১৩ মে ২০১৭, প্রথম আলোর আয়োজনে ও বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেডের সহযোগিতায় ‘আবাসন খাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হলো

আলোচনায় সুপারিশ
* ক্রেতাকে জমি ও ফ্ল্যাটের মালিকানাবিষয়ক দলিলপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনে আইনজীবীর সহায়তা নিতে হবে
* আবাসন প্রতিষ্ঠান যে প্রকল্পের জন্য ঋণ গ্রহণ করবে, সে প্রকল্পেই ঋণের অর্থ ব্যয় করতে হবে
* কী মানের িনর্মাণসামগ্রী দিয়ে ভবন তৈরি হচ্ছে, ফ্ল্যাট ক্রেতাকে সেটা ভালোভাবে যাচাই–বাছাই করে দেখতে হবে
* পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করে উঁচু ভবন করা বেশি জরুরি
* আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢাকা শহরের বাইরেও আবাসন তৈরির চিন্তা করতে হবে
* সরকারকে ফ্ল্যাটের নিবন্ধন খরচ কমাতে হবে
* শিল্পাঞ্চলের মতো পর্যাপ্ত সুবিধা দিয়ে আবাসিক অঞ্চল তৈরি করতে হবে
আলোচনা
আব্দুল কাইয়ুম: আমাদের দেশে আবাসন খাতে অনেক অগ্রগতি আছে, আবার সমস্যাও আছে। যে সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তার সুফল পেতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত, মানসম্মত ও জনসংখ্যার কথা বিবেচনায় রেখে অনুকূল স্থাপনা। ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা যে ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন, তার প্রতিকারও দরকার।
সার্বিকভাবে কী কী সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন। আজকের আলোচনায় এসব আসবে। এখন এ বিষয়ে আলোচনা ও উপস্থাপনা করবেন এফ আর খান।
এফ আর খান: আবাসন খাতে আমার ৩৫ বছর কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এ খাতের কোন কোন জায়গায় ঝুঁকি হতে পারে, সেটা সংক্ষেপে তুলে ধরছি। আমাদের আবাসনগুলো সাধারণত যৌথ উদ্যোগে করা হয়, সে ক্ষেত্রে জমির মালিক জমির দামের সমপরিমাণ মূল্যের ফ্ল্যাট বা নগদ টাকা পেয়ে থাকেন।
আবাসনের জন্য সাধারণত ৫, ১০ থেকে শুরু করে ৪০ কাঠা পর্যন্ত জমি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অধিকাংশ সময় ফ্ল্যাটের ক্রেতা জমির মালিকানাবিষয়ক দলিলপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করে নেন না। এতে পরে সমস্যা হয়।
অনেক সময় আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো লাভের হিসাব খুব সরলভাবে করে ফেলে। কিছু ব্যয়ের খাত বাদ পড়ে গেলে পরবর্তী সময়ে প্রকল্পে ক্ষতি হয়ে যায়। এ ক্ষতি প্রায় ক্ষেত্রেই ক্রেতাদের থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। সবকিছুর খাত দেখতে গেলে আবার জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। সে জন্য একটি পেশাগত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এরপর আবাসন প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতার মধ্যে চুক্তি হয় এবং রাজউকের নিয়ম মেনে অন্যান্য কাজ চলতে থাকে। রাজউকের নিয়ম মানা হলো কি না, সেটা দেখা উচিত। নির্মাণ প্রক্রিয়ার মান সংরক্ষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। আবার স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে যেন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের ক্ষতি না হয়, সে ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।
স্থাপত্য নকশা ছাড়াও অ্যাপার্টমেন্টের নকশা—বৈদ্যুতিক িডজাইন, নল ব্যবস্থাপনা এবং কাঠামো (স্ট্রাকচার) পেশাদার ব্যক্তির দ্বারা দেখিয়ে নিতে হবে।
নিবন্ধন খরচ বেশি হওয়ায় অনেকেই ফ্ল্যাট ক্রয় করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন না। সরকারের ফ্ল্যাটের নিবন্ধন খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তানিয়া আমীর: আইনের দিকটা বলছি। বাংলাদেশে জমি কেনার প্রক্রিয়া এখনো উন্নত হয়নি। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলের জরিপের সঙ্গে আমাদের মহানগর জরিপ মেলে না। যৌথ উদ্যোগে জমি কেনার ক্ষেত্রে সাধারণত সব খুঁটিনাটি দেখা হয় না।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি-বিষয়ক নতুন যে আইন হয়েছে, সেটাও একপক্ষীয়। রাজউকের কাছ থেকে অনুমোদন আনার দায়িত্ব আবাসন প্রতিষ্ঠানের হলেও অনেক সময় সেটা আনা হয় না। আবার ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও সতর্ক না থাকলে জমির মালিকের ওপর দায় পড়ে।
যে প্রকল্পের জন্য ঋণ নেওয়া হয়, সেটা যে সেই প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা দেখি না। ফলে এক প্রকল্পের টাকা অন্য প্রকল্পে ব্যয় হয়। এটা আর আলাদা করা সম্ভব হয় না।
এ জন্য যৌথ স্বার্থে কাজ করতে হবে। রাজউকের নিয়মকানুন এবং ব্যাংকঋণের খুঁটিনাটিও ভালোভাবে দেখা উচিত।
ফ্ল্যাট কিনে ফেলার পরও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কিছু আইনি জটিলতা হয়। এসব সমস্যার সমাধানের জন্য স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান দরকার। এ প্রতিষ্ঠান নির্মাণ প্রক্রিয়াগুলোর পর্যবেক্ষণ ও সমাধান নিশ্চিত করবে। এভাবে চিন্তা দরকার, যেন প্রক্রিয়াগুলোতে সব পক্ষ নিজের স্বার্থেই নিয়ম মেনে চলবে।
মো. শামীম জেড বসুনিয়া: ভবনের কাঠামোগত নকশার একটি গুরুত্ব আছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ভবন নির্মাণবিধি-২০০৮ অনুসারে এর জন্য স্থপতি দায়ী থাকবেন। পানি সরবরাহ, স্যানিটারি ও ইলেকট্রিক্যাল সার্ভিস, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ (যদি থাকে) ইত্যাদি নকশায় সঠিকভাবে থাকা প্রয়োজন। আপনি যে চেয়ারে বসে আছেন, সেটা দুর্বল হলে ভেঙে পড়তে পারে। এ জন্য বিএনবিসিতে (বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড) অনেক আইন আছে। কিন্তু পড়ে দেখা হয় না বললেই চলে।
আইইবির (ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ) সদস্য আছেন প্রায় এক লাখ। কিন্তু ডিগ্রি থাকলেও তঁাদের সবাই দক্ষ নন। নকশা অনুমোদনের জন্য সরকারের দুটি কমিটি আছে। ইদানীং আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য এ বিষয়ে সতর্ক থাকে।
বিএনবিসিতে অনেকগুলো ভাগ আছে। বাংলাদেশকে ভূমিকম্পের জন্য চারটি ভাগে বিভক্ত করা আছে। এ জন্য বলা আছে, কোনো কলামের আকার ১২ ইঞ্চির কম হতে পারবে না। কিন্তু নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে না।
রিহ্যাবেই বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ আবাসন প্রতিষ্ঠান আছে। বাইরেও আছে। আর নির্মাণসামগ্রী সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।
এ টি এম নুরুল আমিন: আমাদের আবাসন খাত বড় একটি সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশে এ খাত যতটা স্বীকৃতি পাওয়ার কথা, ততটা পায়নি। আশির দশকের পর ঢাকার আবাসনে বড় পরিবর্তন এসেছিল। পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করে লম্বা ভবনের চেয়ে উঁচু ভবন করা বেশি জরুরি।
আমাদের দেশের মানুষের সংখ্যা ও জমির অনুপাত কিন্তু অনুকূল নয়। প্রতিটি মানুষই আবাসন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে চায়। এ জন্য অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহায়তার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা না গেলে এটি সার্বিকভাবে লাভজনক খাত হয়ে উঠবে না। হাউজিং খাতের ভাবমূর্তি ভালো-খারাপ দুই রকমই আছে। জমি দখল, নির্মাণক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, শ্রমিকদের সঙ্গে অন্যায় ইত্যাদি সমস্যা দূর করার জন্য রিহ্যাব কাজ করতে পারে।
ভালো কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে গিয়ে খরচ বেড়ে গেলেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আর খাতটিকে শক্তিশালী করার জন্য কম আয়ের মানুষকেও এখানে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। যেমন মালয়েশিয়ায় ডেভেলপারদের ৩০ ভাগ হাউজিং কম আয়ের মানুষের জন্য করার বিধান আছে।
আর আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢাকা শহরের বাইরেও আবাসন তৈরির চিন্তা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকেও নীতিমালা করতে হবে।
নাসিমুল বাতেন: আবাসনের জন্য ঋণ দিতে কোনো ঝুঁকি নেই মনে হলেও আসলে কিছু ঝুঁকি আছে। ১০ বছর আগে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট হয়েছিল, সেটা কিন্তু ছিল পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তিদের বেশি সুদে ঋণ প্রদানের কারণে। ফলে ব্যাংক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দারুণ হুমকির মুখে পড়েছিল।
এ জন্য ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকের নিজস্ব বিনিয়োগও থাকা প্রয়োজন। ২০০৫ সালে বনানীতে ফ্ল্যাটের দাম ছিল প্রতি বর্গফুটে ২ হাজার টাকা। ২০১২ সালে সেটা হয়ে যায় ১৪ হাজার টাকা। সাত গুণ হয়ে গেল। উত্তরায় ছিল ১ হাজার ৫০০ টাকা। সেটা হলো ৮ হাজার টাকা। সব দিকেই এমন হচ্ছে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের আয় কি সে হারে বাড়ে? সাত বছরে জমির দাম বেড়েছে ৭০০ শতাংশ। ব্যাংকঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের নীতিমালা সহজ হওয়া প্রয়োজন।
মো. হোসাইন: ঢাকা শহরে বর্তমানে ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ বাস করে। ক্রমেই এ শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার বাইরেই ৩০-৪০ লাখ টাকায় কিস্তিতে ফ্ল্যাট দেওয়া যেতে পারে।
কিছুদিন আগে চীনে গিয়েছিলাম। বেইজিং, সাংহাই সব জায়গায় মূল শহরের বাইরেই ছিলাম। সেখান থেকে শহরে আসতে ৪০ মিনিটের বেশি লাগেনি। অথচ আমরা উত্তরা থেকে মতিঝিল আসি আড়াই ঘণ্টায়। পরিবহনব্যবস্থা ভালো করলে কেন আমরা ঢাকায় থাকব?
এ কে এম জিয়াউল আমীন: ২০০৮ সালে আমি ফ্ল্যাট কেনার কথা ভাবি। কিন্তু আমার সক্ষমতা ছিল না। ঋণ নিতে গিয়ে দেখলাম যে কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে, সেটাও আমার আয়ের প্রায় সমান। অনেক প্রতিষ্ঠানেই গেলাম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কেউ সহায়তা করছিল না।
২০১৫ সালে ব্যবস্থা হলো। ক্রয় ও জমিসংক্রান্ত এ দুটি দলিলের ব্যাপারে জানতাম না। তবে আমি চুক্তির পুরোটা পড়েছিলাম। কিছু পরিবর্তনের কথা বলেছিলাম। ডিজাইন দেখেছিলাম। নির্মাণকৌশল নিয়ে আমার ধারণা ছিল না। কিন্তু কনস্ট্রাকশন-প্রক্রিয়া ভালো ছিল। ঝুঁকির মধ্যে মূলত অর্থনৈতিক দিকটা বেশি। কোনো অার্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজ শর্তে ঋণ পেলে সুবিধা হয়।
মো. রেজাউল করিম
ফ্ল্যাট ক্রয়ের চুক্তির অনেক ধারাই সাধারণ মানুষের পক্ষে বুঝতে পারা কঠিন। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় ভালো করে ব্যাখ্যা করতে চায় না। প্রথম লক্ষ্যই থাকে কীভাবে ক্রেতাকে নিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু চুক্তির ধারাগুলো ব্যাখ্যা করা আমার কাছে জরুরি মনে হয়। একটি শব্দের ব্যাখ্যাও নানান রকম হতে পারে।
ফ্ল্যাট ক্রয়ের চুক্তিগুলো বাংলায়ও রাখা প্রয়োজন। কারণ, অনেক গ্রাহক ইংরেজি ভালো বোঝেন না। আর কঠিন ধারাগুলো ভালোভাবে বলে দেওয়া উচিত। প্রাথমিকভাবে দেখানো ডিজাইনের সঙ্গে পরে মিল থাকে না অনেক সময়। এটারও সমাধান হওয়া উচিত।
মো. শামসুল আমিন
ফ্ল্যাটের মালিকানা প্রক্রিয়ায় চুক্তিপত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার পূর্বেই ক্রেতাকে চুক্তিপত্র ভালোভাবে পড়ে নিতে হবে।
কত তারিখে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা হবে, সেটা বিশেষ করে দেখে নিতে হবে। হস্তান্তর করতে দেরি হলে ক্ষতিপূরণ কী হবে, সেটাও ঠিক করতে হবে। পরে যেন ফ্ল্যাটের আকার কম না হয়ে যায়, কিংবা রাজউকের নিয়মবহির্ভূতভাবে ফ্ল্যাটের আকার বাড়ানো না হয় এবং এর জন্য অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রাজউকের অনুমোদন নম্বর, অনুমোদনের তারিখ ইত্যাদি যেন চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকে তা দেখে নিতে হবে।
কিস্তি পরিশোধের তারিখ, ফ্ল্যাটের এলাকা দেখা নিতে হবে। নিয়ম আছে, কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে কর্তৃপক্ষ ৬০ দিনের নোটিশে ফ্ল্যাট বরাদ্দ বাতিল করে দিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে পরিশোধিত টাকার ওপর ১০ শতাংশ কর্তন করার বিধান রয়েছে। তাই ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার পূর্বেই আর্থিক পরিকল্পনা করে নেওয়া ভালো।
কখনো ফ্ল্যাট বা প্রকল্পও পরিবর্তন করে দেওয়া হয়, কখনো এমন হয় যে ফ্ল্যাট হস্তান্তর দেওয়াই হয় না। কখনো নির্মাণকাজ দেরিতে শুরু হয়, কখনো ক্রেতাকে ফ্ল্যাট বা প্রকল্পের অগ্রগতি জানানো হয় না। কখনো ক্রেতা ঋণ সহায়তা পান না। এ বিষয়গুলো নিয়ে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার আগেই িনর্মাণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে নিতে হবে।
তৌফিক এম সেরাজ
আমরা বাংলাদেশের নগরায়ণ নীতিমালা এখনো ঠিক করতে পারিনি। তবে গৃহায়ণ, আবাসন নীতিমালা আছে। আমাদের অবশ্যই ঢাকা থেকে চিন্তা সরিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।
কিছু প্রতিষ্ঠান অবশ্য বাইরে যাচ্ছে। তবে সরকার না চাইলে ব্যক্তি খাত এটা পারবে না। আবাসন খাতে ক্রেতা কিন্তু ঝুঁকিতে পড়েন না। বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবও বাংলাদেশে বেশি পড়েনি এমনকি ২০০৭-৮ সালে এশীয় সংকটের সময়ও বাংলাদেশের সমস্যা হয়নি।
তবে ২০১২ সালের পর আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। কারণ হলো একটি অসম প্রতিযোগিতা। ২০০৭ থেকে ২০১২-এর মধ্যে অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠান ঢাকা শহরে কাজ শুরু করেছে। অনেকেই কাজ করতে পারেনি। তারা ঝুঁকিতে পড়ে গেছে।
এখন অবস্থা কিছুটা ভালো হয়েছে। সুদের হার কমে যাওয়া তার একটি কারণ। ক্রেতারা সচেতন নন—এ কথাটি এখন আর ঠিক নয়। অনেক ক্রেতাই এখন আইনজীবী সঙ্গে রাখেন।
তবে আইনজীবী তো আর কাঠামোগত ডিজাইন বুঝবেন না। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর মান মূল্যায়নের জন্য একটি কমিটি দরকার। এ কমিটি মান মূল্যায়ন করবে এবং এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন দেবে।
রাজউককে শক্তিশালী করতে হবে। নিজেদের লোক না থাকলে কোনো তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিয়ে হলেও পেশাদারি নিশ্চিত করা উচিত।
তানভিরুল হক প্রবাল
২০০৮ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ধরন পরিবর্তন হয়েছে। এর মেয়াদ এবং বাস্তবায়ন এখন সহজ হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসন প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের নিবন্ধন হলেও নামজারি হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সরকারকে নজর দিতে হবে। তবে রাজউক আমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।
রাজউক যেখানে একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকায়, সেখানে আমাদের ফ্ল্যাটের দাম সাত হাজার হবেই। কারণ, রাজউকের জমির খরচ আমাদের মতো নয়। সরকার এখন বিভিন্ন জায়গায় অর্থনৈতিক অঞ্চল করছে। রাস্তা, বিদ্যুৎ–সংযোগ দিয়ে শিল্পকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। একই কাজ কিন্তু আবাসন খাতেও হতে পারে।
শিল্প এলাকার পাশাপাশি আবাসিক এলাকার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাহলে ফ্ল্যাটের দাম কমে আসবে। ক্রেতার ঝুঁকিও কমে আসবে।
কাজী গোলাম নাসির
আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধন্যবাদ দিতে হবে। কারণ, তারা ভবনে অনেক আধুনিকতা এনেছে। একজন ক্রেতা হিসেবে দেখতে হবে নকশার অনুমোদন আছে কি না।
নকশার অনুমোদনের বিষয়টি কর্তৃপক্ষ তাদের ওয়েবসাইটে দিয়ে দিতে পারে। কাজটা খুব সহজ। তাহলে যার প্রয়োজন সে ওয়েবসাইট থেকে দেখে নিতে পারবে। আবার প্রতিবেশীরাও দেখবে তার আশপাশে অনুমোদিত স্থাপনা হচ্ছে।
আমি টাকা দিচ্ছি, সেবা নিচ্ছি। অ্যাপার্টমেন্টের নকশা পেশাদার ব্যক্তিদের দিয়ে যাচাই করে নেওয়া উচিত। আমরা কিন্তু শুধু স্থাপত্যের অঙ্কন কোনো আত্মীয়কে দিয়ে দেখিয়ে নিই। অথবা কারও কাছে নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরের নকশা পরিবর্তন করে দিতে বলি।
এটা ছাড়াও মৌলিক তিনটি জায়গা আছে। বৈদ্যুতিক ডিজাইন, নল ব্যবস্থাপনা এবং কাঠামো (স্ট্রাকচার)। এখানে একটি বিশ্বাসের জায়গা নিয়ে আসতে হবে। ওষুধ খাওয়ার সময় কিন্তু আমরা দেখি না, কীভাবে এটা বানানো হচ্ছে। ভালো কোম্পানির ওষুধ হলে চোখ বন্ধ করে খেয়ে ফেলি। একইভাবে আবাসন প্রতিষ্ঠনগুলোর বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করতে হবে। আস্থা তৈরি করতে হবে যে কোনো সময় যাচাই করলে যেমন বলা হয়েছে তেমনই দেখা যাবে।
সরকার বলে দিয়েছে, অ্যাপার্টমেন্ট ক্রেতাদের স্থাপত্য, নল ব্যবস্থাপনা, কাঠামো ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনা দেখাতে হবে। আর ক্রেতা হিসেবে এটা পাওয়ার অধিকার তার আছে।
কেনার সময় একজন পেশাদার আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ, আইনের অনেকগুলো কঠিন বিষয় থাকে, যেগুলো বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। আইনজীবীরা ক্রেতার পক্ষ হয়ে সব দেখবেন।
নির্মাণের দায়, স্থপতি, কাঠামোবিষয়ক প্রকৌশলী ও আবাসন প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আগে শুধু মাটির ওপরের অবস্থা দেখে মাস্টারপ্ল্যান হতো। তবে ইদানীং মাটির নিচেও দেখা হচ্ছে। সরকার সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারি চাকরিজীবীরা চাকরির শুরু থেকে চাইলে ফ্ল্যাট কিনতে পারেন।
এ এস জহির মাহাম্মদ
১৯৯৯ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আইনের একটি ধারা নিয়ে আসে, যেখানে বলা আছে, বিনিয়োগ করা হলে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করা হবে না। পরে ২০০৭ সালে এ আইন বাতিল হয়ে গেল। ২০০৯-২০১০ সালে এসে আবার সুযোগ দেওয়া হলো দুই বছরের জন্য। তবে নিয়মটা একটু জটিল রয়ে গেল।
অবৈধ না হলেও বিভিন্ন কারণে টাকা অপ্রদর্শিত থেকে যেতে পারে। বিদেশ থেকে প্রেরিত টাকাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সব কাগজপত্র রাখা সম্ভব হয় না। ফলে আইনের একটি উপধারার কারণে মানুষ বিনিয়োগ করতে সাহস পেল না। এ কারণেই ২০১২-২০১৩ সালের পরে এ খাতে মন্দা এসেছিল।
পূর্তমন্ত্রী যেমনটা বলেছেন, সরকার ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকার তহবিল করে দিতে পারে। এখন অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি বাড়াতে হলে নিবন্ধন খরচ কমাতে হবে। ২৭০টি শিল্প ও ২৫ লাখ লোক এর সঙ্গে জড়িত।
ইমতিয়াজ আহমেদ খান
আবাসন খাতে ক্রেতা ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের যেমন ঝুঁকি থাকে, তেমনি জমির মালিকেরও ঝুঁকি থাকে। জমির মালিকের ঝুঁকির বিষয়টি তেমন আলোচনায় আসে না।
জমির মালিক নিজে ভবন নির্মাণ করতে পারেন আবার কোনো আবাসন প্রতিষ্ঠানকে দিতে পারেন। আবাসন কোম্পানি ভালো না হলে বছরের পর বছর নির্মাণকাজ ঝুলে থাকতে পারে। জমির মালিকের জন্য এটা একটা বিশাল ঝুঁকি। আবার নিজে করলেও কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে হয়। সময়মতো নির্মাণ করার একটা ঝুঁকি থাকে।
আবার ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ, নির্মাণের ক্ষেত্রে জমির মালিক কোনোভাবেই ঝুঁকি এড়াতে পারেন না।
গণপরিবহনের ব্যবস্থা এমন হবে যে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলো থেকে সহজেই অফিস করা যায়। নিয়ম হলো, নিম্ন আয়ের মানুষ থাকবেন কর্মস্থলে বা শহরের মধ্যে, ধনীরা থাকবেন দূরে। তাঁরা গাড়িতে সহজে শহরে কাজে আসবেন ও ফিরে যাবেন।
কিন্তু আমাদের দেশে সম্পূর্ণ বিপরীত। দরিদ্র মানুষ দূরে থেকে কাজে আসেন শহরে। ফলে শহরের প্রায় প্রতিটি রাস্তায় যেকোনো সময় জ্যাম তৈরি হয়। এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
মো. আহসানুল হক
আবাসন খাতে কেউ কেউ জেনেশুনেই ঝুঁকিতে পড়েন। আবার অনেকে অসতর্কতার শিকার হন।
আমরা জানি যে পঁাচ কাঠা একটি জমির ক্ষেত্রফল ৩ হাজার ৬০০ বর্গফুট। এখন ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ জানা থাকলে বোঝা যায়, সর্বোচ্চ কত বর্গফুট আবাসন প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওয়া যাবে।
তবে এখন ক্রেতারা সচেতন। তারা প্রায় সবকিছুই বুঝে নিচ্ছে। হিসাব-নিকাশ বেশি না বুঝলেও একটি অনুমান তো করা যায় যে পঁাচ কাঠা জমির ওপর অ্যাপার্টমেন্ট সর্বোচ্চ সাইজ কত হতে পারে।
ক্ষতির পরে ব্যবস্থা না নিয়ে আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একটি প্রকল্পে লিফট, জেনারেটর ইত্যাদির নিরাপত্তা খতিয়ে দেখা উচিত। আগে থেকে সতর্ক থাকলে পরে অসন্তুষ্টির কোনো কারণ ঘটার কথা নয়।
মো. শামীম জেড বসুনিয়া: আজকের এ আলোচনার ফলাফল কী হয়, সেটা দেখা প্রয়োজন। তবে আবাসনের ক্ষেত্রে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। একটা কথা কেউ কিন্তু বলেননি, সেটা হলো আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো চঁাদাবাজির মুখে পড়ে। সম্প্রতি চানখঁারপুলের বার্ন ইনস্টিটিউটে এটা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেটা আর্মিকে দিয়ে করানো হয়েছে।
আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনবিষয়ক বিভাগ থাকা প্রয়োজন। এ বিভাগ থেকে ক্রেতা সবকিছু সহজে বুঝে নিতে পারেন। ঢাকায় এখন লোক অনেক বেড়ে গেছে। বিকেন্দ্রীকরণ না হলে ঢাকা শিগগিরই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
আব্দুল কাইয়ুম: ঢাকা মহানগরসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চলের মানুষের আবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। সবাই নিজের একটি আবাসন প্রত্যাশা করেন। কিন্তু অনেকের এ খাতে বিনিয়োগের সামর্থ্য নেই। যঁাদের সামর্থ্য আছে, তঁাদের অনেকেই বিভিন্ন ঝুঁকির কারণে বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকেন।
একটি আধুনিক শহর গড়ে তোলার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবেশ ও অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করে আমাদের বহুতল ভবন নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আবাসন খাতের জন্য জরুরি হলো পরিকল্পিত ও মানসম্পন্ন িনর্মাণ। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেবে বলে আশা করি। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।
বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেডকে (বিটিআই) িবশেষভাবে ধন্যবাদ এ আয়োজনে সহায়তা করার জন্য।
যাঁরা অংশ নিলেন
মো. শামীম জেড বসুনিয়া : সাবেক অধ্যাপক, বুয়েট ও সাবেক সভাপতি, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ
এফ আর খান : ম্যানেজিং ডিরেক্টর,বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লি.
এ টি এম নুরুল আমিন : অধ্যাপক, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
তানিয়া আমীর : সিনিয়র অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ
তৌফিক এম সেরাজ : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, শেল্টেক্ ও সাবেক সভাপতি, রিহ্যাব
এ এস জহির মাহাম্মদ : সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড
কাজী গোলাম নাসির : সভাপতি, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট
নাসিমুল বাতেন : নির্বাহী সহসভাপতি, ডেলটা ব্র্যাক হাউজিং ফাইন্যান্স করপোরেশন লিমিটেড
ইমতিয়াজ আহমেদ খান : স্থপতি, পরামর্শক, আবাসন খাত
তানভিরুল হক প্রবাল : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, বিল্ডিং ফর ফিউচার লি. ও সাবেক সভাপতি, রিহ্যাব
মো. শামসুল আমিন : নির্বাহী পরিচালক, বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লি.
মো. আহসানুল হক : চিফ অপারেটিং অফিসার, বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লি.
মো. হোসাইন : ফ্ল্যাট ক্রেতা
এ কে এম জিয়াউল আমীন : ফ্ল্যাট ক্রেতা
মো. রেজাউল করিম : ফ্ল্যাট ক্রেতা
সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম : সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো