আল্লাহর দাসত্বের মর্যাদা

ছবি: পেক্সেলস

আমরা সবাই মহান আল্লাহর বান্দা বা দাস। ‘দাস’ শব্দটা শুনলে সাধারণ অর্থে কিছুটা নিচু মনে হলেও আল্লাহর দাস হওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা এবং পরম মর্যাদার।

আল্লাহর দাসত্ব কী

আল্লাহর দাসত্ব বা ‘আবদিয়্যাত’ কেবল নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজ আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক।

ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.)-কে একবার এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত করো’—আয়াতে ইবাদতের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তার মর্মার্থ কী?

উত্তরে তিনি লিখেছেন, ইবাদত এমন একটি ব্যাপক শব্দ, যার মধ্যে সব ধরনের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ কথা ও কাজ অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ-তাআলা পছন্দ করেন এবং যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন।

নামাজ, রোজা, জাকাত, হজের পাশাপাশি সত্য কথা বলা, আমানতদারি, মা-বাবার আনুগত্য, ওয়াদা রক্ষা, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ, আল্লাহর পথে জিহাদ, প্রতিবেশী ও অভাবীদের সঙ্গে সদাচার, এমনকি পশুপাখির প্রতি দয়া প্রদর্শনও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।

এ ছাড়া আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা, আল্লাহর রহমতের আশা ও আজাবের ভয়, একনিষ্ঠতা, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা এবং তাওয়াক্কুলের মতো গুণগুলোও ইবাদতের অংশ। (ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ, আল উবুদিয়্যাহ, আল মাতবাআতুল হোসাইনিয়্যাহ আল মিসরিয়্যাহ)

আল্লাহর অনুগত হলে সব ধরনের মন্দ কাজ থেকে বাঁচা সহজ হয়। যেমন আল্লাহ-তাআলা তাঁর একনিষ্ঠ বান্দা ইউসুফ (আ.)-কে মিসরের আজিজের স্ত্রীর অনিষ্ট থেকে হেফাজত করেছিলেন।
আরও পড়ুন

নবী ও ফেরেশতাদের পরিচয়

উভয় জাহানে মহান আল্লাহ-তাআলার পরেই আমাদের প্রিয়নবী (সা.)-এর মর্যাদা। এত মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে আল্লাহর ‘আবদ’ বা দাস হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন।

এক হাদিসে তিনি বলেন, ‘তোমরা আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করো না, যেমন খ্রিষ্টানরা মরিয়ম-পুত্রের ব্যাপারে করেছে। আমি কেবল তাঁর আবদ (দাস), তাই তোমরা আমাকে বলো: আল্লাহর দাস ও তাঁর রাসুল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৪৫)

নফল নামাজ পড়তে পড়তে তাঁর পা মোবারক ফুলে গেলে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসার উত্তরে তিনি বলতেন, ‘আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮৩৬)

আল্লাহ-তাআলাও তাঁর প্রিয় হাবিবের অনেক গুণ থাকা সত্ত্বেও কোরআনের বহু জায়গায় তাঁকে ‘আবদ’ বলে সম্বোধন করেছেন।

কোরআনের এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘আর আমি আমার দাসের ওপর যা নাজিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাকো, তবে তার মতো একটি সুরা নিয়ে এসো এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাকো; যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩)

তোমরা আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করো না, যেমন খ্রিষ্টানরা মরিয়ম-পুত্রের ব্যাপারে করেছে। আমি কেবল তাঁর আবদ (দাস), তাই তোমরা আমাকে বলো: আল্লাহর দাস ও তাঁর রাসুল।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৪৫

এমনকি মেরাজের মতো মহান ঘটনার বর্ণনায় আল্লাহ-তাআলা তাঁকে নিজের ‘দাস’ হিসেবেই পরিচয় দিয়েছেন, ‘পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর দাসকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ১)

একইভাবে ফেরেশতাদের সম্পর্কেও বলা হয়েছে, ‘তারা তো তাঁর সম্মানিত দাস, তারা আল্লাহর আগে বেড়ে কথা বলে না; তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে থাকে।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ২৬-২৭)

মানুষ ও জিন সৃষ্টির লক্ষ্যই হলো আল্লাহর দাসত্ব করা, ‘আর জিন ও মানুষকে কেবল এই জন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদত (দাসত্ব) করবে।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ৫৬)

আরও পড়ুন

আল্লাহর দাসত্বের সুফল

আল্লাহর যথাযথ দাসত্ব করলে জীবনে অনেক কল্যাণ অর্জিত হয়:

১. শয়তানের চক্রান্ত থেকে মুক্তি: আল্লাহর দাসত্ব মেনে চললে তিনি বান্দাকে শয়তানের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করেন। বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো ক্ষমতা নেই, তবে পথভ্রষ্টরা ছাড়া যারা তোমাকে অনুসরণ করেছে।’ (সুরা হিজর, আয়াত: ৪২)

২. কর্তৃত্ব অর্জন ও ভয় থেকে মুক্তি: আল্লাহর দাসত্ব অবলম্বন করলে পৃথিবীতে মুসলমানদের কর্তৃত্ব ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদের জমিনের প্রতিনিধিত্ব প্রদান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দীন... এবং তিনি তাদের ভয়-ভীতি শান্তি-নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। তারা আমারই ইবাদত করবে...।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৫৫)

আর রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে—সালাম।
কোরআন, সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৩

৩. মন্দ ও অশ্লীলতা থেকে সুরক্ষা: আল্লাহর অনুগত হলে সব ধরনের মন্দ কাজ থেকে বাঁচা সহজ হয়। যেমন আল্লাহ-তাআলা তাঁর একনিষ্ঠ বান্দা ইউসুফ (আ.)-কে মিসরের আজিজের স্ত্রীর কুপ্রস্তাব ও অনিষ্ট থেকে হেফাজত করেছিলেন।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর সে মহিলা তার প্রতি আসক্ত হলো, আর সেও তাঁর প্রতি আসক্ত হতো, যদি না তার রবের স্পষ্ট প্রমাণ প্রত্যক্ষ করত। এভাবেই, যাতে আমি তাঁর থেকে অনিষ্ট ও অশ্লীলতা দূর করে দিই। নিশ্চয়ই সে আমার খালেস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ২৪)

৪. মুত্তাকি হওয়ার মাধ্যম: আল্লাহর দাসত্বকে প্রাধান্য দিলে তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের পথ মসৃণ হয়। কোরআনে এসেছে, ‘হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত করো, যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের এবং তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১)

৫. নম্রতা ও ভদ্রতা সৃষ্টি: আল্লাহর দাসত্বকে জীবনের লক্ষ্য বানালে মানুষের মধ্যে নম্রতা তৈরি হয় এবং অনর্থক তর্ক-বিতর্ক এড়িয়ে চলার মানসিকতা জন্মে।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে—সালাম।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৩)

অন্যদিকে, আল্লাহর দাস হওয়াকে যারা অপমানের মনে করে, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর হুঁশিয়ারি।

হজরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘মসিহ (ঈসা) আল্লাহর বান্দা হওয়াকে তুচ্ছ জ্ঞান করেন না, আর নৈকট্যের অধিকারী ফেরেশতারাও না। যে তাঁর ইবাদতকে হেয় জ্ঞান করে আর অহংকার করে, তিনি তাদের সবাইকে শীঘ্রই তাঁর কাছে একত্রিত করবেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৭২)

আল্লাহ-তাআলা আমাদের সবাইকে যথাযথভাবে তাঁর দাসত্বের হক আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

নূর মুহাম্মদ রাহমানী: শিক্ষাসচিব, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ।

আরও পড়ুন