সড়ক ও সেতুর জন্য টোল আদায়ের নীতিমালা চূড়ান্ত

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে সারা দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক, জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক এবং সেতুতে যানবাহন চলাচলের জন্য টোল আদায়ের নীতিমালা করেছে সরকার। এই টোলের পরিমাণ সর্বনিম্ন পাঁচ টাকা ও সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা। বড় বাস-ট্রাকের পাশাপাশি সাইকেল ব্যবহারের জন্যও টোল দিতে হবে।
সড়ক ও সেতু থেকে আদায় করা টোল সড়ক উন্নয়ন তহবিলে যাবে; যা দিয়ে সড়ক কাঠামোর উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের টোল নীতিমালা সম্পর্কে অবহিত করেন।
পরে যোগাযোগ করা হলে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ এন সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, নতুন করে কোনো সড়ক বা সেতুতে টোল আরোপ করা হবে না। যেসব সড়ক ও সেতুতে টোল আদায় করা হচ্ছে, সেগুলোই এই নীতিমালার আলোকে আদায় করা হবে। তিনি বলেন, নতুন নীতিমালায় ২০০ মিটারের বড় সেতুতেই কেবল টোল আদায় করার কথা বলা হয়েছে। তবে ২০০ মিটারের নিচের যেসব সেতুতে এখন টোল আদায় হচ্ছে, সেগুলো ইজারাদারের সঙ্গে চুক্তি শেষ হলে আর নেওয়া হবে না।
বর্তমানে সড়ক অধিদপ্তরের অধীনে সারা দেশে তিনটি সড়কে টোল আদায় করা হচ্ছে। বিদ্যমান আর কোনো সড়কে টোল আরোপ করা হবে না বলে এম এ এন সিদ্দিক জানান। নতুন করে কোনো সড়ক হলে সে ক্ষেত্রে সরকার টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত নেবে এবং নীতিমালা অনুযায়ী তা আদায় করা হবে।
মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক শেষে মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়কের পাশাপাশি জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক’ নামে আরও একটি শ্রেণী করা হয়েছে। সরকার বিভিন্ন সময় এসব ‘গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক’ নির্ধারণ করবে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ‘বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক’ হিসেবে চিহ্নিত। এসব সড়কের ওভারপাস, উড়ালসেতু (ফ্লাইওভার), সেতু, টানেল, ফেরি ছাড়াও একই ধরনের স্থাপনা টোল নীতিমালার আওতায় আসবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, ২০০ থেকে ৫০০ মিটার, ৫০১ থেকে ৭৫০ মিটার, ৭৫১ থেকে ১০০০ মিটার এবং ১০০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের জন্য আলাদা টোল নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া যেখানে ফেরি আছে সেখানে স্থায়ী সেতু হলে দৈর্ঘ্য যা-ই হোক, কমপক্ষে এক বছরের জন্য তা টোলের আওতায় আসবে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে কোনো সড়ক, সেতু বা এ ধরনের অন্য স্থাপনা হলে তাও টোলের আওতায় আসবে। সেতু ও ফেরির ক্ষেত্রে টোল নির্ধারণে চারটি ‘স্ল্যাব’ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সড়কের ক্ষেত্রে তিন শ্রেণীতে ‘ভিত্তি টোল’ নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলা সড়কের ভিত্তি টোল ধরা হয়েছে ১০০ টাকা। আঞ্চলিক মহাসড়কের ভিত্তি টোল ২০০ টাকা, জাতীয় মহাসড়ক ৩০০ টাকা এবং জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে যেগুলোকে সরকার গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করবে, সেগুলোতে ভিত্তি টোল হবে ৪০০ টাকা।
গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের ভিত্তি টোল নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০০ টাকা। অর্থাৎ, এসব সড়কে সাধারণ ট্রাক চালাতে ৪০০ টাকা টোল দিতে হবে।
আর ভারী ট্রাককে দিতে হবে ভিত্তি টোলের দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৮০০ টাকা। আর ট্রেইলারের ক্ষেত্রে টোল হবে ১০০০ টাকা।
গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে বড় বাসের টোল হবে ভিত্তি টোলের ৯০ শতাংশ, মিনি ট্রাকের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ এবং মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ। ১৩টি শ্রেণীতে যানবাহনের জন্য আলাদা টোল নির্ধারণ করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, সড়কভেদে তিনভাবে টোল আদায় করার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়। বড় গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের জন্য ‘অপারেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ পদ্ধতিতে টোল আদায় করা হবে, যা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। বঙ্গবন্ধু সেতুতে বর্তমানে এ পদ্ধতিতেই টোল আদায় করা হচ্ছে।
অন্য ক্ষেত্রে উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে টোল আদায় করা হবে। নিলামে টোল আদায় করা না গেলে বিভাগীয় সিদ্ধান্তে টোল আদায় করা হবে। তবে এটি সাময়িক ব্যবস্থা।
দুটি সেতু কাছাকাছি হলে সময় বাঁচাতে এবং যানজট কমাতে দুই সেতুর টোল এক জায়গায় সংগ্রহ করা হবে।
মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেন, প্রতি তিন বছর পর পর টোলের হার পর্যালোচনা ও সংশোধন করা হবে। টোলের বিদ্যমান হার বাড়লেও বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়বে না। বর্তমানে আদায় করা টোলের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় অনেক কম।
এ নীতিমালা বাস্তবায়নের কোনো তারিখ বেঁধে দেওয়া হয়নি জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সড়ক বিভাগ তাদের সুবিধামতো সময়ে পর্যায়ক্রমে এটা বাস্তবায়ন করবে। এটা রাতারাতি বাস্তবায়ন করা যাবে না। টোল আদায় করার জন্য একধরনের অবকাঠামো লাগে, টেন্ডারিং করতে হবে, আরও নানা প্রক্রিয়া রয়েছে। টোল আদায়ের পদ্ধতিকে স্বচ্ছ, আধুনিক ও যুগোপযোগী করতেই এ নীতিমালা। টোল আদায় পদ্ধতির সঙ্গে মনিটরিং ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হবে।