>এক বছরে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা ছুটি পান ১৫ দিন। মাসে ভাতা ১৫ হাজার টাকা
ইন্টার্ন (শিক্ষানবিশ) চিকিৎসকেরা সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার অন্যতম শক্তি হলেও তাঁদের সুযোগ-সুবিধা কম। প্রয়োজনের তুলনায় তাঁদের ভাতা ও ছুটিও যথেষ্ট নয়।
সদ্য এমবিবিএস পাস করা এসব চিকিৎসক হাসপাতালে যুক্ত থাকেন মূলত প্রশিক্ষণ নিতে। বাস্তবে তাঁরা পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টাই রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছেন। চিকিৎসাসেবায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধন পাওয়ার ক্ষেত্রে ইন্টার্নশিপ একটি পূর্বশর্ত। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার ইন্টার্ন চিকিৎসক সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেলে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান প্রথম আলোকে বলেন, ইন্টার্নদের কাজের চাপ বেশি। তাঁরা সরকারি চাকরি করেন না, অথচ তাঁরা সব দায়িত্ব নিয়ে সরকারি হাসপাতালে কাজ করেন। তাঁরা প্রশাসনের কাছ থেকে সহায়তা কম পান।
৯ ও ১০ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, সকাল আটটা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের (অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, রেজিস্ট্রার) সঙ্গে ইন্টার্নরা কাজ করেন। তাঁরাই ইন্টার্নদের কাজ তদারক করেন। মাঝেরাত নয়টায় ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পালাবদল হয়। এ ছাড়া ছুটির দিনে ২৪ ঘণ্টা তাঁরা দায়িত্বে থাকেন।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ওই হাসপাতালে গত বছরের জুন থেকে ইন্টার্নশিপ করছেন মেহেদী শাহরিয়ার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘টানা ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে কাজ করেছি। আমার মতো অনেকেই করেন। কিন্তু আমাদের যে কিছু সুবিধা-অসুবিধা আছে, সে কথা কেউ বলেন না, সে কথা কেউ শোনেন না।’ ১০ মার্চ বিকেলে হাসপাতালটির মেডিসিন ওয়ার্ডের ইউনিট-৫-এ মেহেদী শাহরিয়ারসহ ছয়জন ইন্টার্ন চিকিৎসকের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনো নির্দেশ পালনে ‘না’ বলেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ, বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজসহ প্রায় সব সরকারি মেডিকেলে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের এই পরিস্থিতি মোটামুটি একই রকম। রাজধানীর একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক বলেছেন, তাঁদেরও কাজের চাপ বেশি।
ইন্টার্ন চিকিৎসক বৃত্তান্ত
এমবিবিএস কোর্সের পাঠ্যসূচিতে বলা আছে, এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা এক বছরের জন্য হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেবেন। এর মধ্যে ১১ মাস তাঁরা হাসপাতালে কাজ করবেন। ১৫ দিন কাজ করবেন একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কর্মকর্তা ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই এক বছরে তাঁরা ছুটি পাবেন ১৫ দিন।
বিএমডিসির রেজিস্ট্রার জেড এম বাসুনিয়া প্রথম আলোকে বলেন, এমবিবিএস পাস করার পর শিক্ষার্থীদের এক বছরের জন্য সাময়িক সনদ দেওয়া হয়। সফলভাবে ইন্টার্নশিপ শেষ করলে সাময়িক সনদ ফেরত নিয়ে পেশা চর্চার স্থায়ী সনদ দেওয়া হয়।
বিএমডিসির কাগজপত্রে ইন্টার্নশিপের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণ শেষে এসব চিকিৎসক রোগীর সমস্যা সঠিকভাবে অনুধাবন করে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রোগীর ইতিহাস সঠিকভাবে নেওয়া ও সংরক্ষণ, আস্থার সঙ্গে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন করা, দক্ষতার সঙ্গে পরীক্ষাগারে কাজ করা, চিকিৎসার পরিকল্পনা ও তার চিকিৎসা দিতে পারবেন। তাঁরা রোগী ও তার আত্মীয় এবং সহচিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগের দক্ষতাও অর্জন করবেন। রোগী ও তার আত্মীয়ের সঙ্গে নৈতিক ও আইনগত বিষয় নিয়ে কার্যকর আলোচনা করায় সমর্থ হবেন।
১০ মার্চ সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অন্তত ১০টি ওয়ার্ডে অন্য চিকিৎসকদের পাশাপাশি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ইসমাইল খান বলেন, এক বছর বা ৫২ সপ্তাহকে মূলত মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি—এই তিনটি বিষয় ধরে সময় ভাগ করা হয়। একজন শিক্ষার্থী ঠিকমতো প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন কি না, তা লগ বইয়ে লেখেন সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষক।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে এখন ১৭২ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক (এমবিবিএস ১৩০ জন, বিডিএস ৪২ জন) আছেন। তাঁদের কাজের সমন্বয়ের দায়িত্বে আছেন মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র রায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা অন্তর্বিভাগ, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে কাজ করেন। নির্ধারিত সূচির (শিডিউল) অতিরিক্ত কাজ তাঁদের করতে হয়। টানা ২৪ ঘণ্টা কাজ করা সাধারণ ঘটনা। আমরাও করেছি। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নরাই চিকিৎসাসেবার প্রাণ। সেই তুলনায় তাঁরা সুযোগ-সুবিধা কম পান। তাঁদের নিরাপত্তা কম।’
চাপ বেশি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি তাসনিম মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে শত শত রোগী দেখতে হয়, রোগীর কথা শুনতে হয়, তাদের তথ্য লিখতে হয়, চিকিৎসা দিতে হয়। পরদিন সকালে আসবেন অধ্যাপক, তাঁর জন্য নোট তৈরি করে রাখতে হয়। কোনো কাজে না বলার সুযোগ নেই। অন্যদিকে ছুটিও কম।’ তিনি বলেন, মাস শেষে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মাত্র ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা বলেছেন, তাঁরাও ভুল করেন। তবে ভুলের পরিমাণ কমবে, যদি তাঁদের ওপর চাপ কমে। কয়েকটি ঘটনার পর তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অবশ্য সাধারণ রোগীদের নিয়ে সমস্যা হয় না। বিশেষ কিছু রোগী বা তাদের আত্মীয়, যেমন রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা আমলা ও সাংবাদিকেরা হাসপাতাল বা চিকিৎসকদের ওপর চাপ দেন, ঝামেলা করেন।
ইন্টার্ন চিকিৎসক মেহেদী শাহরিয়ার বলেন, ‘আমরা যখন রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছি, তখন তাঁরা এসে বলেন, আমি অমুক। এক্ষুনি তাঁকে দেখে দিতে হবে, কেবিন দিতে হবে ইত্যাদি। চোটপাট শুরু করেন। তাঁর সমস্যার সমাধান করতে গেলে লাইনে থাকা সাধারণ রোগীরা বিরক্ত হন, ক্ষিপ্ত হন।’
ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা বলছেন, হাসপাতালে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এ জন্য পরিচিতিমূলক কার্ড করা যেতে পারে। অযাচিত চাপ কমানোর জন্য জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আনসার বা পুলিশি পাহারা বাড়িয়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
নারী ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভিন্ন কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় বলে দাবি করলেন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের ইন্টার্ন চিকিৎসক মুস্তারিমা আরজু। তিনি বলেন, ‘নারী চিকিৎসকের সংখ্যা দিনে দিনে বেশি হচ্ছে। এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে, আমি ওয়ার্ডে দেখার পর সেই রোগী পুরুষ সহকর্মীর কাছে গিয়ে বলছেন, আমাকে দেখুন, আমাকে এখনো ডাক্তার দেখেনি।’ তিনি বলেন, একাধিক নারী চিকিৎসক থাকার পরও রোগীরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, ওয়ার্ডে কোনো চিকিৎসক নেই।
চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে ইন্টার্নদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ বলে মন্তব্য করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্য অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহবুব। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের দেখার কেউ নেই—না প্রশাসন, না সংগঠন। আবার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎও তাঁরা দেখেন না। কারণ, চিকিৎসকদের চাকরির সুযোগ দ্রুত সীমিত হয়ে আসছে।