জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আফতাব আহমাদ হত্যা মামলার তদন্ত ১০ বছরেও শেষ হয়নি। এ ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন শীর্ষ সন্ত্রাসী তানভীরুল ইসলাম জয় ভারতে পলাতক। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার অপেক্ষায় আছে মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডি সূত্র বলছে, ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল হাসান ইমনের জবানবন্দির ভিত্তিতে তাদের সন্দেহ, হাওয়া ভবনের অর্থায়নে তানভীরুল লোকজন দিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন। তবে ইমনের ওই জবানবন্দি গত ১০ বছরেও যাচাই করা হয়নি, জবানবন্দিতে নাম আসা সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি। ১১ জন তদন্ত কর্মকর্তা বদল হলেও তদন্ত তেমন এগোয়নি। তদন্ত শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক আফতাবের কয়েকজন সহকর্মী ও প্রক্তন ছাত্ররা।
মামলার বাদী অধ্যাপক আফতাবের স্ত্রী নূরজাহান আফতাব মারা গেছেন। আফতাবের সাবেক সহকর্মী বা ছাত্রদের কেউই এ নিয়ে আগ্রহ দেখাননি। তাঁর দুই সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা কিছু বলতে চাননি। তবে বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা একজন সহকর্মী বলেন, ‘আফতাব সাহেব তৎকালীন বিএনপি সরকারের প্রিয়ভাজন ছিলেন। বিএনপির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে তাঁর দহরম-মহরম ছিল। তাঁরাই তো এটা উদ্ঘাটন করে যেতে পারতেন।’
২০০৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে আটটার দিকে ফুলার রোডে বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারের চতুর্থ তলায় নিজ বাসায় অধ্যাপক আফতাবকে গুলি করা হয়। সেদিন কলবেলের শব্দে গৃহকর্মী দরজা খুলে দিলে জিন্স প্যান্ট ও মাথায় ক্যাপ পরা একজন দ্রুত ভেতরে ঢুকে তাঁকে তিনটি গুলি করে পালিয়ে যান। তাঁর এক সহযোগী ছিলেন সিঁড়ির নিচে। তিন দিন পর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অধ্যাপক আফতাব মারা যান। তাঁর স্ত্রী শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন।
দায় স্বীকার ও জবানবন্দি
এই হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন পর ভারত থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো ফ্যাক্স বার্তায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তানভীরুল ইসলাম জয়ের নামে হত্যার দায় স্বীকার করা হয়। গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিতও হয়। তবে এভাবে দায় স্বীকারের ঘটনায় মানুষের মনে সন্দেহ বাড়ে।
সিআইডির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করেও রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি। অবশ্য ভারত থেকে ফেরত আনা শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ২০০৮ সালে এ হত্যার ঘটনায় নিজেকে না জড়িয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে ইমন বলেছেন, তিনি ভারতে অবস্থানকালে তানভীরুলের সহযোগী কাঁকন ও ল্যাংড়া তাজগীর তাঁকে বলেছিলেন, তানভীরুল ও তাঁর লোক আবলান, রফিক, এতিম বেলাল, খোকন ও মাহবুব ড. আফতাব হত্যায় যুক্ত। আবলান, রফিক ও এতিম বেলাল বাসায় গিয়ে আফতাবকে গুলি করেন। হত্যাকাণ্ডের জন্য তাঁরা হাওয়া ভবন থেকে মফিদুল ইসলাম তৃপ্তির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা পেয়েছিলেন। আরেক সন্ত্রাসী সোয়েব সাইফ ডিকন ও তানভীরুলের একজন ক্যাশিয়ার এই লেনদেন সম্পন্ন করেন।
তদন্ত নিয়ে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইমনের জবানবন্দিতে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের মধ্যে তানভীরুল এখনো ভারতে পলাতক। খোকন ২০০৬ সালে রমনায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন, আবলান ২০০৮ সালের নভেম্বরে মোহাম্মদপুরে খুন হন। রফিক, এতিম বেলাল ও মাহাবুবের পুরো ঠিকানা পাওয়া যায়নি। ২০০৮ সালের আগেই সোয়েব সাইফ এবং আরও দুই সন্দেহভাজন হুমায়ুন কবীর মুন্না ও সালেহ আহম্মদ সুজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তাঁরা এ বিষয়ে তেমন কিছু বলেননি। তাঁরা বর্তমানে জামিনে আছেন।
তবে বিএনপির নেতা ও সাবেক সাংসদ মফিদুল ইসলাম তৃপ্তির কাছে এ বিষয়ে পুলিশ কিছু জানতে চায়নি। যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অধ্যাপক আফতাব
হত্যার সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার কথা এই প্রতিবেদকের কাছেই জীবনে প্রথম শুনলেন। এ বিষয়ে কখনো পুলিশের কোনো সংস্থাই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। জবানবন্দিতে যেসব তথ্য এসেছে, তা আদৌ সত্য নয়।
মামলাটির বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম তালুকদার বলেন, মাসখানেক আগে তিনি মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান। এরপর কিছু তথ্য জানার জন্য বাদীপক্ষের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন মনে করেন। তবে চেষ্টা করেও কাউকে পাননি। বাদী নূরজাহান আফতাব দুই বছর আগে মারা গেছেন। তিনি যোগাযোগের জন্য পরিবারের কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না।
সিআইডির কর্মকর্তারা বলেন, এখন তানভীরুলকে দেশে ফিরিয়ে এনে মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।
নথিতে এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে বিভিন্ন সময় বাদী নূরজাহান আফতাবের দেওয়া বক্তব্যও রয়েছে। বাদী বলেছেন, তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে সন্দেহ করেন না। তবে ড. আফতাব বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টক শোতে অংশ নিতেন এবং দেশের বিভিন্ন বিষয়ের প্রত্যক্ষ সমালোচনা করতেন। হত্যার কিছুদিন আগে তিনি একটি নাগরিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, তাতেও কিছু রাজনৈতিক নেতা ক্ষুব্ধ হতে পারেন।
সিআইডির অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক আবদুল কাহার আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, মামলার তদন্ত নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে সম্প্রতি তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন।