
অমর একুশে গ্রন্থমেলার দুই অংশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের যেদিকে চোখ যায়, প্রায় সবার বসনেই বাসন্তী আর হলুদের অপূর্ব মিতালি। গতকাল বইমেলাজুড়ে এই দৃশ্যপট বলে গেল কেবল একটি কথাই, ‘বসন্ত এসে গেছে’। আর বইয়ের বিকিকিনি বাড়ার মধ্য দিয়ে এই উৎসবের রং আরও খোলতাই হয়েছে আজকের ‘ভালোবাসা দিবস’কে সামনে রেখে।
প্রথম বসন্তের বিকেলে মিরপুর থেকে মেলায় এসেছেন মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিতে কর্মরত তরুণ দম্পতি রাজিয়া সুলতানা ও জাহাঙ্গীর আলম। একটি স্টলের সামনের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে রাজিয়ার ছবি তুলছেন জাহাঙ্গীর। সেই ছবিতে ধরা পড়ল রাজিয়ার হাতে থাকা বইটিও—হুুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি অমনিবাস। কথার একপর্যায়ে রাজিয়া বললেন, ‘আমার স্বামী
জাহাঙ্গীর হু্মায়ূন-ভক্ত। তাই আমার পক্ষ থেকে এই বইটি ওর জন্য বসন্তের উপহার, ভালোবাসা দিবসের উপহারও বটে।’
রাজিয়া-জাহাঙ্গীরের মতো অজস্র প্রাণবন্ত তরুণ-তরুণীর কলরবে মাতোয়ারা বইমেলা। তাঁদের উচ্ছ্বাস ছুঁয়ে গেল মাঝবয়সী মাসুদা রহমানকেও। মৌলভীবাজারের শাহ মোস্তফা কলেজের বাংলার এই অধ্যাপক এ বছরই প্রথম এসেছেন মেলায়। সাহিত্য প্রকাশের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘এই সব ছেলেমেয়েকে দেখলে ভালো লাগে। আমাদের অতীত মনে পড়ে যায়।’
গতকালও ছিল শিশুপ্রহর। ফলে মেলার দ্বার উন্মোচিত হয় বেলা ১১টায়। তবে পয়লা বসন্ত ও ভালোবাসা দিবস দিন দুটির উপলক্ষ সামনে রেখে বিকেল থেকেই বাড়তে থাকে ভিড়। কিন্তু শেষ বিকেল থেকে মেলার দুই অংশে যে বিপুল জনসমাগম। এঁদের একজন গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে পড়ুয়া আফসানা মীম। ‘আজ বই দেখবেন, না কিনবেন?’—প্রশ্নটি করতেই চঞ্চল হয়ে উঠল মীমের চোখ, ‘একটি বই আজ কিনতেই হবে—আনিসুল হকের জেনারেল ও নারীরা। কাল এটি একজনকে উপহার দেব। না দিলে রক্তারক্তি ঘটে যাবে! হা হা হা।’
বসন্ত আর ভালোবাসা দিবসের দুই উৎসব নিয়ে প্রকাশক ও বিক্রেতাদের মুখের হাসিটিও ছিল বেশ প্রশস্ত। প্রথমা প্রকাশনের বিক্রয় ব্যবস্থাপক জহির উদ্দিন বাবর যেমন বললেন, ‘বিভিন্ন বয়সী ক্রেতার পাশাপাশি আজ আমাদের স্টলে তরুণদের ভিড় অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি। আমরা আজ আনিসুল হকের জেনারেল ও নারীরা উপন্যাসটি বাজারে এনেছি। এটি গড়ে উঠেছে পাকিস্তানি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের অসংখ্য প্রেমকাহিনিকে কেন্দ্র করে। এই বই ঘিরে তরুণদের আগ্রহও আশাব্যঞ্জক।’ গতিধারার বিক্রয়কর্মী আহমেদ রাজুও বললেন, ‘আজকের দিনটায় বিক্রিবাট্টা বেশ ভালো হবে।’
গতকাল একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষেÿহলো অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হরিশংকর জলদাসের উপন্যাস একলব্যর প্রকাশনা উৎসব। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। আলোচনা করেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও ইমদাদুল হক মিলন। স্বাগত বক্তব্য দেন অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম।
মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে একসঙ্গে উন্মোচিত হলো ১৮টি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিভিত্তিক বইয়ের মোড়ক। যার আয়োজক বাংলাদেশ সায়েন্স ফিকশন সোসাইটি। বইগুলোর মোড়ক উন্মোচন করেন জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সোসাইটির সভাপতি মোশতাক আহমেদ।
একাডেমির তথ্যমতে, গতকাল মেলায় এসেছে ১৩৫টি নতুন বই। গতকাল মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধচর্চা: অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ পড়েন অধ্যাপক মেসবাহ কামাল। আলোচনা করেন সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, মোহাম্মদ সেলিম ও দিব্যদ্যুতি সরকার। সভাপতি অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা। এর আগে সকালে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। সন্ধ্যায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
মেলায় প্রথমা প্রকাশন এনেছে সাদত হাসান মান্টোর টোবাটেক সিং ও অন্যান্য গল্প ও সুমনকুমার দাশের শাহ আবদুল করিম: জীবন ও গান। চৈতন্য এনেছে কবি মোহাম্মদ রফিকের কাব্যগ্রন্থ পূর্বাহ্ণে সামগান। অঙ্কুর প্রকাশনী এনেছে স্যমবেন উসমানের অভিশাপ। অনুবাদ আর সম্পাদনা করেছেন উজ্জ্বল ভট্টাচার্য ও কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়। ইত্যাদি প্রকাশন এনেছে রাজীব সরকারের ইউরোপের পথে পথে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে এনেছে মোকারম হোসেনের গাছ চেনা ফুল চেনা। কথাপ্রকাশ এনেছে সৈকত হাবীব ও মোকারম হোসেন সম্পাদিত প্রকৃতিপুত্র দ্বিজেন শর্মা। মামুনুর রশীদের জ্যোৎস্নার প্রপাতে অবিরাম নৃত্য এনেছে দিব্যপ্রকাশ। আল আমীন চৌধুরীর মুক্তিযুদ্ধ ও সমকালীন রাজনীতি এনেছে ইত্যাদি।