ঢাকার কাঠামো পরিকল্পনার খসড়া

বিনোদনের জায়গা তিন বর্গফুট

রাজধানীতে প্রতি এক হাজার মানুষের বিনোদনের জন্য উন্মুক্ত জায়গা আছে দশমিক শূন্য ৭ একর। বর্গফুটের হিসাবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৫০। অর্থাৎ জনপ্রতি বিনোদনের জন্য উন্মুক্ত জায়গা আছে মাত্র তিন বর্গফুট। ১৯৯৫ সালে প্রণীত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অনুযায়ী বিনোদনের জন্য উন্মুক্ত জায়গা থাকার কথা দশমিক ৯৬ একর। ভবিষ্যতের খসড়া ঢাকা কাঠামো পরিকল্পনায় তা দশমিক ৮৬ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাজউক ভবনে আয়োজিত ঢাকার কাঠামো পরিকল্পনার খসড়া নিয়ে আয়োজিত সেমিনারের দ্বিতীয় ও শেষ দিনে ‘বিনোদন, জীবনধারণ ও অস্তিত্বের জন্য উন্মুক্ত জায়গা রক্ষা’ শীর্ষক প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ ফরিদা নিলুফার প্রবন্ধ দুটি উপস্থাপন করেন।
প্রবন্ধে বলা হয়, ঢাকার বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে থাকা মোট উন্মুক্ত জায়গার পরিমাণ ৪৮০ একর। গণপূর্ত বিভাগের কাছে আছে ৩০২ দশমিক ৫ একর, দুই সিটি করপোরেশনের কাছে ৮৫ দশমিক ২৫ একর আর জাতীয় চিড়িয়াখানা ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান মিলিয়ে আছে ৮৬ দশমিক ৩৩ একর। উন্মুক্ত জায়গার মধ্যে আছে পার্ক, খেলার মাঠ, প্রাকৃতিক উদ্যান ও পথচারীদের বিশ্রামের জায়গা।
প্রবন্ধে ঢাকায় উন্মুক্ত জায়গা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অবৈধ দখল ও ভরাটের কারণে প্রাকৃতিক জলাশয় হারিয়ে যাওয়া, উন্মুক্ত স্থান রক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়া, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ব্যবস্থাপনার অভাব, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণে যেসব পরিকল্পনা আছে সেগুলো বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যর্থতাকে দায়ী করা হয়।
রাজউকের সাবেক নগর পরিকল্পনাবিদ গোলাম হাফিজ বলেন, রাজউকের দুর্বলতা হচ্ছে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, তা তাদের নেই। এ কারণে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (১৯৯৫-২০১৫) সম্পর্কে প্রবন্ধে বলা হয়, ড্যাপে প্রতি সাড়ে ১২ হাজার মানুষের জন্য দুই একর উন্মুক্ত জায়গা রাখার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু মূল ঢাকায় এই পরিমাণ উন্মুক্ত জায়গা নেই। তাই শহরের কাঠামো, ঘনত্ব ও প্রাপ্যতার ভিত্তিতে এবং ঘর থেকে সম্ভাব্য দূরত্বের বিষয় বিবেচনা করে নতুন পরিকল্পনা নিতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সারওয়ার জাহান বলেন, রাজউকের পক্ষে পরিকল্পনা তৈরির চেয়ে আর বেশি কিছু করা সম্ভব নয়।
খসড়া কাঠামো পরিকল্পনায় শহর এলাকার সম্ভাব্য উন্মুক্ত জায়গা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণের পরিকল্পনা, উন্মুক্ত জায়গাগুলোর মধ্যে একটি সংযোগ গড়ে তোলা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণে পৃথক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে প্রবন্ধে বলা হয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক আখতার মাহমুদ প্রবন্ধ দুটির পর্যালোচনা করেন। তিনি বলেন, মূল ঢাকায় যে পরিমাণ উন্মুক্ত জায়গা থাকার কথা, তা নেই। অথচ প্রবন্ধে মূল ঢাকায় কীভাবে উন্মুক্ত জায়গা করা যাবে, সেটা নিয়ে দুর্বলতা রয়ে গেছে। সমস্যা যেখানে বেশি, সেখানে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল।
আকতার মাহমুদ বলেন, পরিকল্পনায় শুধু উন্মুক্ত জায়গা থাকলে হবে না, সেখানে জনগণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আর এই কাজগুলো কারা করবে, পরিকল্পনায় সেটা আগে পরিষ্কার করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হাবিব বলেন, সময় নিয়ে স্তরে স্তরে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করতে হবে। তার আগে এটি চূড়ান্ত করার চিন্তাও আপনারা (রাজউক কর্তৃপক্ষ) করবেন না।