
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২০১০ সালের অধিবেশনে পানি ও স্যানিটেশনকে প্রথমবার মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতির প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতি আদায়ে সক্রিয় বাংলাদেশ। এই দুই বিষয়কে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে গঠিত ১১টি দেশের আন্ত-আঞ্চলিক জোট ‘ব্লু গ্রুপের’ও সদস্য বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক পরিসরে এত সরব হলেও দেশে প্রথমবারের মতো যে পানি আইন হলো, সেখানে পানি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। পানি বিশেষজ্ঞ, অধিকারকর্মী ও আইনবিদেরা বলছেন, এভাবে মূলত পানির ওপর মানুষের অধিকারের দাবিকে পাশ কাটিয়েছে সরকার। আইনটির একাধিক ধারা বিশ্লেষণ করে তাঁরা এও বলছেন, আইনটি পানির ওপর স্থানীয় মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের অধিকারকে খর্ব করার পাশাপাশি ভীষণভাবে এককেন্দ্রিকতাকে উৎসাহিত করবে। আইনটির বিভিন্ন ধারা নিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির একাধিক সদস্য এবং সংসদে কেবল স্বতন্ত্র সাংসদ ফজলুল আজিম আপত্তি তুলেছিলেন।
সাতটি অধ্যায় এবং ৪৭টি ধারাসংবলিত ‘বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩’ গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হয়। জাতীয় পানি নীতি, ১৯৯৯ বাস্তবায়নের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় আইনটি তৈরি করে। প্রাথমিকভাবে মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) এই আইন তৈরির দায়িত্বে ছিল।
বর্তমান আইনে পানিকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি না দিলেও জাতীয় পানি নীতি, ১৯৯৯-এ পানিকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আবার পানি আইন, ২০১২-এর খসড়ায়ও পানি মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি পায়।
বিষয়টি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুপেয় পানি পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক মানুষের মানবাধিকার। আইনে এর অনুপস্থিতি পুরো আইনটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।’
মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, আমলারা সরকারকে ভয় দেখিয়েছে যে, যদি পানিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে আইনে ঠাঁই দেওয়া হয়, তবে সরকারকে জবাবদিহির মুখে পড়তে হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কামরুন নাহার খান বিষয়টি সম্পর্কে বলেন, ‘সাংসদেরা চাইলেই প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে পারতেন।’
আইনটির বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললেও তাঁরা কেউই নাম প্রকাশ করতে চাননি। পানিকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি না দেওয়া প্রসঙ্গে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা তো মৌলিক অধিকার বটেই। তা আবার লিখে প্রকাশ করার কী দরকার?’ এটা আইনে উল্লেখ থাকলে কী সমস্যা ছিল এই প্রশ্নের জবাবে তাঁর উত্তর, ‘সার্বিক বিচার বিবেচনা করেই আইনটি তৈরি হয়েছে।’
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী বলেন, ‘আমরা দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন ঠিক করার মতো কিছু ভাষাগত ত্রুটি সংশোধন করা ছাড়া আইনের তেমন কোনো পরিবর্তন করিনি।’ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তিনি বলেন, মৌলিক অধিকারের প্রশ্নটি সরাসরি না এলেও এটি প্রকারান্তরে স্বীকার করা হয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটি মন্ত্রিপরিষদ থেকে আইনটির চূড়ান্ত অনুমোদনের পর তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি পর্যালোচনা কমিটি করে। এর সভাপতি এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘আমি মনে করি, পানিকে মৌলিক অধিকার দেওয়া উচিত ছিল, এটা প্রয়োজনীয়। বর্তমান আইনে বেশ কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে। এটার সংশোধনী দরকার।’ এখনই এই সংশোধনীর জন্য চেষ্টা করলেন না কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ট্রেজারি বেঞ্চে বসে খুব বেশি কথা বলা যায় না।’
আইনে নানা অসংগতি: আইনটিতে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে আইনটির উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় পানি পরিষদ এবং পরিষদের কাজ পরিচালনার জন্য পানিসম্পদমন্ত্রীকে সভাপতি করে ২১ সদস্যের নির্বাহী কমিটি করার বিধান রাখা হয়েছে। আইনের জলাধার সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ২২ ধারায় এই নির্বাহী কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জলাধার সংরক্ষণ করার কিংবা সংরক্ষণে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে সুরক্ষার আদেশ দেওয়ার। স্থানীয় জলাধারের জন্য কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সরাসরি ক্ষমতা না দিয়ে এভাবে নির্বাহী কমিটিকে তার দায় দেওয়াকে আইনটি যে ভীষণ কেন্দ্রীভূত, তা-ই প্রমাণ করে বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এখানে বিকেন্দ্রীকরণের কোনো চেষ্টাই নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উপকূলীয় অঞ্চলের মতো সুপেয় পানির সংকটাপন্ন এলাকার স্থানীয় কোনো পানির উৎস নিয়ে যদি কোনো সমস্যা তৈরি হয়, তবে সাতজন সচিব নিয়ে গঠিত নির্বাহী কমিটি কীভাবে দ্রুততার সঙ্গে তার সমাধান দেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটার এইডের বাংলাদেশের প্রধান খায়রুল ইসলাম।
আইনটির অনেক জায়গা অপরিষ্কার—এমনটাই মনে করেন পানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুজিবর রহমান। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, পানির মূল প্রবাহ নদী দিয়ে। কিন্তু বর্তমান আইনে নদীর আলাদা সংজ্ঞা না দিয়ে একে জলাধারের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আইনটি আমাকে নদীর পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা দেয় না। আমাদের অনেক নদী আন্তদেশীয়। নদীর সীমানা, প্রবাহের ধারায় এর আকৃতি কী হবে, তার সঠিক ব্যাখ্যা থাকা দরকার।
আইনে যে নির্বাহী কমিটির উল্লেখ আছে, এর সভা কত দিন পর পর হবে, তা পরিষ্কার করে বলা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে ভয় হলো যে কমিটির সভা নিয়মিত হবে না। আইনে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার বিধান রাখা হয়েছে কিন্তু এই এলাকায় কোন কোন কার্যক্রম করা যাবে না, এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। এই আইনের ধারা লঙ্ঘন করলে জনগণ সরাসরি বিচার দাবি করতে পারবে না। ৩৬ ধারায় বলা হচ্ছে, মহাপরিচালক বা তাঁর মাধ্যমে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির লিখিত অভিযোগ এ ক্ষেত্রে দরকার হবে। আইনটি যে আমলানির্ভর, এটা তারই উদাহরণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।