বিটিভির চার কর্মকর্তাকে অপহরণ করে হত্যা এবং লাশ গুম করার মামলা সচল করতে রাষ্ট্রপক্ষের তৎপরতা নেই। ১৯৭৫ সালে বিটিভির চার কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। ৪২ বছরেও মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশে ২০০৫ সাল থেকে মামলার কার্যক্রম থেমে আছে। সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে মামলাটি সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন মামলাটির নিষ্পত্তির ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট আদালতের সরকারি কৌঁসুলি মো. শাহাবুদ্দিন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, মামলাটি হাইকোর্টের আদেশের স্থগিত আছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের কী করার আছে। আদালত থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সচল করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ঢাকার মহানগরের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আবু আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলাটি সচল করার দায়িত্ব অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের, আমাদের নয়।’
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার ২৪ বছর পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত শেষে ১৯৯৯ সালের ১৮ আগস্ট তিন সেনাসদস্যসহ নয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। মামলাটির তদন্ত করেন সিআইডির তখনকার সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল করিম খান। ২০০২ সালের ৩ আগস্ট মামলাটি বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়। এই আদালত পরের বছরের ১৬ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্য নেওয়ার জন্য তারিখ ধার্য করেন। এর পরের বছর ১৯ মে নিহত মনিরুল আলমের নিকটাত্মীয় মুহাম্মদ আলী স্বপনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এরপর আর কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি।
প্রথমে ডিবি পুলিশ খুনিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নামমাত্র তদন্ত করে ১৯৭৮ সালের ৯ জানুয়ারি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এরপর ১৮ বছর ধরে মামলার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন। পরে নিহত আকমলের স্ত্রী মনোয়ারা আকমল প্রধানমন্ত্রীর কাছে মামলা পুনরুজ্জীবিত করার আবেদন করেন। ১৯৯৭ সালের ২৫ মার্চ আদালত আবেদনটি গ্রহণ করলে মামলার কার্যক্রম আবার শুরু হয়।
মামলার নথিতে দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের ২০ জানুয়ারি মামলাটির অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ১৯৯৭ সালের ২৫ মার্চ আদালত মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করেন। সিআইডি আসামি আলতাফ হোসেন, আবুল কাশেম বাগোজা, আবদুল আওয়াল, লুত্ফর রহমান ও আইনুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মধ্যে আলতাফ ও কাশেম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। উদ্ধার করা তিনটি কঙ্কালের ময়নাতদন্ত করা হয়। কঙ্কালের সঙ্গে থাকা পরনের কাপড় সংরক্ষণ করা হয়।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হচ্ছেন বিটিভির তত্কালীন সহকারী পরিচালক (এডি) আবুল কাশেম বাগোজা ও আবদুল আওয়াল সরকার, বিটিভির ১ নম্বর গ্রেডের প্রযোজক লুত্ফর রহমান তালুকদার, অধিবেশন নিয়ন্ত্রক সৈয়দ আইনুল কবির, সে সময় বিটিভিতে কর্মরত কর্মকর্তা আইনুজ্জামান, সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অনারারি লেফটেন্যান্ট আলতাফ হোসেন, ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সদস্য কে এ এম জাকারিয়া হায়দার ও শাহজাহান সিরাজী। ২০০৪ সালে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি আবুল কাশেম বাগোজা, আবদুল আওয়াল সরকার ও লুত্ফর রহমান তালুকদার তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন (কোয়াশমেন্ট) করেন। পরের বছরের ১৭ এপ্রিল হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ওই তিনজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আদেশ দেন। আসামি আইনুজ্জামান মারা যাওয়ায় ২০০৪ সালের ১০ মার্চ তাঁকে মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
মামলার বিবরণ থেকে জানা গেছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর বিটিভি ভবনসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে সেনা মোতায়েন করা হয়।
এ সময় বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে বিটিভির কর্মচারী কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে আন্দোলন চলছিল। এ নিয়ে বিটিভি কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারী সমিতির মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ নিরসনে গোপন বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বিটিভির অনুষ্ঠান পরিচালক এ এফ এম সিদ্দিকী, মুখ্য হিসাবরক্ষক আকমল হোসেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ও সহকারী ক্যামেরাম্যান ফিরোজ কাইয়ুমকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। পরে নিহত চারজনের লাশ গুম করার জন্য বিটিভি ভবনের পেছনের ঝিলে ফেলে দেওয়া হয়। পরের বছর ১৯৭৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনটি কঙ্কাল উদ্ধার করে তা শনাক্ত করা হয়। নিহত চারজনের স্ত্রীরা ১৯৭৫ সালের ১৯ নভেম্বর গুলশান থানায় পৃথক চারটি মামলা করেছিলেন (পরে যা একটি মামলায় একীভূত হয়)। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দেওয়ার জন্য চারটি মামলাতেই পুলিশ প্রথমে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল।