বিশেষজ্ঞ মত : বছরের পর বছর যায়, জলাবদ্ধতা থেকে যায়

জলাবদ্ধতা সহনীয় পর্যায়ে আনতে যা করতে হবে

দেলোয়ার মজুমদার
দেলোয়ার মজুমদার

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করতে হলে প্রথমেই এর কারণ ও চরিত্র কী, তা জানতে হবে। এর সমাধানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী তা-ও জানতে হবে। এরপর খুঁজে বের করতে হবে এই সমস্যা সমাধানের জন্য যথাযথ পরিকল্পনা আছে কি না। পরিকল্পনা প্রণয়নের পর তা বাস্তবায়নের উপায়গুলো খুঁজে বের করতে হবে।

২০১২ : ১০ মে: বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকা। পাঁচ বছর পরও চকবাজার এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমেনি


চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা সমস্যা প্রকট হওয়ার অনেক কারণ আছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ। নিচু এলাকা এবং জলাধার ও জলাশয় ভরাট করে ভবন তৈরি করা হচ্ছে। এতে ড্রেনেজ এলাকা কমে যাচ্ছে। আবার নালা-নর্দমা ও খালগুলো দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। অবৈধভাবে পাহাড় কাটার ফলে পাহাড়ি বালু নালা ও খালে পড়ে তা ভরাট হয়ে গেছে। খালের ভেতর দিয়ে সেবা সংস্থার পাইপলাইন গিয়ে পানিনিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। নালা-নর্দমা ও খালকে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করার মানসিকতাও জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট হওয়ার একটি কারণ। চট্টগ্রাম নগর সাগর ও নদীর পাশে গড়ে উঠেছে। ফলে জোয়ারের পানি অবাধে শহরে প্রবেশ করে লোকালয় তলিয়ে যায়। যখন একই সময়ে বৃষ্টিপাত ও উচ্চ জোয়ার থাকে, তখন অবস্থা ভয়াবহ হয়।নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের জন্য ইতিমধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ স্টাডি (গবেষণা) ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯৫ সালে ইউএনডিপি ও ইউএনসিএইচএসের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ‘চিটাগাং স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ অ্যান্ড ফ্লাড কন্ট্রোল মাস্টারপ্ল্যান’ প্রণয়ন করা হয়।

২০১৩ : ২৮ জুলাই: আগ্রাবাদ সিডিএ এলাকার বাসিন্দাদের জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়

 ‘ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান’ নামে পরিচিত এই মহাপরিকল্পনা খুবই উন্নত মানের। এই মহাপরিকল্পনায় পানিনিষ্কাশনব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা, খাল ও নালা-নর্দমার অপদখল এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো যত্নের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয়েছে। নতুন তিনটি খাল খনন এবং খালগুলোর অপ্রয়োজনীয় বাঁক সংশোধন করে সোজা করার প্রস্তাবনা ছিল। পাহাড়ের বালু রোধে সিলট্র্যাপ (পাহাড়ি বালু আটকানোর ফাঁদ) করার কথাও বলা হয়। জোয়ারের পানি ঠেকানোর জন্য জোয়ার প্রতিরোধক ফটক নির্মাণ, সাগর ও নদীর কাছাকাছি নিচু এলাকায় জলাধার সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছিল। কোন প্রস্তাব কোন পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হবে, তারও নির্দেশনা ছিল।সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং করণীয় নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও প্রস্তাব মহাপরিকল্পনায় ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্ধারিত সময়ে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

২০১৪ : ২২ জুন: দুই নম্বর গেট। ভারী বৃষ্টি হলেই হাঁটুপানি থেকে কোমরপানি জমে এই এলাকায়

দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই সমস্যা রাতারাতি দূর করা যাবে না। সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সামর্থ্য নিয়ে যদি এখনই কাজ শুরু করা যায়, তাহলে দু-তিন বছরের মধ্যে জলাবদ্ধতার সমস্যা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। একই গতিতে ১০-১২ বছর কাজ করলে চট্টগ্রামকে ৫০-৬০ বছরের জন্য রক্ষা করা যাবে। অবশ্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে ভিন্ন কথা। দীর্ঘ মেয়াদে এই সমস্যা নিরসনের জন্য প্রয়োজন পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকার। প্রতিবছর অন্তত ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হবে। আর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সব সেবা সংস্থাকে মেয়রের কাছে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

২০১৫ : ১ আগস্ট: বৃষ্টির পাশাপাশি জোয়ারের কারণেও জলাবদ্ধতায় ভুগতে হয় চাক্তাইয়ের ব্যবসায়ীদের

তবে জলাবদ্ধতা সহনীয় পর্যায়ে আনার জন্য এ মুহূর্তে কিছু কাজ শুরু করা যেতে পারে। প্রথমেই নগরের নালা-নর্দমা ও খালগুলো অপদখলমুক্ত করতে হবে। অবৈধ সব স্থাপনা অপসারণ করলে পানিনিষ্কাশন দ্রুত ও সহজ হবে। নালা ও খালের ভেতর থাকা সেবা সংস্থার পাইপলাইন সরিয়ে নিতে হবে। নালা-নর্দমা ও খালগুলোর কারিগরি ত্রুটি সংশোধন করতে হবে। নালা-নর্দমা ও খালে যাতে কেউ আবর্জনা ফেলতে না পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। অন্ততপক্ষে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে জোয়ার প্রতিরোধক ফটক নির্মাণ করতে হবে। এসব কাজ করার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা। অবশ্য এসব কাজ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আইনি সহযোগিতা দিতে হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়গুলোকে সক্রিয় ও দায়বদ্ধ করতে হবে। এসব কাজ করা গেলে জলাবদ্ধতা যখন সহনীয় পর্যায়ে আসবে, তখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ পাওয়া যাবে।

২০১৬ : ২১ আগস্ট: মুরাদপুর এলাকার সড়ক অল্প বৃষ্টিতেও তলিয়ে যায়। ভারী বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই l প্রথম আলোর ফাইল ছবি

দেলোয়ার মজুমদার: প্রকৌশলী, সাবেক চেয়ারম্যান, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি), চট্টগ্রাম কেন্দ্র