
অভাবের সংসারে তিন বেলা ভাত জোটানোই কঠিন। তাই শিউলি আক্তারকে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর বাবা বিয়ে দিয়ে দেন। শ্বশুরবাড়িতে শিউলিকে পড়াশোনা বন্ধের চাপ দেওয়া হয়, তবে সমর্থন ছিল স্বামীর। একপর্যায়ে তাঁদের দুজনকেই বাড়ি ছাড়তে হয়। অভাব-অনটনের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সেই শিউলি আক্তার চলতি মাসে চিকিৎসাবিদ্যায় এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ।
প্রথম আলো: আপনার এমবিবিএস পাসের খবরটি প্রথম কাকে দিয়েছেন?
শিউলি: স্বামীকে। আমি যে মেডিকেল কলেজে (বারিন্দ মেডিকেল কলেজ) পড়েছি, স্বামী সেখানকার কর্মচারী। তিনি সব সময় আমার পাশে থেকেছেন।
প্রথম আলো: চিকিৎসা পেশায় আগামী মঙ্গলবার থেকে আপনার শিক্ষানবিশকাল (ইন্টার্নশিপ) শুরু হচ্ছে। কেমন লাগছে?
শিউলি: অনেক ভালো।
প্রথম আলো: ইন্টার্নশিপ শুরু হলে তো কলেজ থেকে ভাতা পাবেন। প্রথম মাসের ভাতার টাকা কী করবেন?
শিউলি: আমার মায়ের হাতে তুলে দেব। বাবা তো দেখে যেতে পারলেন না।
প্রথম আলো: আপনার যেসব সহপাঠী আপনাকে গ্রুপে (দলগত পাঠ) নেয়নি, তাঁরা এখন কী বলছেন?
শিউলি: কয়েক জন আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। কেউ কেউ আমাকে নিয়ে নিউজ (গণমাধ্যমে প্রতিবেদন) হয়েছে শুনে হাসি-তামাশা করেছেন।
প্রথম আলো: জীবনে সবচেয়ে দুঃসময় মনে করেন কোন সময়টাকে?
শিউলি: যখন আমার ব্যাচের শিক্ষার্থীরা আমাকে এড়িয়ে চলত এবং কটু কথা বলত, সেই সময় খুব খারাপ লাগত। আমার পাশে কেউ বসত না। এর কারণ আমি গরিব, আমার স্বামী ওই কলেজের একজন কর্মচারী। আমি বাসায় গিয়ে কাঁদতাম। আমার কান্না সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ বাবাও কাঁদতেন। বাবা বলতেন, ‘মা, তুই একদিন বড় ডাক্তার হবি’। ২০২০ সালের ৩১ মে বাবা মারা যান।
প্রথম আলো: অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়ার ১৫ দিনের মাথায় আপনি ক্লাসে যোগ দেন। কীভাবে?
শিউলি: পেটে বেল্ট বেঁধে ক্লাস করেছি। কারণ, আমি মনে করেছি, আমাকে পাস করতেই হবে। ডাক্তার হতেই হবে।
প্রথম আলো: চিকিৎসাবিদ্যায় পড়াশোনা করা অনেক ব্যয়বহুল। কে সহায়তা করেছিল?
শিউলি: বারিন্দ মেডিকেল কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামসুদ্দিন। তিনি ভর্তির ব্যবস্থা করেছেন। পড়ার খরচ জুগিয়েছেন। তিনি শুধু আমাকে পড়াশোনা করাননি, শিখিয়েছেন কীভাবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। আমি তাঁর প্রতি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।
প্রথম আলো: এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কী আপনাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে?
শিউলি: আমার মা–বাবার চোখের পানি।
প্রথম আলো: যদি জানতে চাই পেশাজীবনে কোন তিনটি নীতি মেনে চলবেন, আপনার উত্তর কী হবে?
শিউলি: এক. সৎভাবে আয় করতে চাই। দুই. আমার মতো অসহায়, দরিদ্র ও মেধাবীদের সাধ্যমতো সহায়তা করব। তিন. আমার বাবার বাড়ির এলাকায় মাসে অন্তত এক দিন বিনা মূল্যে মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেব।
প্রথম আলো: আপনার স্বামীও তো আপনার উৎসাহে এখন পড়াশোনা করছেন।
শিউলি: তিনি এখন স্নাতক শেষ বর্ষে পড়ছেন।
প্রথম আলো: একটা শখের কথা বলুন, যা পূরণ করতে পারেননি, এখন করবেন।
শিউলি: আমার ছেলে পাড়ার শিশুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে একবার বলেছিল, ‘মা, ডাক্তার হলে আমরা গরুর মাংস কিনে খাব।’ এ কথা শুনে প্রতিবেশী এক চাচি একদিন এক বাটি মাংস দিয়ে যান। নিজে রোজগার শুরু করলে নিজের টাকা দিয়ে ছেলের জন্য গরুর মাংস কিনব।