সাকিব টসে জেতার পর ফিল্ডিং নিয়ে ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিল। তাসকিনের প্রথম দুই ওভার দেখে অনেক খুশি হয়েছি। ওর লাইন, লেংথ দারুণ ছিল। একই সঙ্গে ভারত দলকে দেখেও মনে হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে শুরুতে উইকেট হারানোর পর আর সেই ফাঁদে পড়তে চাইছে না।

দলের সেরা বোলার তাসকিনকে একটানা ৪ ওভার করিয়েছে সাকিব। নিজেও টানা বোলিং করেছে। বৃষ্টি এলেও যাতে সেরা বোলারদের সদ্ব্যবহার হয়, এ কারণেই হয়তো এমন কৌশল। যেটি দেখে ভালো লেগেছে। ক্যাচ মিস খেলারই অংশ, তবে হাসানের মিসটি দেখে খারাপই লেগেছে। তাসকিন একটু দুর্ভাগাই।

রাহুল ধীরে শুরু করার পর যেভাবে দ্রুত এগোল, সূর্যকুমারের আগুনে ব্যাটিং, সঙ্গে কোহলি—এদের উপস্থিতি চাপ তৈরি করছিল। তবে মোস্তাফিজ এখন ধারাবাহিক, সাকিবও নিজের কাজটা করেছে। আর অমন মার খাওয়ার পরও শরীফুলের ওপর শেষ ওভারে অধিনায়ক আস্থা রেখেছে দেখে খুশি হয়েছি।

একটা ব্যাপার বলতে চাই, টি-টোয়েন্টিতে একজন বোলারের নো করার দায় কোচকেও নিতে হবে। যার নো বল করার প্রবণতা আছে, বসে থাকার পর দলে এলে তাকে প্রস্তুত রাখার দায়িত্ব বোলিং কোচের। এত বেতন দিয়ে বোলিং কোচ রাখা হয়, এসব বিষয়ে তো নজর দিতে হবে। কম রানে হারার পর ছোটখাটো অনেক বিষয় সামনে আসে।

ভারতের মতো বিশ্বমানের কোনো ব্যাটিং লাইনআপের কাছে এমন স্কোর প্রত্যাশিতই। তবে বাংলাদেশের ব্যাটিং শুরু হওয়ার পর কেউ চোখ সরাতে পারেনি, চমকটা সেখানেই। লিটনের ইনিংসটি শুধু আজকের ম্যাচে নয়, এ বিশ্বকাপেই আমার দেখা সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইনিংস। গ্লেন ফিলিপসের মতো গায়ের জোর খাটাচ্ছে, এমন মনে হয়নি। লক্ষ্যটা বেশ বড় হলেও ক্লাস ব্যাটসম্যানদের মতো খেলে গেছে। সব বোলারের ওপরই দাপট দেখিয়েছে।

ইনিংসটা দেখে আসলে বুক ভরে গেছে। অন্য ব্যাটসম্যানরা ভুগছে, আর তার এত সুন্দর টাইমিং! মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ—এদের দেখে অনেকে যেমন পেস বোলার, অলরাউন্ডার, ওপেনার, ফিনিশার বা মিস্টার ডিপেন্ডেবল হতে চেয়েছে, আজকের ইনিংসের পর হয়তো অনেকেই লিটন দাস হতে চাইবে।

লিটনের সামর্থ্যের কথা হয়তো অনেকেই জানেন, আজ আরও অনেকেই জানলেন। আমাদের উঠতি ক্রিকেটাররা যদি লিটন দাস হতে চায়, আমি খুশি হব। কিছু কিছু ইনিংস এমন বিপ্লবই ঘটিয়ে দেয়। আমার বয়স যদি ১২-১৪ থাকত, তাহলে লিটনের মতো এমন একটা ইনিংস খেলার স্বপ্ন দেখতাম, হয়তো শেষ করে আসতে চাইতাম।
ওর রানআউটে তাই বুকটা ভেঙে গেছে।

বৃষ্টি হবে, সেটা একরকম জানাই ছিল। দলও নিশ্চয়ই জানত। আমাদের দুর্ভাগ্য, ইনিংসের ওই গতিশীল অবস্থায় বৃষ্টিতে ছন্দপতনটা হলো। ঘাসের মধ্য দিয়ে দৌড়াতে গিয়েই তো রানআউট হলো লিটন। বৃষ্টির পর এমন মাঠে স্বচ্ছন্দ হলে আরেকটু বড় স্পাইক পরা যায়, এমন পরামর্শও তো কেউ দিতে পারত! বৃষ্টির পর যে পরিবর্তিত লক্ষ্য, কী হবে না হবে, এমন ম্যাচ জেতার সম্ভাবনা—এসবের মধ্য দিয়ে তো খুব বেশি এ দলটা যায়নি। হয়তো এরপরের চাপটাই নিতে পারেনি ঠিকঠাক।

লিটন ফেরার পরও বাকিদের সামর্থ্য দেখানোর সুবর্ণ সুযোগ ছিল। সবাই হয়তো এমন বড় দলের বিপক্ষে জয়ের সুযোগ এলে ভূমিকা রাখতে চায়, নায়ক হতে চায়। তবে এমন পরিস্থিতিতে কে কখন নামবে, সে ব্যাপারে মাঠের বাইরে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা একটু গড়বড় করেছেন বলে মনে হয়। হয়তো মোসাদ্দেককে আরেকটু ওপরে পাঠানোর সুযোগ নিতে পারতাম, আফিফকেই সেখানে পাঠাতে হবে এমন তো নয়।

হার্ড-হিটার হিসেবে ইয়াসিরের সুনাম থাকলেও চাপের মুখে কে কেমন খেলে, সেটিও বুঝতে হবে। নুরুলের স্টান্সের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, বোলার বল করার আগেই তার পজিশনিং স্কয়ার লেগ থেকে মিডউইকেট দিয়ে খেলার সুযোগ তৈরি করে দেয়। ওই দুই দিক কাজে লাগানোর সবচেয়ে বেশি সুযোগ ছিল। তার শটের রেঞ্জও বড়। দূর থেকে মনে হচ্ছে, এদিকে ম্যানেজমেন্ট আরও মনোযোগী হতে পারত। সাকিবকে আর ২-৩ ওভার ক্রিজে থাকতে হতো। আমাদের দুর্ভাগ্য। আর আগের ম্যাচে অমন ইনিংসের পর আজ নাজমুলের এমন ব্যাটিং দেখে হতাশই হয়েছি।

যাই হোক, সৃষ্টিকর্তা সবকিছুই দেননি হয়তো। আজ জিতলে বিপরীত একটা বার্তা আসতে পারত। আমাদের আক্ষেপটা থাকুক। আরও ভালো করার, উন্নতি করার জায়গা আরও খুঁজি। ভুল নির্দিষ্ট করি। আরেকটি ম্যাচ বাকি, সেখানে সামর্থ্যের প্রয়োগ দেখতে পারলে ভালো লাগবে। হয়তো আজকের হারের ধকল কাটাতে দলের একটু সময় লাগবে। কিন্তু সামনের খেলার জন্যও তো তৈরি হতে হবে। তবে আজ ভালো লাগার ও তৃপ্তির জায়গা—ভারতকে অনেক কঠিন একটা সময় দিয়েছি।

আরেকটা ব্যাপার বলতে চাই, হার্শা ভোগলে ছাড়া এত বিখ্যাত সব ভারতীয় ধারাভাষ্যকারদের কথা। আমাদের ব্যাটিংয়ে যখন প্রাণ ছিল, ওদের কণ্ঠে তেমন প্রাণ পেলাম না! যাহোক, আমার প্রাণঢালা অভিনন্দন লিটন দাসকে। কোটি কোটি মানুষের চোখ ওর দিকে আটকে রাখছে। নেদারল্যান্ডস, জিম্বাবুয়ের চেয়ে মর্যাদার দিক দিয়ে ভিন্ন কাতারে নিয়ে গেছে বাংলাদেশকে।

আজ হেরে কষ্ট লেগেছে। যদিও আমার মনে হয়, সেমিফাইনাল-ফাইনাল খেলার মতো দল এখনো হয়ে যাইনি আমরা। তবে দলটি আমাদের গর্বিত করেছে। এই হারের মধ্যে কোনো গ্লানি দেখি না।