সংবাদ সম্মেলনে মেয়র আনিসুল হক

আপনার ঘরে গিয়ে আমি মশারি খাটাতে পারব না

গতকাল সংবাদ সম্মেলনের এক ফাঁকে আনিসুল হক
গতকাল সংবাদ সম্মেলনের এক ফাঁকে আনিসুল হক

‘আপনার ঘরের ভেতরে যেয়ে আমি মশারি খাটাতে পারব না। আপনার ছাদের ওপরের চৌবাচ্চায় আমি ওষুধ লাগাতে পারব না। আপনার ঘরের ভেতরে যে সামান্য স্বচ্ছ পানিতে মশা জন্মাচ্ছে, সেটি আমি মারতে পারব না।’

গতকাল শুক্রবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মেয়র আনিসুল হক এসব কথা বলেন। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ তথা চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে ডিএনসিসির নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে অবহিত করতে গুলশানে ডিএনসিসির কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া আনিসুল হকের এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে এই বক্তব্যকে করদাতা নাগরিকদের প্রতি জনপ্রতিনিধির তাচ্ছিল্য ও অবহেলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অনেকে একে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বলে উল্লেখ করেছেন।

গতকালের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত দুজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, চিকুনগুনিয়া মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে মেয়র আনিসুল হক বলেন, চিকুনগুনিয়া মহামারি হোক আর যা-ই হোক, এ জন্য কোনোভাবেই সিটি করপোরেশন দায়ী নয়। চিকুনগুনিয়ার প্রধান কারণ ঘরের ভেতরে জন্ম নেওয়া মশা। সে পর্যন্ত পৌঁছানো সিটি করপোরেশনের পক্ষে সম্ভব নয়।

 সংবাদ সম্মেলনে মেয়রকে প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি বলছেন যে নির্মাণাধীন ভবনের চৌবাচ্চার পানিতে এডিস মশা জন্ম নিচ্ছে। তাহলে ওগুলো মারছেন না কেন?’ জবাবে মেয়র বলেন, ‘মারছি তো। কিন্তু আপনার বাসার একটা মশা যে ২৫ জনকে এফেক্টেড করছে না, তার সার্টিফিকেট কে দেবে?’

মেয়র বলেন, ‘আপনার চৌবাচ্চায় আমি ওষুধ দিতে পারব না। আপনার ঘরের ভেতর সামান্য স্বচ্ছ পানিতে যে মশা জন্মাচ্ছে, সেটা আমি মারতে পারব না।’ চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে নাগরিকদের সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন তিনি।

চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি দুঃখ ও সমবেদনা জানিয়ে মেয়র তাঁর লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করেন, এ বছর চিকুনগুনিয়া নিয়ে আগাম কোনো পূর্বাভাস পাওয়া যায়নি। পূর্বাভাস থাকলে এই রোগ প্রতিরোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হতো।

এ সময় সংবাদকর্মীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত বছরের ডিসেম্বর মাসেই আইইডিসিআর ৩০ জন চিকুনগুনিয়ার রোগীকে শনাক্ত করেছিল। বিশেষজ্ঞরা তখন বলেছিলেন, এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। তখন কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?

জবাবে মেয়র বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আজই প্রথম শুনলাম।’

একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, মেয়রের পরিবারের কেউ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন কি না? মেয়র ওই সাংবাদিককে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনার পরিবারের কেউ আক্রান্ত হয়েছে?’ জবাবে সাংবাদিক হ্যাঁ বললে মেয়র বলেন, ‘আমি বোধ হয় সেদিক থেকে একটু সৌভাগ্যবান। আমার পরিবারের কেউ আক্রান্ত হয়নি।’

সংবাদ সম্মেলনে মেয়র ও ডিএনসিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক একজন পরিচালক ও মহামারি বিশেষজ্ঞ এবং দুজন কীটতত্ত্ববিদ উপস্থিত ছিলেন।

গত বছরের ডিসেম্বর থেকেই ঢাকায় এই ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর থেকে প্রতি মাসেই আইইডিসিআরে এই রোগ শনাক্ত করতে নমুনা পরীক্ষা চলছে। এ বছরের এপ্রিল থেকেই রাজধানীর মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগীর ভিড় বাড়তে থাকে। ভিড় বাড়তে থাকে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও। চিকুনগুনিয়া যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এটা মহামারি কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রী এটাকে মহামারি বলতে রাজি নন। চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার জন্য স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের ‘ব্যর্থতাকে’ দায়ী করেছেন।

গতকালের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বিশেষজ্ঞদের কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, চিকুনগুনিয়া মহামারি কি না? জবাবে মহামারি বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহ্‌মুদুর রহমান বলেন, চিকুনগুনিয়া যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যে পরিমাণ মানুষ এতে আক্রান্ত হচ্ছে, তাতে এটা অবশ্যই মহামারি।

কীটতত্ত্ববিদ তৌহিদ উদ্দীন আহমেদ বলেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট এলাকায় হঠাৎ করে কোনো রোগে মানুষ বেশি আক্রান্ত হলে তা মহামারি। সেই হিসাবে এটা মহামারি। উপস্থিত আরেক বিশেষজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদ মুনজুর এ চৌধুরী এ বিষয়ে কোনো মতামত দিতে চাননি।

বিশেষজ্ঞদের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মেয়র আনিসুল হক বলেন, মহামারি হোক আর যা-ই হোক, এ জন্য কোনোভাবেই সিটি করপোরেশন দায়ী নয়। তিনি বলেন, যে এডিস মশার মাধ্যমে চিকুনগুনিয়া ছড়ায় তা ড্রেন, ময়লা-আবর্জনা কিংবা জলাশয়ে বংশবিস্তার করে না। এডিস মশা মূলত বাসাবাড়ির ফ্রিজ, এসির ট্রে, ফুলের টব ও ছাদে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। এ ছাড়া পড়ে থাকা ভাঙা হাঁড়ি, ক্যান, পরিত্যক্ত টায়ার ও বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবনে ব্যবহৃত চৌবাচ্চা এই মশার বংশবিস্তারের অন্যতম কারণ।

এদিকে চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে মশা নিধনের পাশাপাশি উপস্থিত বিশেষজ্ঞরাও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। এই ভাইরাস যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেদিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক মাহ্‌মুদুর রহমান আক্রান্ত রোগীকে সব সময় মশারির ভেতর আলাদা করে রাখার পরামর্শ দেন।