অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মৌসুম শেষের আগে ঘরের মাঠে সেদিন ১২ মে ছিল ইউনাইটেডের শেষ ম্যাচ, সোয়ানসি সিটির বিপক্ষে। হাভিয়ের চিচারিতো হার্নান্দেজ আর রিও ফার্ডিনান্ডের গোলে কিংবদন্তি কোচকে ওল্ড ট্রাফোর্ডে জয় উপহার দিয়ে বিদায় জানিয়েছিল রেড ডেভিলরা। ম্যাচ শেষে কানায় কানায় ভর্তি ওল্ড ট্রাফোর্ডকে উদ্দেশ্য করে ফার্গুসন বলেছিলেনন -

‘আপনাদের কাজ এখন নতুন কোচকে সমর্থন দেওয়া।’

সমর্থনে কাজ হয়নি। ময়েসের ব্যর্থতায় বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আরেক ম্যানেজারের দ্বারস্থ হয় ইউনাইটেড। ফার্গুসন যাওয়ার পর নিয়মিত সাফল্য না আসলেও, ইউনাইটেডের ডাগআউটে একের পর এক নতুন ম্যানেজারের নিয়মিত আনাগোনা হয়েছে ঠিকই। এই নয় বছরে ডেভিড ময়েস ছাড়াও ইউনাইটেডের ম্যানেজার হিসেবে দেখা গিয়েছে নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত কোচ লুই ফন গাল, ফন গালের এককালের কোচিং-শিষ্য জোসে মরিনিও, ফার্গুসনের সরাসরি ছাত্র উলে গুনার সুলশার ও জার্মানির কিংবদন্তি কোচ রালফ রাংনিককে। ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব হিসেব করলে তালিকাটা আরেকটু লম্বা হবে রায়ান গিগস ও মাইকেল ক্যারিকের কল্যাণে।

কিন্তু সাফল্য? সোনার হরিণ হয়েই থেকে গেছে। ফার্গুসন যাওয়ার পর লিগ বা চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোনোটাই জেতা হয়নি ইউনাইটেডের। এখন তো অবস্থা এমনই খারাপ—আগামী মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে আদৌ জায়গা পাওয়া যায় কি না, সেটা নিয়েই দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন রোনালদোরা। নিজের কোচিং দর্শন দিয়ে ক্লপ-নাগলসমান কিংবা গার্দিওলা-টুখেলকে প্রভাবিত করা কোচ রাংনিকও মাস পাঁচেক থেকে বুঝে গিয়েছেন, ব্যর্থতার যে কানাগলিতে ইউনাইটেড ঘুরে ঘুরে মরছে, সেখান থেকে উদ্ধার করা তাঁর কম্মো নয়।

default-image

অনন্যোপায় ইউনাইটেড এবার তাই এরিক টেন হাগের দ্বারথ হয়েছে। আয়াক্সকে তিনবার লিগ জেতানো, চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে নিয়ে গিয়ে সবাইকে চমকে দেওয়া ডাচ কোচের ছোঁয়ায় সাফল্যের আলো একটু যদি ওল্ড ট্রাফোর্ডে প্রবেশ করে, সেই আশায়। ম্যাথিয়াস ডি লিখট, ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং, ডনি ফন ডি বিক কিংবা হাকিম জিয়াশদের তারকা হওয়া যে কোচের অধীনে। টেন হাগের সঙ্গে আপাতত চুক্তি ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত, তবে দুই পক্ষ সম্মত থাকলে আরেক মৌসুম বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকছে চুক্তিতে। বর্তমান কোচ রালফ রাংনিক কোচিং ছেড়ে ইউনাইটেডে পরামর্শকের ভূমিকা নিচ্ছেন।

কিন্তু যে কাজে ফন গাল, মরিনিওর মতো বাঘা-বাঘা কোচ সফল হননি, টেন হাগ হবেন? ফার্গুসন যাওয়ার পর ইউনাইটেডের দায়িত্ব নেওয়া প্রত্যেক কোচই এক বিন্দুতে মিলেছেন এক জায়গায়। সবাই আগে-পরে অন্যান্য ক্লাবে কমবেশি সফল হলেও, এক ইউনাইটেডে এসেই ব্যর্থ। কেউই সমর্থকদের প্রত্যাশার চাপ সামলাতে পারেননি। প্রত্যেক কোচের সামর্থ্য ও প্রতিভার সবটুকু যেন শুষে নিয়েছিল ইউনাইটেড। ফলে এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক, সাফল্য না পাওয়ার দায় যতটা কোচদের, তার চেয়ে বেশি ইউনাইটেডের বর্তমান সংস্কৃতির। এমন বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করে টেন হাগ সফল হতে পারবেন তো?

২০১৭ সালে আয়াক্সের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ডাচদের যেভাবে ফুটবল খেলাচ্ছেন এই ৫২ বছর বয়সী, তাতে আশাবাদী হওয়া দোষের কিছু না। ২০১৮-১৯ মৌসুমের শেষ ষোলোতে রিয়াল মাদ্রিদকে রীতিমতো অসহায় বানিয়ে হারিয়েছিল আয়াক্স, তাদিচ-ডি ইয়ংদের ঝলকে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে জিতেছিল ৪-১ গোলে। পরের রাউন্ডে আয়াক্সের হাতে বিদায় নিয়েছিল রোনালদোর জুভেন্টাস। সেমিফাইনালে শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে মরিসিও পচেত্তিনোর টটেনহামের কাছে হেরে বাদ না পড়লে ফাইনালে লিভারপুলের প্রতিপক্ষ টেন হাগের আয়াক্সই হয়।

সেবার ফাইনালে না উঠলেও, ফুটবলবিশ্বকে চমকে দিয়েছিল আয়াক্স। সে মৌসুমের পর ডি ইয়ং থেকে শুরু করে ডি লিখট, জিয়াশ, দাভিদ নেরেস, লাসে শোয়েনা, আন্দ্রে ওনানা, সের্হিনিও দেস্ত, জোয়েল ভেল্টমান—ক্লাব ছেড়েছেন প্রত্যেকেই। খোদ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডই সেই আয়াক্সের অন্যতম প্রাণশক্তি ডনি ফন ডি বিককে দলে টেনেছিল।

default-image

সবাই চলে গেলেও, টেন হাগ থেকে গিয়েছিলেন ঠিকই। বার্সেলোনা, টটেনহাম, ডর্টমুন্ডের মতো ক্লাবের প্রলোভনে না পড়ে নিবিষ্টমনে আয়াক্সকে আবারও গড়ে তোলার কাজে মন দিয়েছিলেন। এতগুলো হাতিয়ার একসঙ্গে চলে যাওয়ায় বছর দুয়েক একটু চুপচাপ থাকলেও এবার আবারও ‘শোরগোল’ তুলেছে দলটা। লিগ তো জিতেছেই, চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপপর্বের ছয় ম্যাচেই জিতেছে। দ্বিতীয় রাউন্ডে বেনফিকার কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে বিদায় নেওয়ার আগে বুঝিয়েছে, তাদের কোচ প্রজ্ঞার দিক দিয়ে বর্তমান সময়ের যেকোনো তারকা কোচের তুলনায় খুব বেশি পিছিয়ে নেই।

আয়াক্সের এই পুনরুত্থানের গল্পটাই ইউনাইটেডের আশার রসদ। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে টেন হাগ দুই-দুইবার আয়াক্সকে গড়েছেন তিল তিল করে, শিরোপা জয়ের যোগ্য বানিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, ২০১৮-১৯ মৌসুমের ওই আয়াক্স আর আজকের আয়াক্সের মধ্যে তেমন কোনো মিলই নেই।

সেই আয়াক্স খেলত ৪-২-৩-১ ছকে। ডি ইয়ং, ডি বিক, ডি লিখট, ওনানা, তাদিচদের প্রতিভায় পূর্ণ সেই আয়াক্সের শক্তিশালী একাদশটা ছিল অনেকটা এমন -

default-image

আজকের আয়াক্স ৪-২-৩-১ নয়, বরং খেলে ৪-৩-৩ ছকে।

default-image

শুধু তাদিচ আর ব্লিন্ডই একাদশে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন, বাকি সবকিছুই বদলে গেছে। বদল এসেছে খেলোয়াড়দের ভূমিকাতেও। আগের আয়াক্সে যে তাদিচ ‘ফলস নাইন’ না ছদ্ম স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলতেন, সে তাদিচ এখন আবার লেফট উইঙ্গারের দায়িত্ব নিয়েছেন, ক্যারিয়ারের শুরুতে যিনি লেফট উইঙ্গার হিসেবেই খেলতেন। ওই আয়াক্সে ডি লিখটের পাশে সেন্টারব্যাক হিসেবে ডেলেই ব্লিন্ড খেললেও, এ আয়াক্সে ব্লিন্ড খেলেন লেফটব্যাক হিসেবে। আর্জেন্টাইন সমর্থকদের একটু কষ্ট হতে পারে, ব্লিন্ড লেফটব্যাক হিসেবে খেলার কারণে ২০১৮-১৯ মৌসুমে আয়াক্সের লেফটব্যাক নিকোলাস তালিয়াফিকো একাদশে জায়গা হারিয়েছেন।

default-image

তবে আয়াক্সের লেফটব্যাক পজিশনে তালিয়াফিকোকে না দেখে কষ্ট হলেও সেন্টারব্যাকে লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে দেখে সে কষ্ট মিটে যাওয়ার কথা আর্জেন্টিনা-ভক্তদের। ডি লিখটের দায়িত্ব নিয়েছেন এই মার্তিনেজই, সঙ্গে পেয়েছেন প্রতিভাবান সেন্টারব্যাক ইউরিয়েন তিম্বারকে। যে তিম্বার অনেকটা ব্লিন্ডের মতো। ব্লিন্ড যেমন লেফটব্যাক, সেন্টারব্যাক, সেন্ট্রাল মিডফিল্ড - সব জায়গাতেই খেলতে পারেন, এই তিম্বারও তাই। সব্যসাচী। সেন্টারব্যাক হিসেবে খেললেও দলের প্রয়োজনে দেখা যায় রাইটব্যাক কিংবা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকায়।

default-image

রাইটব্যাক হিসেবে একাদশে নুসাইর মাজরাউই নিজের জায়গা পোক্ত করেছেন আরও, যে মাজরাউই ওই আয়াক্সে ভেল্টমানের সঙ্গে জায়গা পাওয়ার জন্য নিয়ত লড়াই করতেন। গোলবারের নিচে ওনানা নন, এসেছেন বর্ষীয়ান রেমকো পাসভির।

ওই আয়াক্সের ৪-২-৩-১ ছকে দুজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার খেলতেন। ডি ইয়ং বা শোয়েনা—দুজনের কেউ নিজের জায়গায় স্থির থাকতেন না। রক্ষণে থাকা ডি লিখট বা ব্লিন্ডের কাছ থেকে বল যোগাড় করার জন্য নিচে নেমে আসতেন ডি ইয়ং। বল নিয়ে আবার উঠে যেতেন আক্রমণে। ডি ইয়ংয়ের গতিবিধির উপর নির্ভর করত শোয়েনার অবস্থান।

কেন্দ্রীয় আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের ভূমিকায় থাকা ডি বিক অবশ্য মেসুত ওজিত, কাকা কিংবা ফিলিপ কুতিনিওর মতো অত সৃষ্টিশীল ছিলেন না। অবশ্য টেন হাগ তাঁকে যেভাবে খেলাতেন, তাতে তাঁর অত সৃষ্টিশীল না হলেও চলত। ডি বিকের দক্ষতা ছিল প্রতিপক্ষ ডিবক্সে ক্রমাগত প্রেস করার মাধ্যমে ফাঁকা জায়গা বের করার মধ্যে, গোল করার জন্য সঠিক অবস্থানে পৌঁছে যাওয়ার মধ্যে - বায়ার্ন মিউনিখে যে কাজটা টমাস মুলার ভালোভাবে করেন অনেক। ডি ইয়ং উঠে আসলে অনেক সময় নিচে নেমেও খেলতেন ডি বিক। অর্থাৎ টেন হাগের ওই মিডফিল্ডে কারওর জায়গাই নির্দিষ্ট ছিল না সেভাবে।

default-image

এই আয়াক্সের মিডফিল্ডেও কারওর জায়গা নির্দিষ্ট নয়। ডি ইয়ংয়ের জায়গায় আয়াক্স একাডেমি থেকে উঠে এসেছেন ডাচ মিডফিল্ডার রায়ান গ্রাভেনবার্খ, শোয়েনার জায়গায় এসেছেন মেক্সিকোর এডসন আলভারেজ। ওদিকে ডি বিকের স্থানে ডাচ মিডফিল্ডার স্টিভেন বের্গুইস। আগে সেন্টারব্যাক ছিলেন দেখেই কি না, শোয়েনার চেয়ে আলভারেজ তুলনামূলকভাবে নিচেই থাকেন, রক্ষণে বাড়তি নিরাপত্তা দেন। ওদিকে এই আয়াক্সে ‘ডি ইয়ং’-য়ের ভূমিকা নিয়েছেন গ্রাভেনবার্খ। পার্থক্য একটাই, ডি ইয়ং যেখানে নিচ থেকে বল যোগাড় করার জন্য প্রায় সেন্টারব্যাক হয়ে যেতেন, গ্রাভেনবার্খ অত নিচে নামেন না। তবে ওপরে ওঠেন ঠিকই। ৪-৩-৩ ছকে আলভারেজকে রক্ষণাত্মক ভূমিকায় রেখে গ্রাভেনবার্খ ও বের্গুইস (কিংবা দাভি ক্লাসেন) খেলেন জোড়া ‘নম্বর ৮’ হিসেবে। যাদের কাজ প্রতিপক্ষের ডিবক্সের সামনে হাফস্পেসে জায়গা খুঁজে নিয়ে আক্রমণ করা।

আগের আয়াক্স কোনো প্রথাগত স্ট্রাইকার খেলাত না, দুসান তাদিচের মতো উইঙ্গার খেলতেন ছদ্ম স্ট্রাইকারের ভূমিকায়। এ আয়াক্স অমন নয়। সেবাস্তিয়েন আলেরকে মোটামুটি আদর্শ স্ট্রাইকারই বলা যায়। আইভরিয়ান এই স্ট্রাইকার ওয়েস্ট হ্যামে গিয়ে ফর্ম হারিয়েছিলেন, টেন হাগের ছোঁয়ায় পেয়েছেন নবজীবন।

শুধু আলের বলেই নয়। টেন হাগের ছোঁয়ায় নবজীবন পাওয়া খেলোয়াড়ের সংখ্যা এই আয়াক্সে নিছক কম নয়। তাদিচ নিজেই তো সাউদাম্পটনে শেষ দিকে এসে নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিলেন, আয়াক্সে এসে হালে পানি পেয়েছেন। ডেলেই ব্লিন্ডের মূল্য বোঝেনি খোদ ইউনাইটেড, এখন আয়াক্সে ফিরে ব্লিন্ডই টেন হাগের অন্যতম অস্ত্র। একই কথা প্রযোজ্য দাভি ক্লাসেনের ক্ষেত্রেও। যে ক্লাসেন এভারটনে গিয়ে এক পর্যায়ে ম্যাচ স্কোয়াডেই জায়গা পেতেন না, সে মিডফিল্ডার টেন হাগের আয়াক্সে নিজের জায়গা খুঁজে পেয়েছেন ভালোভাবেই। টেন হাগ আসার ফলে ইউনাইটেডে নিজেকে হারিয়ে খোঁজা মার্কাস রাশফোর্ড, ফ্রেদ, ভিক্টর লিন্ডেলফ, অ্যারন ওয়ান-বিসাকা কিংবা ডিন হেন্ডারসনরা তাই আশাবাদী হতেই পারেন।

default-image

আগের আয়াক্সে ডি ইয়ং, ডি লিখট, ডে বিক, দেস্ত কিংবা ওনানাদের ঘষেমেজে তারকা বানানো টেন হাগ ইউনাইটেডেও গড়ে তোলার জন্য বেশ কয়েকজন আনকোরা তরুণ পাচ্ছেন। তবে দলের স্বার্থে অ্যান্থনি এলাঙ্গা, হ্যানিবল মেজব্রি কিংবা আমাদ দিয়ালোরা ডি ইয়ংদের মতো অধ্যবসায় দেখাতে পারেন কি না, সেটাই আলোচনার বিষয়।

টেন হাগের আয়াক্সে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ৪-৩-৩ ও ৪-২-৩-১ ছকের কোনোটাই ইউনাইটেডের খেলোয়াড়দের কাছে অপরিচিত নয়। অপরিচিত কিছু থেকে থাকলে, সেটা ছকের বাস্তবায়ন। আয়াক্সের প্রায় প্রত্যেক খেলোয়াড়ই একাধিক ভূমিকায় খেলে অভ্যস্ত।

শুধু মাঝমাঠের কথাই ধরুণ। একটা আদর্শ মিডফিল্ডে যেকোনো কোচ অন্তত তিনটি গুণের প্রতিফলন দেখতে চান। সৃষ্টিশীল পাস বা নিখুঁত ক্রস দিয়ে গোলমুখ খোলা, ট্যাকল বা প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে রক্ষণে সাহায্য করা ও মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে ক্রমাগত দৌড়াদৌড়ি করে প্রেস করা। আগের যুগে এই তিন কাজের মধ্যে যেকোনো একটা কাজ ভালোভাবে করলেই বিশ্বখ্যাত যেকোনো ক্লাবে খেলার লাইসেন্স পাওয়া যেত। এখন সেটা আর সম্ভব না। প্রত্যেক মিডফিল্ডারকে উপরোক্ত তিনটি গুণের মধ্যে অন্তত দুটি বা তিনটি রপ্ত করতে হয়। আয়াক্সের প্রতিটা মিডফিল্ডারই একাধিক কাজে দক্ষ।

default-image

ইউনাইটেডের মিডফিল্ডাররা এই জায়গাতেই পিছিয়ে। প্রত্যেক মিডফিল্ডারই বড় একমাত্রিক। নেমানিয়া মাতিচ রক্ষণে ভালোভাবে সাহায্য করতে পারলেও এই বয়সে বাকি কাজগুলো পারেন না। একই কথা বলা যায় ম্যাকটমিনের ক্ষেত্রেও। পগবা যথেষ্ট সৃষ্টিশীল, কিন্তু বাকি দুই গুণ তাঁর কস্মিনকালেও ছিল না। ফ্রেদ আবার যন্ত্রের মতো প্রেস করতে পারলেও বাকি দুই কাজ পারেন না। এক ব্রুনো ফার্নান্দেসই বিশ্বমানের, কিন্তু একজন দিয়ে কী আর গোটা মাঝমাঠের ভার বহন করানো যায়? গত সপ্তাহে নরউইচের বিপক্ষে ইউনাইটেডের ৩-২ গোলে জেতা ম্যাচটাতেই যেমন, রোনালদো হ্যাটট্রিক করে সে যাত্রায় দলকে উদ্ধার করলেও, ইউনাইটেড মাঝমাঠের খামতিগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিয়েরান ডাওয়েলের করা নরউইচের প্রথম গোলে পগবা কিংবা ম্যাগুয়ারদের প্রেসের নমুনা দেখলেই বুঝবেন, এই ইউনাইটেড আয়াক্সের চেয়ে কতটা পিছিয়ে। টেন হাগের ইউনাইটেড তাই নিঃসন্দেহে অন্তত দুজন মিডফিল্ডার দলে আনতে চাইবে। মাতিচ, পগবা আর লিনগার্ড চুক্তি নবায়ন না করলে যে সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে।

default-image

এবার আসা যাক রক্ষণে। টেন হাগের রক্ষণভাগে প্রত্যেক ডিফেন্ডারকে বল পায়ে দক্ষ হতে হয়। যাতে নিচ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলা যায়। আগের আয়াক্সের ডি লিখট কিংবা এই আয়াক্সের মার্তিনেজ-তিম্বার, প্রত্যেকেই রক্ষণ থেকে বল বের করে এনে সামনে পাঠানোতে ওস্তাদ। তিম্বার তো মাঝেমধ্যেই দুই উইংয়ে থাকা আন্তোনি কিংবা তাদিচের দিকে লং বল পাঠিয়ে দ্রুত আক্রমণ গড়ে দেন। দুই ফুলব্যাককে আক্রমণ ও রক্ষণ, দুই দিকেই সমান পারদর্শী হতে হয়।

আয়াক্সের পায়ে যখন বলের দখল থাকে, ৪-৩-৩ ছকে চার ডিফেন্ডার ও একজন রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডারের মধ্যে যেকোনো তিনজনকে পেছনে রেখে বাকি সবাইকে ওপরে ওঠার নির্দেশনা দেন টেন হাগ। ফলে দুই ফুলব্যাক মাজরাউই ও ব্লিন্ড/তালিয়াফিকো অনেক সময় ছদ্ম উইঙ্গার হিসেবে ওপরে উঠে বসে থাকেন। ছকটা অনেক ক্ষেত্রেই তখন ৩-১-৬ হয়ে যায়।

default-image

প্রশ্ন হলো, ইউনাইটেডের ফুলব্যাকরা এই যুগপৎ আক্রমণ-রক্ষণের কাজে কতটুকু স্বচ্ছন্দ? রাইটব্যাক ওয়ান বিসাকা রক্ষণে দুর্দান্ত হলেও আক্রমণের ব্যাপারে তাঁকে নিয়ে যত কম বলা যায় ততই ভালো। ওদিকে আরেক রাইটব্যাক দিওগো দালোত আক্রমণে মোটামুটি কার্যকর হলেও সব মিলিয়ে ঠিক প্রতিপক্ষ রাইটব্যাকদের (ট্রেন্ট অ্যালেক্সান্ডার-আরনল্ড, রিস জেমস, জোয়াও কানসেলো) মতো বিশ্বমানের নন। লেফটব্যাকে বরং চিন্তা একটু কম, গত এক-দেড় বছরে লুক শ নিজের খেলায় উন্নতি এনেছেন অনেক। টেন হাগের ইউনাইটেডে তাঁর জায়গা বেশ ভালোভাবেই থাকবে হয়তো।

সেন্টারব্যাক হিসেবে ইউনাইটেডের কেউই পেছন থেকে বল বের করে এনে আক্রমণ রচনা করার জন্য পরিচিত নন। হ্যারি ম্যাগুয়ার বাতাসে ভেসে আসা বল হেড করে সামলানোর দিক দিয়ে বিশ্বমানের হলেও ট্যাকল করতে সেভাবে পারেন না। বল বের করে আনার জন্য ড্রিবল করতে পারলেও রক্ষণের সময় নিজের অবস্থান কখন কোন জায়গায় থাকা উচিৎ সেটা বুঝতে পারেন না প্রায়ই, যে কারণে গোল হজম করে বসেন। ওদিকে পাশে একজন আগ্রাসী ডিফেন্ডার থাকলে রাফায়েল ভারানের খেলাও অসাধারণ হয়ে যায়। পাশে রামোস নেই এখন, যে কারণে এই ফরাসি ডিফেন্ডার বেশ ভালোই ভুগছেন। ট্যাকল করার দিক দিয়ে আবার লিন্ডেলফ আর বাইয়ি ওপরের দুজনের চেয়ে বেশ ভালো। টেন হাগ ইউনাইটেডে এসে তাই অন্তত একজন সেন্টারব্যাক চাইবেন হয়তো।

default-image

টোটাল ফুটবল দ্বারা অনুপ্রাণিত পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি, মিকেল আরতেতার আর্সেনাল ও জাভির বার্সেলোনার মধ্যে খেলার ধরণের মধ্যে একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রায়ই দেখা যায়। লেফটব্যাকের সঙ্গে বাঁ দিকে থাকা মিডফিল্ডার ও উইঙ্গার মিলে প্রতিপক্ষের রক্ষণের ডান দিকে এক ধরণের ত্রিভুজ সৃষ্টি করেন (সিটিতে কানসেলো-ডে ব্রুইনা/গুনদোয়ান-স্টার্লিং/ফোডেন, বার্সায় আলবা-ডি ইয়ং-ফেরান, আর্সেনালে টিয়েরনি-শাকা-মার্তিনেল্লি/স্মিথ রো)। যে কৌশল প্রতিপক্ষের গোলমুখ খুলতে সাহায্য করে। একই কাজ করেন রাইটব্যাক, রাইট মিডফিল্ডার ও রাইট উইঙ্গার (সিটিতে ওয়াকার-বের্নার্দো-মাহরেজ/জেসুস, বার্সায় আলভেজ-পেদ্রি-আদামা/দেম্বেলে)। টেন হাগের আয়াক্সও আক্রমণে এমন ত্রিভুজ গঠন করে প্রতিপক্ষের গোলমুখ খোলায় অভ্যস্ত (বাঁ দিকে ব্লিন্ড-গ্রাভেনবার্খ-তাদিচ, ডানদিকে মাজরাউই-বের্গুইস-আন্তোনি)।

default-image

দুই উইঙ্গারের মধ্যে আবার অন্তত একজন উইঙ্গারকে গার্দিওলা, আরতেতা কিংবা জাভি - প্রত্যেকেই আদেশ দেন ভেতরে না ঢুকে আদর্শ উইঙ্গারের মতো সাইডলাইন ঘেঁষে থাকতে। যাতে প্রতিপক্ষের অন্তত একজন ডিফেন্ডারকে আকৃষ্ট করে পরে গতি ও ড্রিবলিংয়ের মিশেলে পরাস্ত করে বক্সে ক্রস বা পাস দেওয়া যায়। গার্দিওলার সিটিতে এ কাজ বেশি করেন মাহরেজ আর স্টার্লিং, জাভির বার্সায় এ কাজ করার জন্য আছেন দেম্বেলে আর আদামা, আর্সেনালে আছেন বুকায়ো সাকা। টেন হাগও এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করেন আন্তোনিকে দিয়ে। বর্তমানে ইউনাইটেডে এই কাজ সবচেয়ে ভালো করেন সানচো, যে সানচো আবার ভেতরে ঢুকে খেলা গড়ে দেওয়ার কাজেও পারদর্শী। কিন্তু এক উইঙ্গার দিয়ে কি আর সব কাজ হয়? লিনগার্ড, রাশফোর্ড, মার্সিয়াল বা এলাঙ্গাদের কেউই যেহেতু যুগপৎভাবে কাজগুলো করতে পারেন না, সেহেতু নতুন একজন উইঙ্গার আনার দিকেও নজর দেবে ইউনাইটেড।

default-image

সানচোর কাছ থেকে সম্পূর্ণ উপযোগিতা পাওয়ার জন্য তারা এমন এক ফুলব্যাক চাইবে, যার সঙ্গে বোঝাপড়া করে সানচো নিয়মিত গোল করার জায়গায় চলে যেতে পারেন। সানচো রাইট উইঙ্গার হলেও, প্রায়ই বাম উইংয়ে খেলেন কেবলমাত্র একটা কারণে - ডান দিকে থাকা ওয়ান বিসাকার চেয়ে বাঁ দিকের লুক শ বেশি আক্রমণাত্মক। শ যেহেতু নিয়মিত ওপর-নিচ দুই জায়গায়ই দৌড়ে সামাল দিতে পারেন, সানচোকে বল যোগাড় করার জন্য অতটা নিচে না নামলেও হয়। যে কাজটা ডানে থাকলে সেভাবে পারেন না এই ইংলিশ উইঙ্গার। এই সমস্যার একটা সমাধানও বের করতে হবে টেন হাগকে। হয় একজন সানচোর পেছনে খেলানোর জন্য নতুন আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক কেনার মাধ্যমে, বা শ এর সামনে খেলানোর মতো একজন উইঙ্গার কেনার মাধ্যমে যিনি নিয়মিত কাটব্যাক করে মাঝখানে চলে এসে গোলে সহায়তা করতে পারেন - আগের আয়াক্সে যে কাজটা হাকিম জিয়াশ অনেক ভালো পারতেন।

default-image

স্ট্রাইকার হিসেবে তাদিচের মতো ফলস নাইন খেলুক বা আলেরের মতো 'আসল নাইন' - গোল করার পাশাপাশি আধুনিক ফরোয়ার্ডের মতো প্রেস করা, আক্রমণসঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে খেলা বানিয়ে দেওয়ার দক্ষতা, একটু নিচে নেমে আসা - এসব গুণাবলি থাকা বড্ড জরুরি। ঠিক এই জায়গাতেই টেন হাগের ইউনাইটেডে ব্রাত্য হয়ে পড়তে পারেন রোনালদো। কারণ গোল করার দিক দিয়ে রোনালদোর তুল্য এখনও তেমন কেউ না থাকলেও, একজন আদর্শ ফরোয়ার্ডের অন্যান্য কাজ এখন অতটা ভালোভাবে করতে করতে পারেন না তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর টেন হাগের সাক্ষাৎকারেও সেটা বোঝা গেছে। 'ত্রাউ' কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টেন হাগ এর মধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, 'আমি কোনো তারকা খেলোয়াড়ের জন্য নিজের দর্শন বদলাব না। আমি প্রত্যেক খেলোয়াড়কে কাজ নির্দিষ্ট করে দেব। সে কাজ যদি কেউ করতে ব্যর্থ হয়, সে আমার কাছ থেকে অবশ্যই কথা শুনবে।'

এবার আসা যাক গোলবারের নিচে থাকা খেলোয়াড়ের আলোচনায়। আধুনিক যেকোনো ক্লাবই এমন গোলকিপার চায়, যিনি শট আটকানোর ক্ষেত্রে দুর্দান্ত হওয়ার পাশাপাশি বাড়তি একজন ডিফেন্ডার হিসেবে পেছন থেকে পাস দিয়ে আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেন, বল যখন দলের পায়ে থাকে তখন ওপরে উঠে আসার মাধ্যমে দলের রক্ষণভাগকে ‘হাই লাইন’ কৌশল বাস্তবায়ন করায় সহায়তা করেন। লিভারপুলের আলিসন বেকার, সিটির এদেরসন, বায়ার্নের ম্যানুয়েল নয়্যার - প্রত্যেকে এই কাজে দক্ষ। ওদিকে ইউনাইটেডের দাভিদ দা হেয়া ইউনাইটেডের বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কার চারবার পেলেও, এক শট আটকানো ছাড়া পেছন থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার ব্যাপারে বেশ দুর্বল। যে কারণে আক্রমণ গড়ে তুলতে বেশ সমস্যা হয় ইউনাইটেডের। টেন হাগ অবশ্যই চাইবেন, গোলকিপার হিসেবে এমন একজন থাকুন, যিনি শুধু শট আটকানোই নয়, বরং বাড়তি এক ডিফেন্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

default-image

তবে আশার কথা এটাই, নিজের ছক আর কৌশলের ব্যাপারে টেন হাগ বেশ নমনীয়। খেলোয়াড়দের ওপর নিজের কৌশল চাপিয়ে দিতে চান না, বরং হাতে থাকা খেলোয়াড়দের সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে নিজের কৌশল নির্ধারণ করেন। ২০১৯ সালে আয়াক্সকে লিগ ও কাপ জেতানোর পর এক সাক্ষাৎকারে এই ডাচ ম্যানেজার জানিয়েছেন এমনটাই, ‘খেলোয়াড়দের মানই কৌশল নির্ধারণ করে, উল্টোটা নয়।’ ফলে ইউনাইটেডের ম্যানেজার হয়েই যে টেন হাগ হুট করে একের পর এক খেলোয়াড় বিক্রি করে নতুন তারকা দিয়ে দল ভর্তি করে ফেলবেন, হয়তো তেমনটা হবে না।

default-image

তবে একাধিক খেলোয়াড় আসুক আর নাইবা আসুক, টেন হাগকে নিশ্চিত করতে হবে, প্রত্যেক খেলোয়াড় দলে আসা বা দল থেকে যাওয়ার পেছনে যেন তাঁর সম্মতি থাকে। ক্লাবকর্তাদের আগ্রহের কারণে এমন কোনো খেলোয়াড় যেন দলে না আসে, যাকে তিনি চান না। কিংবা এমন কোনো খেলোয়াড় যেন ইউনাইটেড থেকে চলে না যায়, যাকে টেন হাগ ছাড়তে চান না। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন যাওয়ার পর ইউনাইটেডের প্রত্যেক ম্যানেজারই এই যন্ত্রণায় কমবেশি ভুগেছেন। উলে গুনার সুলশারই যেমন, ওয়েস্ট হ্যামের রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার ডেকলান রাইস বা বোর্নমাথের সেন্টারব্যাক নাথান আকে কে চাইলেও ক্লাবের হস্তক্ষেপের কারণে আকাশছোঁয়া বেতনে দলে আসেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। যে দলবদলের ঘটনায় পাহাড়সম আবেগের জায়গা থাকলেও, যুক্তি ছিল না তেমন। যার খেসারত নিজের চাকরি হারানর মাধ্যমে দেন সুলশার।

ওদিকে জোসে মরিনিওর মতো ম্যানেজার টোবি অল্ডারভেইরেল্ড, কিয়েরান ট্রিপিয়ের ও জেরোম বোয়াতেংদের মতো তারকাদের চাইলেও কাউকেই পাননি। দলবদল সংক্রান্ত সকল ব্যাপারে টেন হাগের মতামতই যেন শেষ কথা হয়, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব খোদ টেন হাগেরই।

আর বাকিটা? সেটা না হয় এই ডাচ কোচের ফুটবলীয় কৌশল আর খেলোয়াড়দের ভালো করার আগ্রহের ওপরেই ছেড়ে দেওয়া যাক। টেন হাগের অধীনে টোটাল ফুটবলের যুগে ইউনাইটেড কতো ভালোভাবে প্রবেশ করতে পারে, সেটাই দেখার বিষয় এখন।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন