মরিনিও কি আসলেই রিয়ালে ফিরছেন, কেন পেরেজের তাঁকে পছন্দ
সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সাদা প্রাসাদে কি তবে আবারও সেই চেনা শোরগোল ফিরছে? যে শোরগোলের নাম জোসে মরিনিও!
এই মৌসুম শেষে রিয়াল মাদ্রিদের কোচের দায়িত্বে যে আলভারো আরবেলোয়া আর থাকছেন না, সেটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। নতুন কোচ কে হচ্ছেন, সেটা নিয়ে মাদ্রিদের অলিতে-গলিতে নানা গুঞ্জন চলছে। সেই গুঞ্জনে এসেছে অনেক চমকজাগানো নাম। সাবেক লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ আছেন এই তালিকায়, বিস্ময়করভাবে এসেছে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী কোচ লিওনেল স্কালোনির নামও। আর এসেছে রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে একসময়ের চেনা মুখ মরিনিওর নামটাও।
মাদ্রিদে মরিনিওর প্রথম অধ্যায়টা (২০১০-১৩) ছিল যেন একটা ঝোড়ো উপন্যাসের মতো। বার্সেলোনার পেপ গার্দিওলার সেই অজেয় দলের বিপক্ষে মরিনিওর রিয়ালের চোখে চোখ রেখে লড়াই সেই সময় ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল এল ক্লাসিকোকে। তবে পাশাপাশি সাংবাদিক, রেফারি এমনকি খোদ ক্লাবের কিংবদন্তি ইকার ক্যাসিয়াস কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গেও তাঁর অম্লমধুর (অধিকাংশই অম্ল) সম্পর্ক নিয়ে আজও বার্নাব্যুতে গল্প হয়। তবে শেষটায় ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা তিক্ত হয়ে পড়েছিল মরিনিওর।
তবু রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ তাঁকে ভোলেননি।
কারণটা সহজ। পেপ গার্দিওলার সেই অপ্রতিরোধ্য বার্সেলোনার বিরুদ্ধে মরিনিও যেভাবে লড়েছিলেন, সেটা মুগ্ধ করেছিল পেরেজকে। ‘শত্রুপক্ষ’কে ঠেকানোর জন্য যে সাহসী কোচ দরকার, মরিনিওর মধ্যে সেই গুণটি দেখেছিলেন পেরেজ। ক্লাবের ঘনিষ্ঠ এক পর্যবেক্ষকের কথায়, ‘পেরেজ মরিনিওর সব কিছুই পছন্দ করেন—শুধু তাঁর ফুটবলের ধরনটা বাদে।’
পেরেজের বয়স এখন ৭৯। এই বয়সে মানুষ নতুনের চেয়ে পুরোনো চেনা পথেই বেশি স্বস্তি পায়। কার্লো আনচেলত্তি কিংবা জিনেদিন জিদানকে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে এনে রিয়াল সভাপতি সফল হয়েছেন। কিন্তু মরিনিও কি একই পথের পথিক হতে পারবেন? ‘দ্য স্পেশাল ওয়ান’ এখন আর কতটা স্পেশাল, সেই প্রশ্ন কিন্তু জোরালো।
এই মুহূর্তে মরিনিও বেনফিকার কোচ। পর্তুগালের প্রিমেরা লিগায় তাঁর দল অপরাজিত থাকলেও ২৭ ম্যাচে আট ড্রয়ের বোঝা কাঁধে নিয়ে তারা শীর্ষে থাকা পোর্তোর চেয়ে সাত পয়েন্ট পিছিয়ে। চ্যাম্পিয়নস লিগে এই মৌসুমে ৯ ম্যাচের ৬টিতেই হেরেছে মরনিওর দল। একটা জয়ের কথা অবশ্য উল্লেখযোগ্য। গ্রুপ পর্বে বেনফিকা আনাতোলি ত্রুবিনের শেষ মুহূর্তের গোলে হারিয়ে দিয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদকে!
তবে গত এক দশকে মরনিওর ট্রফি ক্যাবিনেটে মরচে পড়ার জোগাড়। চেলসি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, টটেনহাম কিংবা রোমা—কোথাও সেই আগের সেই আগের আভা দেখা যায়নি। ফেনারবাচেতে থাকার সময়ে তো রীতিমতো বিতর্কের ঝড় বইয়ে দিয়েছিলেন। গালাতাসারাইয়ের কোচেরা ‘বানরের মতো লাফায়’ বলে মন্তব্য করে নিষেধাজ্ঞা খেয়েছেন। প্রতিপক্ষ কোচের নাক ধরে টেনেছেন। রেফারিদের সঙ্গে অবিরাম ঝামেলা বাঁধিয়েছেন। টিভি ক্যামেরার সামনে ল্যাপটপ রেখে রেফারির সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। দেখে মনে হয়েছিল, এ মানুষ মরিয়া হয়ে প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টা করছেন।
তবে মরিনিওর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিব্রতকর অধ্যায়টা হয়তো এসেছে মাত্র কয়েক মাস আগেই। গত ফেব্রুয়ারিতে বেনফিকা-রিয়াল ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র যখন বর্ণবাদের শিকার হলেন, মরিনিও তখন ভুক্তভোগীকেই দুষলেন। তাঁর মতে, ভিনিসিয়ুসের উদ্যাপনই নাকি দর্শকদের খেপিয়ে দিয়েছিল! পর্তুগিজ কিংবদন্তি ইউসেবিওর উদাহরণ টেনে তিনি বলতে চাইলেন, বেনফিকায় বর্ণবাদ থাকতেই পারে না। প্রশ্ন উঠছে, যে লোক ভিনিসিয়ুসকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান, তাঁর অধীনে ব্রাজিলিয়ান তারকা খেলবেন কীভাবে? বর্ণবাদের শিকার হওয়া এক তরুণকে সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে উল্টো দোষারোপের সেই সুর ভিনিসিয়ুস কি সহজে ভুলবেন?
রিয়ালের ড্রেসিংরুমটা ভিনিসিয়ুসের মতো নক্ষত্রদের মেলা, সেখানে মরিনিওর মতো বিশাল অহংবোধের একজন মানুষকে ফিরিয়ে আনা মানেই তো বারুদ ঠাসা ঘরে দেশলাই জ্বেলে দেওয়া।
তবু কেন মরিনিও? কারণ, বর্তমান রিয়াল মাদ্রিদ যেন এক ভারসাম্যহীন দল। আক্রমণভাগে এত এত তারকা, কিন্তু রক্ষণ নড়বড়ে। টানা দ্বিতীয় মৌসুম বড় কোনো ট্রফি ছাড়া কাটাতে যাচ্ছে ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই ক্লাব। এই মুহূর্তে রিয়ালের ড্রেসিংরুম সামলানো তাই সহজ নয়। তারকাদের আহামরি অহংকার সামলে রাখতে পারেন, ক্লাবের চাপে ভেঙে পড়েন না, ভরা বার্নাব্যুর উত্তাপ সইতে পারেন, মিডিয়াকে মোকাবিলায় মুনশিয়ানা রাখেন—এমন কাউকে চান পেরেজ। বড় ইগোকে সামলাতে হলে মাঝেমধ্যে তার চেয়েও বড় ইগো দরকার। সহজ কথায়, বিষে বিষক্ষয় করার জন্য মরিনিওর চেয়ে ভালো আর কে হতে পারেন!
জাবি আলনসোর হাত ধরে রিয়াল যে আধুনিক ফুটবলের স্বপ্ন বুনেছিল, তা আট মাসেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। এখন সেই তথাকথিত ‘আধুনিকতা’ বিসর্জন দিয়ে পেরেজ আবারও ফিরতে চাইছেন তাঁর অতি পরিচিত সেই ‘প্রাগমেটিজম’ বা বাস্তববাদের কাছে। যেখানে সৌন্দর্যের চেয়ে যেভাবেই হোক জয়ের কদর বেশি।
তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাব, যাদের টাকাপয়সা, প্রভাব কিছুরই কমতি নেই, তারা কি চাইলেই এর চেয়ে ভালো কাউকে কোচ হিসেবে নিতে পারে না? পারে। কিন্তু পেরেজ হয়তো চান মরিনিওকেই।
যদি মরিনিও সত্যিই আবার বার্নাব্যুর ডাগ-আউটে দাঁড়ান, তবে একটা বিষয় নিশ্চিত—মাদ্রিদে যাই হোক না কেন, তা কখনোই ‘বোরিং’ হবে না।