শেরেবাংলা, ৪৮টি আম ও যুগে যুগে ভক্তরা

অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের খাদ্যরসিকতার গল্প এ তল্লাটে কারও অজানা নয়। একবার নাকি তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে খেতে খেতে ৪৮টি ফজলি আম খেয়ে ফেলেছিলেন। এই সংখ্যা কারও মতে ৫০, কারও মতে আরও একটু বেশি; সর্বোচ্চ ৬৭টির কথা শোনা যায়। ভাগ্যিস, সে সময় ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। যদিও শেরেবাংলার আত্মজীবনীকার বি ডি হাবীবুল্লাহ এমন কোনো তথ্যের কথা উল্লেখ করেননি।


গল্পটি শোনা পাখি ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক শরীফ খানের কাছে। সালটা ১৯৬৯। মাওলানা ভাসানী গেছেন বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার তারামাতিয়া মাদ্রাসা মাঠে ন্যাপের জনসভায়। বিকেলে জনসভা শেষ করে ট্রেনে উঠে চলে গেলেন বাগেরহাট সদরে। আতিথ্য গ্রহণ করলেন গোরাই মিয়ার (শেখ আমজাদ আলী, ভাসানী-ন্যাপের তৎকালীন বাগেরহাট মহকুমা প্রধান) বাড়িতে। নানা পদের মাংসের আয়োজন হয়েছিল। ভাসানী একটা পাতিহাঁস পুরো সাবাড় করলেন। এরপর সামনে দেওয়া হলো এক ঝাঁকা দেশি আম।

শরীফ খানের ভাষ্য, ‘আমি তখন বাগেরহাট পিসি কলেজে পড়ি ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে। আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ওই জনসভায়। ভাসানী বাগেরহাটের আমের খুব প্রশংসা করলেন। আমরা ছোটরা যেভাবে আম চুষে চুষে খাই, সেভাবে ১৪ কি ১৫টা আম খেলেন মাওলানা। এরপর দুহাত তুলে মোনাজাত করলেন।’
বেশি আম খেতে পারা মানুষের অভাব এই বাংলায় অন্তত নেই। একটা সময় ছিল যখন এসব খাদককে উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো।



‘আইলা রে নয়া দামান
আসমানেরও তেরা
বিছানা বিছাইয়া দিলাম
শাইল ধানের নেরা
দামান্দ বও দামান্দ বও।’
নয়া জামাইয়ের আদর ও কদর বাংলার সংস্কৃতিতে চিরন্তন। ‘জামাইষষ্ঠী’ পার্বণ তাই হয় জ্যৈষ্ঠে। আর ফলের রাজা আমকে ঘিরেই যে জামাইষষ্ঠীর আয়োজন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তবে জামাই নয়া হোক আর বাসি হোক, যেনতেন আম জামাইকে খাওয়ালে চলে না। দরকার বাছাই করা সেরা আম। অন্তত সেকালের সাহিত্যে তেমন চিত্রই পাওয়া যায়। কল্যাণী দত্তের ‘থোড় বড়ি খাড়া’ বইয়ে উঠে এসেছে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের বাংলার নারীদের জীবন ও সংস্কৃতি। ‘আম’ নিবন্ধে আম খাওয়া ও খাওয়ানোর গল্প করেছেন লেখিকা, ‘নিজের কিংবা বন্ধুর বাগানের সরেস আম জালতি দিয়ে পাড়িয়ে ঘরে এনে পাতার শয্যায় শুইয়ে পাশ ফিরিয়ে ফিরিয়ে তোয়ের করা হতো। তুলোয় মোড়া চালানি আম থাকত শুধু জামাই মার্কা কুটুমদের জন্য।’
আম কাটার ক্ষেত্রেও ছিল কিছু নিয়মকানুন। যেনতেনভাবে কাটলে চলত না। ‘লোহার ছুরি-বঁটি দিয়ে কাটলে আমে দাগ ধরে, আর সোয়াদ নষ্ট হয়ে যায়। তাই, জামাইয়ের জন্য বাছাই আম মায়েরা কাটতেন বাঁখারি কিংবা তাল-নারকোলের বালদোর ছুরি দিয়ে।’ অনেকে আবার একেক জাতের ভালো আম কাটার জন্য আলাদা আলাদা বঁটির ব্যবস্থা রাখতেন। ‘প্রত্যেকবার আম কোটার পর ধুয়েপুঁছে বঁটি লুকিয়ে রাখতেন, পাছে আবার তা দিয়ে অন্য ফল কাটা হয়!’

এর আগে পিতলের বালতি কিংবা গামলায় ঘণ্টাভর ভিজিয়ে রাখা হতো আম। আবার ভালো আম ১০-১২টির বেশি এক পাত্রে থাকলে আঠা ছাড়ত না। কল্যাণী দত্ত জানাচ্ছেন, মুর্শিদাবাদের ভুবনভোলানো, তুলোয় মোড়ানো দুর্লভ আম ‘কহিতুর’ ক্বচিৎ আসত—যাদের গায়ে কালি দিয়ে নাম আর খাওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ লেখা থাকত।
বাংলার কবি-সাহিত্যিকেরা কতটা ‘রামভক্ত’ ছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, তবে ‘আমভক্ত’ যে ছিলেন, তা নিয়ে নিঃসংশয় থাকা যায়। বিভিন্ন বই ও পুরোনো লেখাপত্রে এসব নিয়ে বেশ তথ্য-গল্প পাওয়া যায়। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র রায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, লেখক-সম্পাদক পাঁচকড়ি বাড়ুজ্জে আম খেতে ও খাওয়াতে ভালোবাসতেন।

ভোজনরসিকদের বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন আমের ঝুড়ি। উনিশ শতকে আধুনিক ধারার গীতিকবি দেবেন্দ্রনাথ সেন আমের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে লিখেছেন, ‘মধুর মধুর, যেন পদ্মমধু ভ্রমর ঝঙ্কৃত/ কনকিত পাকা আম নিদাঘের সোহাগে রঞ্জিত।’
উর্দু ভাষার বিশ্বখ্যাত কবি মির্জা গালিব ছিলেন আমের বিশেষ সমঝদার। ভক্তরা সারা ভারত থেকে তাঁর কাছে আম পাঠাতেন। তিনি নাকি সারা জীবনে প্রায় চার হাজার জাতের আম খাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। তাঁকে স্মরণ করে লক্ষ্ণৌ শহরে এখনো আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমী কাব্যানুষ্ঠান, যার নাম ‘আম অউর গালিব’। সারা ভারতের কবি-সাহিত্যিকেরা ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেন।


ছন্দের জাদুকর কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘মধুকুলকুলি’ নামে এক আমের কথা লিখেছিলেন, যা ঠুকরিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল বুলবুলি, দেখতে বড় বড় নারকেলি কুলের মতো। যে আম পরে আর তেমন দেখা যায়নি বলে জানাচ্ছেন কল্যাণী দত্ত।
‘রসাল ও স্বর্ণলতিকা’ কবিতায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত রসাল বলতে আমগাছকে বুঝিয়েছেন। আর ‘মধুমাখা ফল মোর বিখ্যাত ভুবনে/ তুমি কি তা জান না ললনে? এখানে মধুমাখা বলতে বুঝিয়েছেন আমকে।’ ফেলে আসা দিনের কথা স্মরণ করিয়ে কবি জসীমউদ্‌দীন লিখেছেন, ‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ/ পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ।’

কবিগুরু রবি ঠাকুরের কাছে আম ছিল পরম আদরের। তাঁর নানা চিঠিপত্র আর কবিতায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। আমের মৌসুমে কলকাতার জোড়াসাঁকোর বাড়ি ছেড়ে কুমারখালী কিংবা শাহজাদপুরে আসার সময় সঙ্গে আম আনতে ভুলতেন না। ফুরিয়ে গেলে স্ত্রীকে চিঠি লিখতেন। ‘বীথিকা’ কাব্যগ্রন্থের ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতায় কবিগুরু লিখেছেন, ‘বেতের ডালায় রেশমি-রুমাল-টানা, অরুণবরণ আম এনো গোটাকত।’ এমনকি বাংলা সাহিত্যের এই শ্রেষ্ঠ কবি ‘শেষের কবিতা’য় অমিত রায়ের মুখে এনেছেন ফজলি আমের কথা। কবির রচিত আমাদের জাতীয় সংগীতে এসেছে আমের বন, ‘আমের বনে ঘ্রাণে’।

রাজনীতি ও কূটনীতিতেও আছে আমের ব্যবহার। সম্পর্ক যতই বৈরী হোক, ভারত ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীরা একে অপরকে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে আম পাঠিয়ে থাকেন। আবার সুসম্পর্ক ধরে রাখার মোক্ষম হাতিয়ারও যেন রসাল এই ফল। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়া আরশাদ হোসেন ১৯৬৮ সালে গেলেন চীন সফরে। সঙ্গে রাষ্ট্রীয় উপহার হিসেবে ছিল আম। চীনের মহান নেতা মাও সে তুং সে আম ভাগ করে দিলেন সারা দেশে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পেল একটি করে আম। শোনা যায়, প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বড় পাত্রে গরম পানিতে ফুটিয়ে এক চামচ করে সে আম খেয়েছিলেন। প্রতিটি কারখানায় বানানো হয়েছিল আমের রেপ্লিকা, মোম দিয়ে।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু নাকি পাকা আমের মুখ ছিদ্র করে চুষে খেতে খুব পছন্দ করতেন। এই পদ্ধতি তিনি শিখিয়েছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভ ও চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইকে। ক্রুশ্চেভ চেষ্টা করলেও চৌ এন লাই নাকি সে পথে যাননি।


মোগল সম্রাটদের আমপ্রীতির কথা কারও অজানা নয়। জীবনচরিত ‘বাবরনামা’য় বাবর লিখে গেছেন ফলের মধ্যে আমই শ্রেষ্ঠ। সম্রাট জাহাঙ্গীর লিখেছেন, ‘আমি কাবুলের চমৎকারিত্ব ও সৌন্দর্যমহিমা সব উপভোগ ও অনুভব করেছিলাম। তবে কাবুলের ফলরাজি যতই সুস্বাদু হোক না কেন, আমের তুলনায় তা বেশি সুস্বাদু নয়।’
আর সম্রাট আকবর এক লাখ আমগাছের বিশাল বাগান করেছিলেন বিহারের দারভাঙার লাখিবাগে।

আকবরের কথা যখন এল, তখন বীরবল না এসে পারে না। আকবর তাঁর শাহি দরবারে ভোজনসভার আয়োজন করলেন। বড় বড় রাজরাজড়া সে অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পেলেন। বাদ গেলেন না সম্রাটের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন বীরবলও। শয়ে শয়ে পদ, তৃপ্তির সঙ্গে ভোজনপর্ব সমাধা হলো। তবু রয়ে গেল মাংসের কালিয়াসহ কয়েকটি পদ। বীরবল সম্রাটের কাছে বিনয়ের সঙ্গে বললেন, তাঁর পেটে আর ফাঁকা জায়গা নেই। ঠিক তখনই পরিবেশনকারী সুদৃশ্য পাত্রে আম নিয়ে হাজির হলেন। বীরবল টপাটপ কয়েকটি টুকরো গলাধঃকরণ করলেন। বিষয়টি সম্রাটের দৃষ্টি এড়াল না। তিনি বীরবলের দিকে বক্র দৃষ্টি দিতেই এই রসিক রাজা বললেন, ‘মহামান্য সম্রাট যখন রাস্তা দিয়ে কোথাও যেতে শুরু করেন, অমনি যতই ভিড় থাকুক, রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। তেমনি আম হলো ফলের সম্রাট বা রাজা। পেটও সেই রকম আমকে দেখে রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে।’
তবে এরপরও বলতে হবে, ভালো আম চেনা সত্যি শক্ত কাজ। সারা জীবন ঘাঁটাঘাঁটি করেও আম-আদমিরা ঠকে যেতে পারে। তরমুজ, কাঁঠালের মতো ফল যেমন বাইরে থেকে দেখে কিছু মালুম হয় না, আমও খানিকটা তাই। কিছু আম এমন টক যে হাড্ডিতে পর্যন্ত কামড় বসায়। রঙিন, ঝাঁকা আলো করা আমও টক হতে পারে। ‘বর্ণচোরা’ শব্দটির উৎপত্তি হয়তো এখান থেকে!