
শেয়ারবাজার ধসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সুদ মওকুফের সুবিধা কার্যকর করতে অবশেষে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করা হচ্ছে। এই তহবিলে বাংলাদেশ ব্যাংক তিন ধাপে ৯০০ কোটি টাকা জোগান দেবে। গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় তহবিলটির অর্থায়ন বিষয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তহবিল গঠনের বিষয়ে এই উপায় উদ্ভাবন করা হয়েছে। প্রতিবছর সরকারকে দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফার অংশ থেকেই এই অর্থ সরবরাহ করা হবে। আর তহবিলটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। তহবিলটি কীভাবে পরিচালিত হবে, তা পরে সরকার নির্ধারণ করবে।জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, শেয়ারবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সুদ মওকুফ-সুবিধা কার্যকর করতে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠনের বিষয়ে একটি উপায় উদ্ভাবনের কথা বলেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অর্থনীতি, টাকার সরবরাহ, মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় এই তহবিল গঠনে অর্থ জোগানের বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের কথা সরকারকে অবহিত করা হবে। সরকারই পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।জানা গেছে, সুদ মওকুফ-সুবিধা কার্যকর করতে বিশেষ পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠনের জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ‘উপায় উদ্ভাবনের’ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠায়।বিএসইসির প্রস্তাবে, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর জন্য প্রায় এক হাজার ৫৪৫ কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠনের কথা বলা হয়। তবে আইসিবি, অগ্রণী ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট ও জনতা ক্যাপিটাল এরই মধ্যে ৩০৮ কোটি টাকা ব্যয় করে সুদ মওকুফের সুবিধা বাস্তবায়ন করায় আপাতত এই তহবিলের জন্য এক হাজার ২৩৬ কোটি টাকা প্রয়োজন দেখা দেয়।
বিএসইসি তিন বছরের জন্য এ ধরনের তহবিল গঠনের কথা বলে। এই তহবিল থেকে ১০ শতাংশ সুদে ঋণ-সুবিধা পাবে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো। তিন বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো সুদসহ অর্থায়নের পুরো টাকা ফেরত দেবে।
সুদ মওকুফ-সুবিধা বাস্তবায়নের একটি তালিকা করে দিয়েছিল এ-সংক্রান্ত বিশেষ স্কিম কমিটি। ওই তালিকার ভিত্তিতে বিএসইসি সুদ মওকুফের বিষয়ে তাদের সুপারিশ তৈরি করে।
তালিকা অনুযায়ী, দুই স্টক এক্সচেঞ্জের ২৮৮ ব্রোকারেজ হাউসকে সুদ মওকুফ-সুবিধা কার্যকর করতে হলে প্রায় ৬৩২ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিল করতে হবে। এসব ঋণের বিপরীতে সুদ মওকুফ করতে হবে (এক বছরের সুদের ৫০ শতাংশ) প্রায় ৫১ কোটি টাকা। বাকি আরও ৫১ কোটি টাকা সুদও পুনঃ তফসিল করতে হবে।
দুই স্টক এক্সচেঞ্জের ২৮৮টি ব্রোকারেজ হাউসে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী রয়েছেন নয় লাখ ১২ হাজার ৩৫৭ জন। এর মধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ২০৯টি ব্রোকারেজ হাউসে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা সাত লাখ ৪৫ হাজার ৯১৪ জন। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ৭৯টি ব্রোকারেজ হাউসে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা এক লাখ ৬৬ হাজার ৪৪৩ জন।
২৮টি মার্চেন্ট ব্যাংকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী রয়েছেন ৪১ হাজার ৪৯২ জন। তাঁদের সুদ মওকুফ-সুবিধা কার্যকর করতে হলে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে প্রায় ৯১৪ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিল করতে হবে। সুদ মওকুফ করতে হবে ৬৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি সমপরিমাণ সুদও পুনঃ তফসিল করতে হবে।তালিকার হিসাব অনুযায়ী, সুদ ও ঋণ মিলিয়ে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে মোট এক হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা পুনঃ তফসিল করতে হবে।
শেয়ারবাজার ধসের পর ২০১২ সালের মার্চে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ স্কিম ঘোষণা করা হয়। তাতে শেয়ারে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত যাঁরা নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, তাঁদের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁদের মধ্যে যাঁরা ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের ঋণের এক বছরের সুদের ৫০ শতাংশ মওকুফের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে প্রধান করে একটি স্কিম প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছিল।