আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে কতটা প্রস্তুত

ছেলেদের ফুটবলে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাএএফপি

১৭ জুন ২০২৬।
যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশন।

মাত্র ছয় মাসের মতো বাকি। এই আর্জেন্টিনাকে আবারও শিরোপা জেতা দলের মতোই দেখাচ্ছে। ২০২২-এ কাতারজয়ী সেই ক্ষুধার্ত দলটাই এবার আমেরিকা জয়ের অপেক্ষায়। বিশ্বকাপের পর ২০২৪ সালে টানা দ্বিতীয়বার কোপা আমেরিকা জয় তাদের আত্মবিশ্বাস নিয়ে গেছে হিমালয়-উচ্চতায়।

বিশ্বকাপের আগের বছর কেমন খেলেছে আর্জেন্টিনা

গত বছর ৯টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে হেরেছে আর্জেন্টিনা—ইকুয়েডরের বিপক্ষে কিটোতে। তবে ১–০ ব্যবধানের সেই হারেও খারাপ খেলেননি লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। আর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় থাকলে এমনিতেই সেই দলটা সবার ‘টার্গেট’ হয়ে যায়। সবারই লক্ষ্য থাকে সেই মুকুট কেড়ে নেওয়ার। আর্জেন্টিনা অবশ্য সবার কাছে এই ‘ভিলেন’ হয়ে যাওয়াটা বেশ ভালোই উপভোগ করছে। কিংবা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন যেকোনো দলই হয়তো পরের চারটা বছর এভাবেই কাটায়।

মেসিকে ছাড়াই আর্জেন্টিনা বাছাইপর্বে ৪-১ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিলকে।
এএফপি

গত বছরের মার্চে বাছাইপর্বে লিওনেল মেসিকে ছাড়াই আর্জেন্টিনা ৪-১ গোলে ব্রাজিলকে ধসিয়ে দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছিল। সেই জয়ের পর থেকে আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস পৌঁছে গেছে অন্য উচ্চতায়।

আরও পড়ুন

২০২৫ সালে কোনো শিরোপার লড়াই ছিল না ঠিকই, তবে বাছাইপর্বে ব্রাজিল, উরুগুয়ে কিংবা কলম্বিয়ার মতো কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করে আর্জেন্টিনা নিজেদের ঝালিয়ে নিয়েছে। শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়েই তাই বিশ্বকাপের বছরটাকে স্বাগত জানাচ্ছে আর্জেন্টিনা।

মেসির শেষ ম্যাজিক কি দেখা যাবে

মেসিকে ছাড়াই যে আর্জেন্টিনা টপ গিয়ারে চলতে পারে, তার প্রমাণ তো ব্রাজিল ও চিলির বিপক্ষে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের দুটি ম্যাচেই দেখা গেছে। গত বছরের মার্চে ওই দুই ম্যাচের সময় মেসি ছিলেন চোটে। আতলেটিকো মাদ্রিদের থিয়াগো আলমাদা আক্রমণভাগের অভাব পূরণ করেছেন দারুণ খেলে। এমনকি সর্বশেষ কোপা আমেরিকার ফাইনালেও মেসি যখন চোট নিয়ে মাঠ ছাড়লেন, নিকোলাস গঞ্জালেস ও লো সেলসোরা ম্যাচটা বের করে এনেছিলেন। তবে মেসি তো মেসিই। তাঁর বিকল্প পাওয়া সহজ নয়।

থিয়াগো আলমাদা দারুণ খেলছেন আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগে
এএফএ এক্স

বিশ্বকাপ চলাকালে মেসির বয়স হবে ৩৯। তিনি জানেন, এই দলটা এখন নিরাপদ হাতেই আছে। আলমাদা, নিকো পাজ কিংবা ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোরা ১০ নম্বর জার্সির ভার বইতে প্রস্তুত। তবু মেসির উপস্থিতি মানেই তো অন্য কিছু। এটা বোধ হয় আর্জেন্টাইন অধিনায়ক নিজেও জানেন।

আমি বিশ্বকাপে থাকতে চাই। মাঠে না থাকলেও অন্তত গ্যালারিতে তো থাকবই। বিশ্বকাপ আমার কাছে সব সময়ই অন্য রকম আবেগের।
মেসি


গত বছরই ইএসপিএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বকাপে থাকতে চাই। মাঠে না থাকলেও অন্তত গ্যালারিতে তো থাকবই। বিশ্বকাপ আমার কাছে সব সময়ই অন্য রকম আবেগের।’
মেসি আবার এ-ও চান না যে তিনি দলের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ান। এমএলএসে টানা দুবার এমভিপি (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়) হওয়া সত্ত্বেও তিনি জানেন, সর্বোচ্চ স্তরের ফুটবল থেকে বিদায়ের সময় প্রায় ঘনিয়ে আসছে। শেষবেলায় এসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি নিশ্চয়ই আরও ভাববেন।

আর্জেন্টিনা কি টানা দ্বিতীয়বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারে

সহজ উত্তর—হ্যাঁ। কিন্তু ইতিহাস তাদের পক্ষে নয়। শুধু ইতালি (১৯৩৪ ও ১৯৩৮) আর ব্রাজিল (১৯৫৮ ও ১৯৬২) টানা দুটি বিশ্বকাপ জিতেছে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয়ের পর ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনা খুব কাছে (রানার্সআপ) গিয়ে হতাশ হয়েছে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জিতে ১৯৯৮ এর ফাইনালে গিয়ে হারতে হয়েছে ব্রাজিলকেও। ২০১৮ বিশ্বকাপ জেতা ফ্রান্সের ২০২২ সালে হৃদয় ভেঙেছে পেনাল্টি শুটআউটে। ইতিহাস ফিরিয়ে আনা তাই সহজ হবে না আর্জেন্টিনার জন্য।

আর্জেন্টিনা জাতীয় দল
এএফপি

৪৮ দলের ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার গ্রুপটা মোটামুটি সহজই বলা যায়। প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। আলজেরিয়া প্রথম ম্যাচে একটু ভোগাতে পারে, তবে ২০২২ সালে সৌদি আরবের কাছে হার থেকে শিক্ষা নিয়ে নিশ্চয়ই এবার সতর্ক থাকবেন স্কালোনির শিষ্যরা। নকআউট পর্বে উরুগুয়ে বা স্পেনের মতো দলের সামনে পড়ার সম্ভাবনা থাকলেও আর্জেন্টিনা এখন যেকোনো চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত।

আরও পড়ুন
সতীর্থদের নিয়ে সর্বশেষ লা ফিনালিসিমার ট্রফি হাতে মেসি।
রয়টার্স

ফিনালিসিমায় হবে মহড়া

আর্জেন্টিনার জন্য ভাবনার জায়গা হচ্ছে বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পুয়ের্তো রিকো বা অ্যাঙ্গোলার মতো দলের বিপক্ষে ম্যাচগুলো খুব একটা কাজে দেয়নি। তাই আগামী মার্চে স্পেনের বিপক্ষে ‘ফিনালিসিমা’ হবে আর্জেন্টিনার বড় পরীক্ষা। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ তো বলেই দিয়েছেন, ফিনালিসিমা হতে পারে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের একটা আগাম মহড়া!
তাঁর মতো কেউ কেউ মনে করেন, এই ফিনালিসিমা ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের ট্রেলার হতে পারে—আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন।
সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে হলে আর্জেন্টিনাকে আবারও প্রমাণ করতে হবে, এই প্রজন্মটা সত্যিই দেশের ইতিহাসের সেরা দল। এমনকি মেসিকে ছাড়াও!

আরও পড়ুন