গোলটেবিল বৈঠক

এইডস প্রতিরোধে সজাগ থাকতে হবে

প্রথম আলোর আয়োজনে গতকাল ‘এইচআইভি এইডস সচেতনতা: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা l ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলোর আয়োজনে গতকাল ‘এইচআইভি এইডস সচেতনতা: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা l ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডসের প্রকোপ কম হলেও সংক্রমণ থেমে নেই। এ খাতে আন্তর্জাতিক অর্থ-সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশটি এখনো ঝুঁকির মধ্যে আছে। তাই সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাকে দাতাগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর না করে ধারাবাহিকভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। রোগটি প্রতিরোধে বেশি সজাগ থাকতে হবে।
গতকাল রোববার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সহায়তায় প্রথম আলো আয়োজিত ‘এইচআইভি এইডস সচেতনতা: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আলোচকেরা এসব কথা বলেছেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যম এগিয়ে এলে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত খরচ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এইচআইভি/এইডস, ক্যানসার—এ ধরনের রোগ প্রতিরোধে সরকারের বরাদ্দ কম। আমিও তদবির করব, যাতে আগামী বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়।’ বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন সচেতনতামূলক টিভিসিসহ যা তৈরি করেছে, তার কপি মন্ত্রণালয়কে দিলে সরকারি গণমাধ্যমে প্রচারের পাশাপাশি বেসরকারি টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মাধ্যমকে বিনা মূল্যে প্রচারের অনুরোধ করবেন বলে জানান তথ্য মন্ত্রী। তিনি বলেন, আর এ ধরনের প্রচার শুধু এক দিন করে থেমে থাকলে চলবে না। কারণ, শেষ বিচারে অবিরাম প্রচারের গভীর প্রভাব আছে।

হাসানুল হক ইনু

তথ্যমন্ত্রী অভিবাসী শ্রমিকদের ‘স্বর্ণ প্রবাসী’ আখ্যা দিয়ে তাঁরা যখন বিদেশে যাবেন এবং দেশে ফিরবেন, তখন এই রোগটি প্রতিরোধে কী করতে হবে, তা বাংলায় সহজ করে ছাপিয়ে লেমিনেটিং করে বিমানবন্দরেই তাঁদের হাতে দিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন।
বৈঠকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, আশপাশের দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা ভালো, এ কথা মনে করে ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না। রোগটি প্রতিরোধের জন্য বেশি সজাগ থাকতে হবে। প্রতিমন্ত্রী অভিবাসী নারী শ্রমিক এবং যৌনপল্লির যৌনকর্মীদের পাশাপাশি ভাসমান যৌনকর্মীদের সচেতন করার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন।
জাতীয় এইডস/এসটিডি কর্মসূচির উপব্যবস্থাপক আনিসুর রহমান বলেন, মে মাস থেকে সরকারি অর্থায়নে দেশের ১০টি সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে এইচআইভি/এইডস রোগীদের জন্য চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়েছে। তবে এ রোগের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সচেতন করতে এখন পর্যন্ত সে ধরনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বৈঠকের শুরুতে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এইচআইভি/এইডসের ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং এই রোগটি প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতে প্রথম আলোর ভূমিকা তুলে ধরেন। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে এ কার্যক্রম আরও বাড়ানো হবে বলে জানান। তিনি এ ধরনের কার্যক্রমে সরকারের প্রচার উদ্যোগ এবং সহায়তা বেশি প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, কেউ ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ করে থাকলে বা অনিরাপদ পদ্ধতিতে রক্ত দিলে বা নিজের শরীরে রক্ত নিলে, তাঁকে এইচআইভি পরীক্ষা করাতে হবে।
নজরুল ইসলাম বলেন, এক হিসাব অনুযায়ী ৯১ শতাংশ নারী স্বামীর মাধ্যমে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাই পুরুষ বা স্বামীদের সচেতনতার জন্য বিশেষ কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। এখন পর্যন্ত দেশে এইচআইভি/এইডস রোগীবান্ধব হাসপাতাল গড়ে না ওঠাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিটপী দাশ চৌধুরী প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে তাঁরা এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তা তুলে ধরেন। তিনি রোগীর সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ দূর করার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন।

মেহের আফরোজ চুমকি

১৬ বছর ধরে এইচআইভি পজিটিভদের নিয়ে কাজ করা আশার আলো সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক হাবিবা আক্তার বলেন, একজন এইচআইভি পজিটিভ ব্যক্তিই রোগটির প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু ওই পজিটিভ ব্যক্তিকে চিকিৎসার আওতায় আনতে না পারলে এ কাজ করা সম্ভব হবে না। মনে রাখতে হবে, সমস্যাটি শুধু পজিটিভ ব্যক্তির একার নয়, তা পরিবার ও রাষ্ট্রের।
ইউএন এইডস বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক ইনফরমেশন অ্যাডভাইজার সায়মা খান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, দেশে এইচআইভি পজিটিভ রোগী আছেন ৮ হাজার ৯০০ জনের বেশি। তাঁদের মধ্যে সাড়ে তিন হাজার জনের কথা জানা সম্ভব হয়েছে। অথচ তাঁদের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৩০০ জন অ্যান্টি রেট্রভাইরাল থেরাপি পাচ্ছেন।
সায়মা খান দেশের যেসব জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বেশি, সে ধরনের ২৩টি জেলায় বরাদ্দ বাড়ানোসহ বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।
আসক্তি পুনর্বাসন নিবাস আপনগাঁও-এর নির্বাহী পরিচালক ব্রাদার রোনাল্ড ড্রাহোজাল বলেন, সবার সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তিনি সচেতনতামূলক কার্যক্রমে মাদকাসক্ত যুবসমাজ এবং পথশিশুদের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।
উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সেন্টার ফর এইচআইভি অ্যান্ড এইডস-এর বিজ্ঞানী শরফুল ইসলাম খান বলেন, যৌন মিলনের সময় কনডম ব্যবহার না করলে এইচআইভি/এইডসের ঝুঁকি বেড়ে যায়, তা প্রায় সবার জানা। কিন্তু সেই হারে কনডমের ব্যবহার বাড়েনি। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নেও ততটা নজর দেওয়া সম্ভব হয়নি।
কেয়ার বাংলাদেশের পরিচালক (স্বাস্থ্য) জাহাঙ্গীর হোসেইন বলেন, ‘দাতা সংস্থার সহায়তা কমে যাচ্ছে বলে হতাশ হলে চলবে না। আমরা আমাদের সমস্যা সম্পর্কে জানি। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী কারা, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে।’
সেভ দ্য চিলড্রেনের এইচআইভি/এইডস প্রোগ্রামের চিফ অব পার্টি লিমা রহমান রোগটি প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতে প্রথম আলো বন্ধুসভার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘বাঁচতে হলে জানতে হবে’ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রমে এখন এইচআইভি পরীক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ছাড়া সচেতনতা তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুককেও ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম যাতে নিজ দায়িত্বে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেই আহ্বান জানান। মাধ্যমিক পর্যায় থেকে পাঠ্যবইতে এইচআইভি/এইডসের বিষয়টি কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও অনেক শিক্ষক ওই চ্যাপ্টার না পড়িয়ে স্ট্যাপলার করে রাখেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জাতীয় এইডস/এসটিডি কর্মসূচির পরামর্শক আখতারুজ্জামান বলেন, এইচআইভি/এইডস খাতে যে বরাদ্দ আছে, তাও অনেক সময় খরচ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই দিকটিতেও নজর দিতে হবে।
বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পরিচালক (প্রোগ্রাম) ফসিউল আহসান বলেন, এইচআইভি পজিটিভ চিহ্নিত হওয়ার পর রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে রেফার করা হয়। কেউ নিজে দায়িত্ব নিতে চায় না। বিভিন্ন কর্মসূচিতে পারিবারিক কাউন্সেলিং এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের পুষ্টির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।