মৌসুম শেষেই লিভারপুল ছাড়বেন সালাহ
সব ভালোর শেষ আছে। প্রায় ৯ বছর ধরে লিভারপুলের সব ভালোর শীর্ষবিন্দু হয়ে থাকা মোহাম্মদ সালাহকেও তাই শেষের সময়টা বলে দিতে হলো। চলতি মৌসুম শেষেই লিভারপুল ছাড়বেন কিংবদন্তি। কাল রাতে ৩৩ বছর বয়সী সালাহ নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তায় এ ঘোষণা দেন।
লিভারপুল ও ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে অন্যতম সেরা এই ফুটবলার বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দিনটা চলেই এল। এটা আমার বিদায়ের প্রথম ধাপ। মৌসুম শেষেই আমি লিভারপুল ছেড়ে যাব।’
২০১৭ সালের জুনে ইতালিয়ান ক্লাব রোমা থেকে লিভারপুলে যোগ দেন সালাহ। গত বছরের এপ্রিলে ইংলিশ ক্লাবটির সঙ্গে দুই বছরের নতুন চুক্তি করেন। তবে ক্লাবের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ফ্রি এজেন্ট হিসেবে ক্লাব ছাড়বেন ‘মিসরীয় রাজা’।
লিভারপুলে সালাহ পারফরম্যান্সের যে মানদণ্ড তৈরি করেছেন, সে বিচারে এবারের মৌসুমটা তাঁর মোটেই ভালো যাচ্ছে না। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৪ ম্যাচে গোল মাত্র ১০টি। অ্যানফিল্ডে কাটানো ক্যারিয়ারে এবারের মৌসুমই সালাহর সবচেয়ে কম গোলের মৌসুম হতে যাচ্ছে।
মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে সালাহকে বেশি পুড়িয়েছে ক্লাবের ভেতরকার অস্থিরতা। গত ডিসেম্বরে লিডসের বিপক্ষে ৩-৩ গোলে ড্রয়ের পর এক সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছিলেন সালাহ। সরাসরি বলেছিলেন, ক্লাব তাঁকে ‘বলির পাঁঠা’ বানাচ্ছে। লিভারপুল কোচ আর্নে স্লটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতির বিষয়টিও তখন প্রকাশ্যে আসে।
গত জানুয়ারির দলবদলেই সালাহর ক্লাব ছাড়ার গুঞ্জন উঠেছিল। কিন্তু আফ্রিকা কাপ অব নেশনস খেলে ফিরে আবারও দলের সঙ্গে যোগ দেন এই ফরোয়ার্ড। অ্যানফিল্ড ছাড়ার পর আগামী মৌসুমে সালাহ কোন ক্লাবের হয়ে খেলবেন, সেটা এখনো নিশ্চিত নয়।
লিভারপুল জানিয়েছে, ‘যত দ্রুত সম্ভব’ সমর্থকদের জানাতে চাওয়ার কারণে সালাহ মৌসুমের এ সময়ে নিজের সিদ্ধান্ত জানালেন। সমর্থকদের প্রতি ‘শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা থেকে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবটুকু স্বচ্ছতা’ বজায় রাখতে চেয়েছেন তিনি।
অ্যানফিল্ডের জীবন সালাহর জীবনে অমোচনীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে। কোভিড মহামারির কঠিন সময় পার করা কিংবা সতীর্থ দিয়োগো জোতার অকালমৃত্যু—সবই সালাহর হৃদয়ে স্থায়ীভাবে দাগ কেটেছে। লিভারপুলের প্রতি কণ্ঠে মমতা ঝরিয়ে সালাহ বলেন, ‘এই ক্লাবের বাইরের কাউকে আমি আসলে ভাষায় বোঝাতে পারব না (লিভারপুল আমার কাছে কী)। আমরা একসঙ্গে জয়ের উৎসব করেছি, পরম আরাধ্য সব ট্রফি জিতেছি। আবার জীবনের কঠিনতম সময়ে আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছি। এখানে থাকাকালে যাঁরা এই ক্লাবের অংশ ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেককে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই। বিশেষ করে আমার সাবেক ও বর্তমান সব সতীর্থের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
গত ৯ বছরে লিভারপুলে সোনালি দিন ফিরে আসার নেপথ্যে অন্যতম কারিগর ছিলেন মোহাম্মদ সালাহ। তাঁর সময়ে অ্যানফিল্ডের ক্লাবটি জিতেছে দুটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ, উয়েফা সুপার কাপ, এফএ কাপ, দুটি লিগ কাপ ও কমিউনিটি শিল্ডের শিরোপা। এ পথে লিভারপুলের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন সালাহ। ৪৩৫ ম্যাচে করেছেন ২৫৫ গোল।
গোলে সালাহর সামনে শুধু লিভারপুল কিংবদন্তি ইয়ান রাশ (৩৪৬) ও রজার হান্ট (২৮৫)। তবে প্রিমিয়ার লিগে ক্লাবের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনটি তাঁর। চারবার জিতেছেন প্রিমিয়ার লিগের গোল্ডেন বুট। এ ছাড়া ২০১৮, ২০২২ এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে পিএফএর বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন সালাহ।
লিভারপুল সমর্থকদের প্রতি সালাহ বলেন, ‘সমর্থকেরা আমার ক্যারিয়ারের সেরা সময়গুলোতে পাশে ছিলেন আবার কঠিনতম সময়েও আমাকে আগলে রেখেছেন। তাঁদের এই অকুণ্ঠ সমর্থন আমি কখনোই ভুলব না।’
অ্যানফিল্ডে সালাহর সময়কে ‘অবিশ্বাস্য ৯ বছরের অধ্যায়’ বলেছে লিভারপুল কর্তৃপক্ষ। তবে সালাহর বিদায় নিয়ে এখনই কোনো বড় উদ্যাপন করবে না ক্লাবটি। মৌসুম শেষে রাজকীয়ভাবে তাঁকে বিদায় জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে লিভারপুলের।
ক্লাবটির পক্ষ থেকে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মৌসুমের এখনো অনেক কিছু বাকি। লিভারপুলের হয়ে সম্ভাব্য সেরা অর্জন দিয়ে এই অভিযান শেষ করতে সালাহ এখন পুরোপুরি মাঠের খেলায় মনোযোগী। তাই তাঁর অনন্য কীর্তি ও অর্জনগুলো উদ্যাপনের সঠিক সময় আসবে বছরের শেষ দিকে, যখন তিনি অ্যানফিল্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানাবেন।’
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন লিভারপুল এখন পয়েন্ট তালিকার পাঁচে। হাতে আছে আর মাত্র সাতটি ম্যাচ। চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান শিরোপাধারী পিএসজি। এ ছাড়া আগামী ৪ এপ্রিল এফএ কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটির মুখোমুখি হবে লিভারপুল।
সালাহর বিদায় নিয়ে তাঁর ক্লাব সতীর্থ অ্যান্ডি রবার্টসন এক আবেগঘন বার্তায় বলেন, ক্লাবের ইতিহাসের ‘সেরা খেলোয়াড়’ হিসেবেই সালাহর বিদায় হওয়া উচিত। ইনস্টাগ্রামে এই স্কটিশ ডিফেন্ডার লেখেন, ‘অ্যানফিল্ডে সালাহর অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ারের সাক্ষী হতে পারা এবং তাঁর সঙ্গী হিসেবে খেলতে পারাটা ছিল পরম আনন্দের।’