
পাহাড়িদের সাঙ্গু নদ, যা আমাদের কাছে শঙ্খ সেই নদ ধরে ইঞ্জিন নৌকা চালাতে হবে উজানে। নদের পানি কম তাই মাঝি আগে থেকেই জানাল, সেখানে বড় বড় পাথর এখন বেশ বিপজ্জনক ভঙ্গি করে ভাসে, ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে অল্প জলে, কখনোবা নৌকা আটকে যায়। তাই নৌকার গতি বেশি থাকলে জলযানটি দুই ভাগ হয়ে দুদিকে ছুটতে পারে। আগে হয়েছে এমন। এ জন্য নৌকা ঠেলতে হবে প্রায়ই, সাবধানে খুব ধীরে পেরোতে হবে অনেক জায়গা। ‘মাথায় রাইখেন’ এসব কথা। বুঝলাম অনেক সময় লাগবে তিন্দু যেতে। জানলাম, সেখানে পাহাড়ি কোনো বাসায় আশ্রয় নিয়ে আজকে রাতটা থেকে কালকে আবার রওনা দিতে হবে রেমাক্রির উদ্দেশে। তারপর রেমাক্রি বাজার থেকে পাঁচ ঘণ্টার হাঁটা পথ নাফাখুম। আমরা বলি, আরে এ কোনো ব্যাপার নাকি। এমন অ্যাডভেঞ্চার করার জন্যই তো এসেছি। তখনো জানি না, কী ভয়ংকর বিপদসঙ্কুল পথে আমাদের এ যাত্রা।
রাতটা কাটিয়েছিলাম তিন্দুতে। তিন্দু নিজেও অনেক সুন্দর, আর এখানেও আছে পাহাড়ে ওঠানামার ধকল। সকালে রওনা দিয়ে বেলা বাড়ার আগেই পৌঁছে গেলাম রেমাক্রি বাজারে। এখান থেকেই মূল চ্যালেঞ্জের শুরু। পাহাড় আর খালঝিল পেরোতে হবে হেঁটে আর সাঁতরে। সবই করেছি আমরা। দলের সাঁতার না জানা দুজনের জন্য গহিন পাহাড়ে কাজ করা জুমচাষিদের কাছ থেকে দা এনে কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানিয়ে খাল পাড়ি দিয়েছি, ক্যামেরা বাঁচিয়ে বুকপানি-গলাপানিতে হেঁটেছি মাইলের পর মাইল, অসংখ্য বুনো চালতা কুড়িয়ে ক্রিকেট বল বানিয়ে খেলেছি। দুপুর গড়িয়ে যায় কিন্তু রাস্তা তো আর শেষ হয় না। বারবার ধৈর্যের শেষ বাঁধে এসে পৌঁছালে আমাদের গাইড আশ্বাস দেয় এই তো সামনের বাঁকটা পেরোলেই জলপ্রপাত। বাক পেরোনোর পর আবার দুর্গম পথ উঁকি দিলে সে নতুন আশার বাণী শোনায়, ‘কান পেতে শোনেন কেমন একটা আওয়াজ আসছে।’ পানি পড়ার আওয়াজ। এই তো সামনেই জলপ্রপাত। এতদূর এসে রণে ভঙ্গ দেওয়ার লজ্জা ঢাকতেই আসলে আমরা খোঁড়াতে খোঁড়াতে আবার সামনে ছুটে চলি। যখন ভাবি, না আর সম্ভব না, তখনই—বিকেলের আগে আগে দেখা মিলে জলপ্রপাতের। নাফাখুম দেখার পর যা হবার তাই হলো। ক্লান্ত শরীরে কেমন করে জানি চলে এল অনেক বল। লাফালাফি আর ঝাঁপাঝাঁপির মাঝে মাছ ধরা হলো। সময় নিয়ে জাতীয় পতাকা সামনে নিয়ে নাফাখুম জয়ের ছবি তোলা হলো। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের সবাই অনেক বিস্ময় প্রকাশ করল, আরে কী সুন্দর জায়গা আছে এই বাংলাদেশেই। এখানে না এলে জানাই হতো না। দারুণ দারুণ!