
এ যেন নিয়ম হয়ে গেছে, ফেব্রুয়ারি এলে হিড়িক লাগে বই প্রকাশের। সারা বছর নীরবে-নিভৃতে কাটিয়ে অধিকাংশ প্রকাশক হঠাৎ করেই নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তারপর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বই বের করতে শুরু করেন।
কেন ফেব্রুয়ারির আগে এসেই বই প্রকাশের তাড়াহুড়া—এই প্রশ্নের জবাবে প্রকাশকেরা লেখকদের দিকে আর লেখকেরা প্রকাশকদের দিকে আঙুল তুলে দেখান।
প্রকাশনা সংস্থা অনন্যা প্রকাশনীর কর্ণধার মনিরুল হক বলেন, ‘সারা বছর তাগাদা দিলেও নভেম্বরের আগে বেশির ভাগ লেখকই পাণ্ডুলিপি জমা দেন না। আমরা এখন বছরের অন্য সময়ে বই প্রকাশের আগ্রহই হারিয়ে ফেলেছি লেখকদের অসহযোগিতায়। এ কারণে বছরের অন্য সময় রিপ্রিন্ট করি।’ তিনি বললেন, শুধু এবারের মেলায় তাঁর প্রকাশনা সংস্থা থেকে ১৬০টিরও বেশি বই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে।
লেখক ইমদাদুল হক মিলন প্রকাশকদের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘ঘটনা পুরোই উল্টো। আমরা সারা বছরই লিখি। শুধু ঈদ সংখ্যার হিসাব করলেও চার-পাঁচটি নতুন উপন্যাস দেওয়া যাবে। বছরের অন্য সময় প্রকাশকেরা লেখা চান না, ছাপেন না। পাণ্ডুলিপি যখনই জমা দেওয়া হোক না কেন, দু-একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি সবাই ফেব্রুয়ারি মাসেই বই প্রকাশ করে। আমি তো চাই নতুন বই হোক সারা বছর, বইয়ের মেলা হোক সারা বছর।’ জনপ্রিয় এই লেখক বলেন, এবার মেলায় তাঁর সাতটি নতুন বই থাকছে।
প্রকাশনা সংস্থা অ্যাডর্ন পাবলিকেশনসের প্রধান নির্বাহী সৈয়দ জাকির হোসেইন বলেন, মেলাটি বই প্রকাশের উৎসবে পরিণত হওয়ার কারণেই অধিকাংশ প্রকাশক বইমেলায় বই প্রকাশ করতে পছন্দ করেন। তবে তিনি নিজে বছরজুড়ে বই প্রকাশের পক্ষে এবং গত বছরের মার্চ থেকে তাঁর প্রকাশনা সংস্থা থেকে ৬০টি বই বেরিয়েছে।
অ্যাডর্নের মতো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা সারা বছর নতুন বই নিয়ে সক্রিয় থাকে। যেমন প্রথমা প্রকাশনের নান্দনিক স্টলের ওপরে স্লোগানের মতো করে লেখা ‘প্রথমার বই: সারা বছরের সেরা বই’। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়কারী জাফর আহমদ বলেন, ‘শুধু মেলাকে কেন্দ্র করে নয়, আমরা চাই সারা বছর বই বের করতে, সেরা বইটিই বের করতে।’ তিনি বলেন, গেল বছরের মার্চের ১ তারিখ থেকে এবারের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত সব বইকে নতুন বই হিসেবে ধরা হয়। সে হিসেবে প্রথমা প্রকাশন এবারের মেলায় ৬০টিরও বেশি নতুন বই মেলায় আনছে। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, সাহিত্য প্রকাশ, পাঠক সমাবেশ, ঐতিহ্য, শ্রাবণ, চন্দ্রাবতী একাডেমির প্রতিনিধিরা জানান, তাঁরা সারা বছর নতুন বই প্রকাশের ব্যাপারে সক্রিয়।
ছুটির পর মৌন মেলা
আগের ছুটির দুই দিনের সরগরম পরিবেশের পর গতকাল রোববার মেলা ছিল নিস্তরঙ্গ। বিকেলে লোকসমাগমও ছিল কম। বিক্রিও। তবে সন্ধ্যায় লোকজন বাড়তে থাকে। প্রিয় লেখকের বই খুঁজতে ব্যস্ত ছিলেন অনেকে। তবে পাঠকদের সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা ছিল বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার ক্যাটালগ সংগ্রহের দিকে। কেউবা পত্রিকার পাতায় বিজ্ঞাপন দেখে সংগ্রহ করছেন নতুন বই। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় সাহিত্য প্রকাশের সামনে কথা হয় চিকিৎসক ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে। তিনি বললেন, ভিড়ের কথা চিন্তা করে আগের দুই দিন মেলায় আসা হয়নি। আজ সন্ধ্যায় চেম্বারে না গিয়ে মেলায় চলে এসেছেন। ইচ্ছা আছে দু-একটা নতুন বই কেনা এবং ক্যাটালগ সংগ্রহ। শেষের দিকে এসে বাকি বইগুলো কিনবেন।
এসেছে ২৭টি নতুন বই
মেলার পঞ্চম দিনে নতুন বই এসেছে ২৭টি এবং ৭টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। শহীদকন্যা নুজহাত চৌধুরীর এ লড়াই অনিবার্য ছিল বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি।
প্রথমা প্রকাশন মেলায় এনেছে মোরশেদ শফিউল হাসানের নজরুল জীবনকথা, আনিসুল হকের প্রিয় এই পৃথিবী ছেড়ে, অনন্যা এনেছে মহাদেব সাহার মাটির সম্ভার, বিদ্যাপ্রকাশ এনেছে দন্ত্যস রওশনের ভূত টুত এলিয়েন টেলিয়েন, নালন্দা এনেছে জনপ্রিয় গীতিকার লতিফুর ইসলাম শিবলীর দারবিশ, অন্যপ্রকাশ এনেছে মোস্তফা কামালের রুপবতী, চৈতন্য প্রকাশন এনেছে সুমনকুমার দাশের সাহিত্য সংস্কৃতি স্মৃতি, পার্ল পাবলিকেশনস এনেছে শান্তনু চৌধুরীর অন্য সময়ের প্রেম।
প্রেমের কবিতায়ও আহসান হাবীব অসামান্য
গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘আহসান হাবীব জন্মশতবর্ষ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি তুষার দাশ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অনু হোসেন ও তারেক রেজা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক জুলফিকার মতিন।
আলোচকেরা বলেন, আহসান হাবীব যেমন তাঁর সময়ের সন্তান, তেমনি তিনি সময় থেকে এগিয়েও ছিলেন। দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ক্ষুধা-আশা ইত্যাদি সমসাময়িক অনুষঙ্গ আহসান হাবীব তাঁর কবিতায় বাঙ্ময় করেছেন সুনিপুণ শিল্পদক্ষতায়। প্রেমের কবিতায়ও আহসান হাবীব অসামান্য। ব্যক্তিগত নিবেদনের বৃত্ত ভেদ করে প্রেমের কবিতাকে তিনি নতুন মাত্রা দিয়েছেন।
আজ সোমবার ষষ্ঠ দিনে মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বর্ধমান হাউসের পাশে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এই আয়োজনটি হবে। মেলা ঘুরে ক্লান্ত হয়ে গেলে এখানে বসে নিজেকে ঋদ্ধ করা যেতে পারে।