গোলটেবিল বৈঠক

ইশতেহারে খাদ্য অধিকার আইন করার অঙ্গীকার চাই

‘রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার ও খাদ্য অধিকার আইন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা। গতকাল প্রথম আলো কার্যালয়ে। ছবি: প্রথম আলো
‘রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার ও খাদ্য অধিকার আইন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা। গতকাল প্রথম আলো কার্যালয়ে।  ছবি: প্রথম আলো

যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় যাক, তারা যেন নতুন সংসদে খাদ্য অধিকার আইন করে। দরিদ্র মানুষের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে ওই আইন করা এবং তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে থাকতে হবে। গতকাল প্রথম আলোর গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব দাবি জানিয়েছেন। উপস্থিত বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের নেতা বলেন, তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহারে ওই আইন করার বিষয়টি থাকবে। ক্ষমতায় গেলে তাঁরা এটা বাস্তবায়ন করবেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়। সহযোগিতা করে খাদ্য অধিকার, বাংলাদেশ; ইকো কো–অপারেশন ও সিভিল সোসাইটি এনগেজমেন্ট।   

বৈঠকের প্রধান অতিথি অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান বলেন, খাদ্য অধিকার আইনের বিষয়টি সরকারের চিন্তায় আছে। ইতিমধ্যে সরকার দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। ২২টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে স্কুলে পুষ্টিকর বিস্কুট দেওয়া শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় গেলে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেবে। সবার জন্য সুপেয় পানির বিষয়টি নিয়েও সরকার কাজ করছে।

বৈঠকে  খাদ্য অধিকার, বাংলাদেশের সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বেশির ভাগ দেশের মতো বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনও কমবে। ফলে আমাদের সামনের দিনগুলোতে কৃষি ও খাদ্য নিয়ে খুব সাবধানে এগোতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে খাদ্য অধিকার আইন করে  তা বাস্তবায়ন করতে হবে।’

 মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খাদ্য অধিকার, বাংলাদেশ–এর সাধারণ সম্পাদক মহসীন আলী। তিনি বলেন, দেশে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হয়েছে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২১ শতাংশ। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমছে না। এখনো দেশের ৩ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ দরিদ্র। এসব মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে হলে খাদ্য অধিকার আইন করতে হবে।

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুমের সঞ্চালনায় বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ ও সিপিবি নেতা অধ্যাপক এম এম আকাশ, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, ইকো কো–অপারেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ তেসা স্মেলজার, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য সুশান্ত দাস, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্যসচিব আ ব ম মোস্তফা আমিন এবং জাসদের জাতীয় যুব জোটের সভাপতি রোকনুজ্জামান।

কর্মসূচির পুনর্গঠন দরকার
দেশের সংবিধানে সব মানুষের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষার ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও অপুষ্টির শিকার ২ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ তা পাচ্ছে না। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী দেশের আড়াই কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। ৪৪ শতাংশ নারী ভুগছে রক্তস্বল্পতায়। প্রকৃত উন্নয়নশীল দেশ হতে হলে এ পরিস্থিতি বদলাতে হবে। সে জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে পুনর্গঠন করতে হবে।

গতকাল প্রথম আলো আয়োজিত ‘রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার ও খাদ্য অধিকার আইন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। বৈঠকে সহযোগিতা করে খাদ্য অধিকার, বাংলাদেশ; ইকো-কো-অপারেশন ও সিভিকএনগেজমেন্ট অ্যালায়েন্স।বৈঠক হয় কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনে প্রথম আলোর কার্যালয়ে।

মূল প্রবন্ধে খাদ্য অধিকার, বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মহসীন আলী বলেন, দেশের দরিদ্রদের বেশির ভাগের বসবাস উত্তরাঞ্চলসহ নয়টি জেলায়। এর বাইরে নদীভাঙন, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকা, রাজধানীসহ দেশের বেশির ভাগ শহরের বস্তি এলাকা, চা শ্রমিক, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের হার বেশি। সরকার যেসব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালাচ্ছে, তাতে তাদের অবস্থার উত্তরণ হচ্ছে না। তাদের দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে।

অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বলেন, দেশের বেশির ভাগ মানুষের খাদ্যশক্তির ৮০ শতাংশ জোগান আসে ভাত থেকে। কিন্তু পুষ্টি সমস্যা দূর করতে হলে হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী ডিম, দুধ, মাছ ও সবজি পৌঁছে দিতে হবে। দারিদ্র্যের কবলে থাকা জনগোষ্ঠীর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা করে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, দেশে দ্রুত ধনীর সংখ্যা বাড়ছে। আবার গড় আয়ও বাড়ছে। কিন্তু দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমছে না, অপুষ্টি আগের অবস্থায় থেকে যাচ্ছে। দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা না হলে খাদ্য অধিকার নিশ্চিত হবে না।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য সুশান্ত দাস বলেন, তাঁদের দলের ইশতেহারের শুরুতেই খাদ্য অধিকার আইন করার কথা বলা হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হলে থাকা শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার পায় না। দেশে প্রায় এক কোটি বেকার আছে, তাঁদেরও পুষ্টি পরিস্থিতি ভালো না। এঁদের জন্য নিরাপদ খাদ্য ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

ইকো-কো-অপারেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর স্মেলজার বলেন, তাঁদের সংস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্য অধিকার আইন করা ও তার বাস্তবায়নে নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে।

ইকো-কো-অপারেশনের অ্যাডভোকেসি বিশেষজ্ঞ আরশাদ সিদ্দিকী বলেন, অনেক এলাকায় খাবার থাকলেও তা নিরাপদ কি না, সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে। খাদ্য অধিকারের বিষয়টি একটি সামগ্রিক ব্যাপার হিসেবে দেখতে হবে।

খাদ্য অধিকার, বাংলাদেশের সভাপতি ও অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, খাদ্য অধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন সরকার খাদ্য অধিকারের জন্য একটি আইন করবে। দেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় যাক না কেন, তাদের নিরাপদ খাদ্য আইন করার আহ্বান জানান তিনি।

বৈঠকের সঞ্চালক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, দেশের বেশির ভাগ মানুষ আগে দুই বেলা খেতে পারত না। এখন তিন বেলা খেতে পায়। তবে এখন প্রশ্ন উঠছে, সেই খাবার নিরাপদ কি না, পুষ্টিকর কি না। আর তা নিশ্চিত করতে হলে আইন করতে হবে।