ধরা পড়ল তিন হাজার বস্তা, ফসকে গেল কত

একদা কোনো এক গ্রামে একদল ইঁদুর খুব আরামে বসবাস করত। হঠাৎ একটা বিড়াল এল ওই গ্রামে। বিড়ালের আক্রমণে একে একে ইঁদুরগুলো প্রাণ হারাতে লাগল। বিড়ালের ভয়ে তারা নির্ভয়ে গর্তের বাইরে দিনে কিংবা রাতে বিচরণও করতে পারত না। এ জন্য বিপদাপন্ন ইঁদুর নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য আলোচনা সভায় বসল। এদের সবার শত্রু এক—একটি বিড়াল। নানা তর্ক-বিতর্ক শেষে ইঁদুরগুলো কিছু একটা করতে চাইল। ইঁদুরগুলো বুঝতে পারল, বিড়ালটি ওদের কাছাকাছি আসার আগেই ওর গতিবিধি ওদের বোঝা দরকার। সবাই সিদ্ধান্ত নিল, একটি পিতলের ঘণ্টা বানিয়ে বিড়ালের গলায় ঝুলিয়ে দেবে, যাতে বিড়াল আশপাশে থাকলে টুং টুং শব্দ হয়, আর এতে ইঁদুরগুলো সতর্ক হয়ে গর্তে ঢুকে যেতে পারবে। এই মহান গুরু দায়িত্ব নিল ইঁদুরের দলের একজন প্রতিনিধি। সব ইঁদুর টাকা তুলে প্রতিনিধি ইঁদুরের হাতে দিল, যাতে বাজার থেকে একটা ঘণ্টা কিনে বিড়ালের গলায় পরিয়ে দেয়। প্রতিনিধি ইঁদুরটি নিজের হাতে টাকা আসার পর ভাবল, এত টাকা দিয়ে ঘণ্টা কিনে কী লাভ? এই টাকা দিয়ে অনেক খাবার কিনে আমি গর্তে লুকিয়ে থাকব, ফলে বিড়াল আমাকে আর খুঁজেই পাবে না। এদিকে দলের সব ইঁদুর ঘণ্টা কেনার টাকা দিয়ে নির্ভয়ে চলাচল করতে লাগল, আর একে একে বিড়ালের হাতে মারা পড়তে লাগল। সবশেষে বিড়াল যখন খাওয়ারের জন্য কোনো ইঁদুর খুঁজে পেল না, তখন ওই প্রতিনিধি ইঁদুরের গর্তে হানা দিয়ে তাকেও মেরে ফেলল। ইঁদুরের একটি বড় দলের পরিণতি হলো সবার মৃত্যু, যার পেছনে ছিল একটিমাত্র ইঁদুর প্রতিনিধির ব্যক্তিস্বার্থের প্রবল লোভ। যে লোভ তাকেসহ গোটা দলটাকে খুন করেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আসি। দৈনিক পত্রিকাগুলোর খবরের বরাত দিয়ে গত ১০-১১ দিনে অন্তত হাজারো বস্তা সরকারি ত্রাণের চাল চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ৩০ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ১১ দিনের ব্যবধানে এই চাল চুরির ঘটনাগুলো ঘটে।

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে ওএমএস ও ভিজিডির ৬৩০ বস্তা চাল, বরগুনার পাথরঘাটায় উপজেলায় ৫৫০, যশোরের মণিরামপুরে ৫৫৫, নওগাঁয় ৩৩৮, সারিয়াকান্দি উপজেলায় ২৮৮, সিলেটে ১২৫, বগুড়ার ২ উপজেলায় ২০০, রংপুরের পীরগঞ্জে ৯০, যশোরের শরহতলীতে ৮০, মাদারীপুরের শিবচরে ৬৮, কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে ৬০ বস্তা, ঝালকাঠিতে ৫০, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ২০, বাগেরহাটে ১৮, পটুয়াখালীতে ১০, ময়মনসিংহের ত্রিশালে ১৬, বগুড়ার শিবগঞ্জ ১৩, নাটোরে ১৩, জয়পুরহাটে ৭ বস্তা চাল চুরির খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত চাল চুরি অথবা বিক্রির জন্য মজুত রাখার খবর মিলছে। প্রতিটি চাল চুরির পেছনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি অথবা ডিলারের নাম এসেছে। আমাদের মন–মানসিকতা, নীতি–নৈতিকতা কতটা নিচে নামলে আমরা অভাবী, অনাহারী, অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত চালও চুরি করতে পারি!

স্বাধীনতার এত বছর পরও বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিদের এমন আচরণ শোভা পায় না। উন্নয়ন উন্নয়ন বলে চিৎকার করা আমাদের কখনোই প্রকৃত উন্নয়ন হবে না, যদি না আমরা গরিবের আহারে ভাগ বসানো বন্ধ না করতে পারি।

করোনার কারণে গত এক সপ্তাহ যাবৎ রাস্তায় বের না হতে পেরে উপার্জনের অভাবে যশোরের এক ভ্যানচালকের আত্মহত্যার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। এটা কোনো আত্মহত্যা না, এটা হত্যা। আমরা সমাজ ব্যবস্থার ভেতরে ফেলে হত্যা করেছি ওই ভ্যানচালককে। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্ব করা মেম্বার, চেয়ারম্যান অথবা সরকারি খাদ্যের ডিলারদের উচিত নিজ নিজ আচরণ ঠিক করা। নয়তো আম পাবলিকের ভেতর দায়িত্বশীলতা কোনো দিন সৃষ্টি হবে না।

এই দুর্যোগের সময়ে ব্যক্তিগত লোভের ঊর্ধ্বে মানবসেবাটাই যেন প্রত্যেকের শপথ হয়; না হলে আমি, আপনি, জনপ্রতিনিধি, ভ্যানচালক কেউই বেঁচে থাকতে পারব না। একটি লোভী ইঁদুর লোভ সংবরণ না করার ফল যেমন সব ইঁদুর ভোগ করল, তেমনি জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের লোভ সংবরণ না করতে পারলে এর ফল পুরো জাতিকে বহন করতে হবে, যা কখনোই কাম্য হতে পারে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।