্ট্রের কয়েকটি যুগান্তকারী নীতিমালা প্রণয়নে সহায়তা করেছে।
তিনি যখন নিজের চোখে সাধারণ মানুষের সংকট দেখতেন, তখন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সেই অনুযায়ী পরিবর্তন আনতেন। মদিনার প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই তিনি পুরো সালতানাতে একটি শক্তিশালী শাসনকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন।
আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রে পুলিশ বা নিরাপত্তাবাহিনীকে অনেক ক্ষেত্রে জনসেবার চেয়ে জনদমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়।
বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় শাসক ও জনগণের মাঝে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হয়েছে। শাসকেরা যখন কয়েক ধাপের নিরাপত্তা-চাদরে ঢাকা থাকেন, তখন সাধারণ মানুষের আর্তনাদ অনেক সময় তাঁদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না।
উল্টো আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রে পুলিশ বা নিরাপত্তাবাহিনীকে অনেক ক্ষেত্রে জনসেবার চেয়ে জনদমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়।
নিরাপত্তাবাহিনীও যদি জনগণের জান-মালের নিরাপত্তাকে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করত, তবে পৃথিবী থেকে জুলুম ও অস্থিরতা বিদায় নিত। তাই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মূল পরিচয় হওয়া উচিত জনগণের ‘সেবক’।
তারা যেমন শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় আদেশ এড়িয়ে চলবে, তেমনি নাগরিকদের ওপর অত্যাচার থেকেও নিজেদের বিরত রাখবে।
সূত্র: ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লাবি, ফাসলুল খিতাব ফি সিরাতি আমিরিল মুমিনিন উমার ইবনিল খাত্তাব, ১/২৪৫-২৪৬, দার ইবনে কাসির, বৈরুত, ২০০২।
ইলিয়াস মশহুদ: গবেষক ও প্রাবন্ধিক