
দুপুর বেলা। রমনা থানার সামনে তীব্র যানজটে আটকে আছে মগবাজারমুখী নানা শ্রেণির পরিবহন। হঠাৎ পুরোনো এলিফ্যান্ট রোড থেকে আসা একটি কালো জিপ উল্টো পথে এগিয়ে গেল। অল্প সময়ে পৌঁছে গেল মগবাজার মোড়ে। সেখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্য দেখেও না দেখার ভান করলেন। এ চিত্র গত সপ্তাহের। তবে রাজধানীতে এ দৃশ্য কেবল একটি সড়ক বা একটি দিনের নয়। প্রায় প্রতিদিনেরই।
রাজধানীতে উল্টো পথে গাড়ি চলা থামছে না। অতি সম্প্রতি উত্তরায় উল্টো পথে চলা গাড়ির চাপায় একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র এবং একজন ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। বহুল আলোচিত প্রতিরোধক ব্যবস্থাও এ ক্ষেত্রে কাজে আসেনি।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. শামসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘উল্টো পথে চলাচল থামাতে এখন জনস্বার্থে সর্বোচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এটা এখন সময়ের দাবি।’
জনগণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হলে পুলিশের একার পক্ষে উল্টো পথে গাড়ি চালনা বন্ধসহ ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন, এ কথা প্রকারান্তরে স্বীকার করলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) খন্দকার গোলাম ফারুক।
ট্রাফিক পুলিশ সূত্র জানাচ্ছে, অতি জরুরি গুরুত্বপূর্ণ কারণে কেবল পুলিশের গাড়ি, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এবং অ্যাম্বুলেন্স উল্টো পথে যেতে পারবে, তবে অবশ্যই সাইরেন বাজিয়ে। এ ছাড়া অন্য যেকোনো অবস্থায়, কেউই উল্টো পথে যেতে পারবেন না।
১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশে সুনির্দিষ্টভাবে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর কোনো শাস্তির কথা উল্লেখ নেই। এই অধ্যাদেশের ১৪৩ নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে, বেপরোয়াভাবে বা বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড কিংবা পাঁচ শত টাকা জরিমানা হবে। এবং চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স একটা নির্ধারিত মেয়াদের জন্য সাসপেন্ড থাকবে। গত কয়েক দিনের পর্যবেক্ষণে রাজধানীর নয়াপল্টন, কাকরাইল, রমনা, শাহবাগ, মগবাজার, তেজগাঁও এলাকার প্রধান সড়কগুলোতে উল্টো পথে গাড়ি চলতে দেখা গেছে। এ ছাড়া মিরপুর রোড, রোকেয়া সরণিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও দেখা যায় একই চিত্র।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে বনানীর কাকলীতে ২৭ নম্বর রোড-সংলগ্ন ক্রসিংয়ে উল্টো পথে আসা পুলিশবাহী মিনিবাসের (রিকুইজিশন করা গাড়ি) ধাক্কায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রিয়াজ উদ্দিন নিহত হয়। মোটরসাইকেলে থাকা রিয়াজের সঙ্গে রাজিন নামে আরেক যুবক আহত হন। এ ঘটনায় বনানী থানার সামনে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় ব্যক্তিরা।
এর কদিন পরে ৩ মার্চ বৃহস্পতিবার উত্তরায় উল্টো পথে চলা সিটি করপোরেশনের আবর্জনাবাহী গাড়ির চাপায় আবুল কালাম আজাদ নামে এক ব্যবসায়ী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। উত্তরা হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন কার্যালয়-সংলগ্ন পদচারী-সেতুর পূর্ব পাশে ঘটে এ দুর্ঘটনা। এতে সিটি করপোরেশনের গাড়ি ও এর চালককে আটক করা হয় বলে জানান উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর মিয়া।
কাজে আসেনি প্রতিরোধক ব্যবস্থা: উল্টো পথে যানবাহন চলাচল ঠেকাতে রাজধানীর হেয়ার রোডে ২০১৪ সালের ২৩ মে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হয়েছিল প্রতিরোধক যন্ত্র। ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, উল্টো পথে যান চলাচল ঠেকানোর এই যন্ত্র টেকেনি। ভারী যানবাহনের চাপে কিছুদিনের মধ্যে ভেঙে যায় ৪৫ মিলিমিটার পরপর বসানো এর কাঁটাগুলো।
জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) খন্দকার গোলাম ফারুক বললেন, ‘এগুলো স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়েছিল। তাই টেকেনি।
কী করা উচিত?: সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. শামসুল হকের পর্যবেক্ষণ, ‘আইন না মানার সংস্কৃতি আমাদের মজ্জার মধ্যে ঢুকে গেছে। যানজট নিরসনে সম্প্রতি ভারতের দিল্লিতে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, তা এখানেও করার কথা ভাবা যেতে পারে।’
উল্টো পথে গাড়ি চালানো এবং ট্রাফিক পুলিশের পদক্ষেপের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বেশ হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করলেন নিরাপদ সড়ক চাই-এর আহ্বায়ক ও অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে দেখেছি, ডিউটি শেষে ট্রাফিক পুলিশকে নিতে যে গাড়ি আসে, সেই গাড়ি উল্টো পথে যায়। বিচারপতির গাড়ি, সচিবের গাড়ি, মিডিয়ার গাড়ি, বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি উল্টো পথে যায়। তাই তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কী করার থাকতে পারে আমাদের।’
উল্টো পথে গাড়ি চালানোর বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান মিয়া গত ২৯ ফেব্রুয়ারি এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘সম্প্রতি কয়েকটি মোড়ে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে বিষয়টি আমরা প্রত্যক্ষ করার চেষ্টা করেছিলাম। আমাদের অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ। সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষেরাই বেশি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করেন।’