সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ চেয়ে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন নিয়ে কথা বলেছেন আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের পঞ্চম বর্ষের ছাত্রী সাদিয়া আফরিন। গতকাল সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর সিলেটের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমনকুমার দাশ।

প্রথম আলো: আপনি তো বেগম সিরাজুন্নেসা হলের আবাসিক ছাত্রী। এ হলে মূলত কী কী সমস্যা ছিল? কত দিন ধরে এসব সমস্যা ছিল? সমাধানের জন্য কি আপনারা এর আগে প্রাধ্যক্ষকে বলেছিলেন?
সাদিয়া আফরিন: আমাদের হলে ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক দুর্বল। খাবারের মান দিনে দিনে কমছিল, এ ধরনের বেশ সমস্যা আছে। করোনা পরিস্থিতির আগে এক থেকে দেড় বছর ধরে এমন সমস্যা ছিল। পরে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয় চালু হওয়ার পর একই সমস্যায় পড়তে হয়েছে ছাত্রীদের। এ নিয়ে ম্যামের (প্রাধ্যক্ষ) সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি আন্তরিক ব্যবহার করতেন না। বলতেন, এসব নাকি সমস্যা না। থাকতে হলে এভাবেই থাকতে হবে।
প্রথম আলো: হলের প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। প্রাধ্যক্ষও পদত্যাগ করেছেন। তাহলে এখন কেন উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন?
সাদিয়া আফরিন: আমরা যখন প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন করছিলাম, তখনই কিন্তু আমাদের ওপর পুলিশি হামলা হয়। এর প্রতিবাদে আমরা যখন উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করি, তখন জানানো হয় প্রাধ্যক্ষ পদত্যাগ করেছেন।
প্রথম আলো: উপাচার্য গণমাধ্যমে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের ওপাশ থেকে ‘গুলি ছোড়ায়’ পুলিশ অ্যাকশনে যেতে বাধ্য হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ যে মামলা করেছে, সেখানে ২০০ থেকে ৩০০ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধা দেওয়া, ককটেল বিস্ফোরণ, গুলিবর্ষণ ও পুলিশকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?
সাদিয়া আফরিন: আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ইটপাটকেল ছোড়া হয়নি, আর গুলি-ককটেল তো দূরের কথা। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থী। আমরা নিজেদের ক্যাম্পাসে কখনো গুলি, টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিয়ে ঢুকি না। আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিলাম। এটা শুধু ছাত্রীদের আন্দোলন ছিল। আর ছাত্রীদের আন্দোলনে কখনো এই ধরনের ইটপাটকেল ছোড়া এসব আসে না। যখন পুলিশ আমাদের ওপর হামলা করেছে, নির্বিচার লাঠিপেটা শুরু করেছে, তখন সেখান থেকে ছাত্রীদের বাঁচানোর জন্য কিছু ছেলে পুলিশদের দিকে ইটপাটকেল ছুড়েছে। তবে সেটা পুলিশ আমাদের ওপর হামলা করার পরই তারা করেছে। আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেখানে বাইরে থেকেও কারও ঢিল ছোড়ার সুযোগ নেই। পুরো বিষয়টিই মিথ্যাচার।
পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। এটা প্রত্যাহারের দাবি আমরা জানিয়েছি। কিন্তু এখনো সেটি মানা হয়নি। পুলিশ এল, পুলিশ হামলা করল, আবার পুলিশই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা করল। আমরা মনে করি, উপাচার্য স্যারের ইন্ধনে পুলিশ হামলা করেছে। তাই তাঁকে পদত্যাগ করতেই হবে।
প্রথম আলো: পুলিশের হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটা তদন্ত কমিটি করেছে...
সাদিয়া আফরিন: তদন্ত কমিটি যে গঠন করা হয়েছে, সে বিষয়ে আমাদের এখন পর্যন্ত কিছু জানানো হয়নি। তদন্ত কমিটিতে কে কে আছেন, সে বিষয়েও আমরা জানি না। তদন্ত কমিটি কবে গঠন করা হয়েছে, তাদের কার্যক্রম কীভাবে চলছে বা শেষ পর্যন্ত তদন্ত কবে শেষ করবে, সে বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।
প্রথম আলো: উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখার আগে নাকি কিছু শিক্ষার্থী তাঁকে লাঞ্ছিত করারও চেষ্টা করেছিলেন? এমনটাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাবি করছে...
সাদিয়া আফরিন: আমরা উপাচার্য স্যারের সঙ্গে কথা বলার জন্য সেদিন সবাই পেছন পেছন যাচ্ছিলাম। কিন্তু স্যারের সঙ্গে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁকে ঘিরে রেখেছেন। এরপর আইসিটি ভবনের ভেতরে উপাচার্য স্যার ঢুকে যান। পরে এ ভবনের সামনে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেয়। উপাচার্য স্যারকে লাঞ্ছিত করার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।
প্রথম আলো: আমরণ অনশন শুরুর পর সংকট নিরসনে শিক্ষকেরা বারবার আপনাদের কাছে আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে ছুটে গিয়েছেন। কিন্তু আপনারা প্রত্যাখ্যান করেছেন, কেন?
সাদিয়া আফরিন: বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বারবার আমাদের আন্দোলন নিয়ে মিথ্যাচার করছিল। এতে তাদের প্রতি আমাদের অবিশ্বাস জন্মেছে। শিক্ষকেরা বলেছেন, শিক্ষার্থীরা নাকি শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করেছে। আমরা এটা করিনি। আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিলাম। এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্যে তাঁরা নানা ধরনের মিথ্যাচার ছড়িয়েছেন। এসব কারণে তাঁদের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাই তাঁদের প্রতি আমাদের আস্থা ছিল না।
প্রথম আলো: উপাচার্য দাবি করেছেন, বহিরাগতরা আপনাদের আন্দোলনে ইন্ধন দিচ্ছে।
সাদিয়া আফরিন: এ বিষয়ে একটাই কথা বলব, আমরা আমাদের যৌক্তিক আন্দোলন করছি। আমাদের যিনি উপাচার্য রয়েছেন, তাঁকে আমরা ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করছি। এই উপাচার্যকে আমরা চাচ্ছি না।
প্রথম আলো: আপনারা এত দিন ধরে অহিংস আন্দোলন করে আসছেন। হঠাৎ কী এমন ঘটল, যে কারণে উপাচার্যের বাসভবনের বিদ্যুৎ–সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন?
সাদিয়া আফরিন: অনশনকারীরা অভুক্ত অবস্থায় কষ্ট করে আছে, আর তিনি বাসায় বসে আরামে আছেন, খাওয়াদাওয়া করছেন। মানুষজন তাঁর বাসায় যাচ্ছে-আসছে। এ কারণে আমরা বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। আমরা যেমন আছি, এখন তিনিও তেমন থাকুন। তখনই আমাদের যন্ত্রণা তিনি অনুভব করতে পারবেন।
প্রথম আলো: শেষ পর্যন্ত তাহলে সমাধান কী?
সাদিয়া আফরিন: আমরাও চাই বিষয়টি দ্রুত শেষ হোক। কারণ, যাঁরা আমরণ অনশন করছেন, তাঁদের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। এখানে আমাদের আপস করার কিছু নেই, আমরাও দ্রুত সমাধান চাই। আমাদের একটাই দাবি, যে উপাচার্য আমাদের ওপর হামলার নির্দেশ দিয়েছেন, যে উপাচার্য আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করিয়েছেন, তারপর মিথ্যাচার করে বেড়াচ্ছেন, সেই উপাচার্যকে আমরা আমাদের ক্যাম্পাসে চাই না। এই উপাচার্য থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় কখনো শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাসে পরিণত হতে পারবে না, এটা আমরা মনে করি। তাই আমাদের এক দফা এক দাবি। সেটা হলো উপাচার্যকে পদত্যাগ করেই সংকট দূর করতে হবে। এর আগপর্যন্ত আমরা আন্দোলন থেকে সরব না।