
খুব সকাল থেকে পাহাড়ি এক গহিন বনের বৃক্ষতলে বসে ছিলাম পাখি দেখার জন্য। পাহাড়ের চূড়ায় একটি গাছভর্তি ছোট ছোট গোলাকার পাকা ফল। এ জন্য সকাল থেকেই হরেক রকমের পাখির আনাগোনা গাছটিতে। পাহাড়ি ময়না, উদয়ী ধলাচোখ, কয়েক প্রজাতির ফুলঝুরি থেকে শুরু করে নানা প্রজাতির বুলবুল আসছে পাকা ফল খেতে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৩৩ প্রজাতির পাখির দেখা পেয়েছিলাম সেদিন। এদের মধ্যে ছিল বড় হলদেকুড়ালি, পম্পাডুর হরিয়াল, সবুজ ধুমকল, সোনাকপালী হরবোলা, এশীয় নীলপরি, কমলাপেট ফুলঝুরি, হলদেতলা ফুলঝুরি, এশীয় তেলশালিক ইত্যাদি।
পৃথিবীতে ১৩৮ প্রজাতির বুলবুল রয়েছে। আমাদের দেশে আছে নয় প্রজাতির বুলবুল; যেমন কালামাথা বুলবুল, বাংলা বুলবুল, মেটে বুলবুল, সিপাহি বুলবুল, কালাঝুঁটি বুলবুল, ধলাগলা বুলবুল, জলপাই বুলবুল, কালচে বুলবুল ও কালা বুলবুল। একসঙ্গে একই গাছে ছয় প্রজাতির বুলবুল দেখার ভাগ্য সেদিন সকালে হয়েছিল। শুধু গাছটিতে আসেনি মেটে বুলবুল, কালচে বুলবুল ও কালা বুলবুল। খুব সকাল থেকেই গাছে ভিড় করছিল সিপাহি বুলবুল এবং ওদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। কালাঝুঁটি বুলবুল সারা দিনে পাঁচ-ছয়টি এসেছিল সামান্য সময়ের জন্য। দুটি ধলাগলা বুলবুল ৩০ মিনিট পর পর এসে ফল সংগ্রহ করে আবার ফিরে গিয়েছিল। বাসায় ছানা ছিল বলে এমনটি করছিল ধলাগলা বুলবুল। কালামাথা বুলবুল ছিল লাজুক স্বভাবের, ফল খেয়েই চম্পট। বাংলা বুলবুল এসেছিল সবার পরে বেলা করে। বনের মধ্য থেকে গান গাইতে ছোট এক বুলবুল এসেছিল মাঝে মাঝে। সেটি ছিল জলপাই বুলবুল। একাকী ছোট ছোট দূরত্ব মেপে এডাল-ওডালে উড়ে পাকা ফল খাচ্ছিল পাখিটি। খাবার খেয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ডাক দিয়ে যেত।
জলপাই বুলবুলের বসবাস চিরসবুজ বনে। জলপাই বুলবুল ঘন চিরসবুজ বন, বৃক্ষতলে উৎপন্ন মাঝারি ধরনের লতাগুল্ম ও বন সীমানায় বিচরণ করে। নিঃসঙ্গ পাখি ও সচরাচর একা কিংবা জোড়ায় থাকে। ফলে ভরা গাছ ও উঁচু ঝোপে ঘুরে ঘুরে খাবার খোঁজে। খাদ্যতালিকায় আছে মূলত রসাল ফল। সচরাচর কোমল শিসে ডাকে। বনের কোনো গাছে ফল পাকলে সেই গাছে সারাক্ষণই এটির আনাগোনা থাকে। দুর্লভ এ পাখি আমাদের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের চিরসবুজ বনে বসবাস করে। কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে গিয়ে জলপাই বুলবুলের (Olive Bulbul) দেখা পেয়েছি প্রথম। কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে যতবারই এ পাখি দেখেছি, ততবারই কোনো না কোনো ফলের গাছে ছিল পাখিটি। শুধু একবার রামপাহাড়ের ছড়ায় গোসল করতে দেখেছি। দুপুরের দিকে মিনিট তিনেক ধরে গোসল করে ফিরে গিয়েছিল বনের ভেতর।
এটি ছোট আকারের বুলবুল। দেহের দৈর্ঘ্য ১৯ সেন্টিমিটার। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহ খুব মসৃণ। পিঠের দিক জলপাই রঙের। দেহের নিচের দিক ফিকে জলপাই-হলুদ। ঘাড়ের পেছনটা ফিকে জলপাই। ডানা জলপাই হলুদ, ঠোঁট শিং বাদামি; ওপরের ঠোঁট অপেক্ষাকৃত কালচে; নিচের ঠোঁট তুলনামূলক ফিকে, চোখ বাদামি। লেজ লালচে-বাদামি। পা ও পায়ের পাতা সামান্য বাদামি-মেটে। ছেলে ও মেয়েপাখির চেহারা অভিন্ন। মার্চ-জুন মাসে ভূমি থেকে ১ দশমিক ৫ মিটার উচ্চতায় কোনো ঝোপের মধ্যে বাসা বানায় ও ডিম পাড়ে। ডিমের সংখ্যা তিনটি। প্রজনন সম্পর্কে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।